বাতাসে লাশের গন্ধ
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে—
ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি॥
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো—
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে—
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি॥
তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,
তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।
তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,
মরি হায়, হায় রে—
তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি॥
ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,
সারা দিন পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,
তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,
মরি হায়, হায় রে—
ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি॥
ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে–
দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।
ও মা, গরিবের ধন যা আছে তাই দিব চরণতলে,
মরি হায়, হায় রে—
আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ ব’লে গলার ফাঁসি॥
গানের শুরুতে কবি বাংলাকে সম্বোধন করেন—‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। তারপর একে একে ফুটে ওঠে বাংলার রূপ: চিরদিন যার আকাশ-বাতাস প্রাণে বাঁশি বাজায়; ফাগুনে যার আমের বনের ঘ্রাণে মন পাগল হয়; অঘ্রানে যার ভরা ক্ষেতে সোনার ফসল দোল খায়। কবি মায়ের মুখের মধুর বাণী শুনে হৃদয়ে তৃপ্তি পান; মায়ের মুখ মলিন দেখলে নয়নে অশ্রু ঝরে। গানের শেষাংশে আসে শপথ—মায়ের ঘরে বসে মায়েরই মুখের বাণী শুনে কবি প্রাণ জুড়ান; গরিবের যা আছে তাই মায়ের চরণে দেবেন, কিন্তু পরের ঘরে গিয়ে মায়ের ভূষণ বলে গলার ফাঁসি কিনবেন না। অর্থাৎ বিদেশি শাসনের দাসত্ব নয়—মাতৃভূমির চরণে আত্মনিবেদনই কবির ব্রত। এই গান দেশপ্রেমের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদেরও বাণী বহন করে।
‘আমার সোনার বাংলা’ গানের প্রথম বৈশিষ্ট্য এর মাতৃ-রূপক। বাংলা এখানে শুধু ভূখণ্ড নয়—তিনি ‘মা’, যার আকাশ-বাতাস, ফুল-ফসল, মুখের বাণী—সবকিছু সন্তানের প্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই মাতৃভাবনা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্’ ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাকে দিয়েছেন একান্ত ঘরোয়া ও আবেগময় রূপ—এ মা দেবী নন, ঘরের মা; তার মুখ মলিন দেখলে সন্তানের চোখে জল আসে। গানের সুরটিও তাৎপর্যপূর্ণ—এটি বাউল সাধক গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানের সুরে বাঁধা। বাউল সুরের এই ব্যবহার গানটিকে শহুরে শিক্ষিত শ্রেণি থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষ—সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছে; লোকসুরের সরলতাই এর সর্বজনীন আবেদনের রহস্য। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে গানটির রাজনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম। ব্রিটিশ সরকার যখন বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করতে চাইল, তখন রবীন্দ্রনাথ এই গানে অখণ্ড বাংলার মাতৃমূর্তি তুলে ধরলেন—‘মা’কে ভাগ করা যায় না, এই ছিল নীরব বার্তা। ‘পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ ব’লে গলার ফাঁসি’—এই পংক্তিতে বিদেশি পণ্য বর্জনের স্বদেশি-আহ্বান স্পষ্ট। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই গান বাঙালির প্রাণের গান হয়ে ওঠে; স্বাধীনতার পর একে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দেওয়া হয়—কবির স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ই হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের নাম। গানের ভাষা অত্যন্ত সহজ—‘ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে’, ‘অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে’—এমন চিত্র প্রতিটি বাঙালির শৈশব-স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই সহজতাই গানটিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজ যখনই এই সুর বাজে—স্কুলের সমাবেশে, খেলার মাঠে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে—কোটি বাঙালির গলা একসঙ্গে মিলে যায়; একটি গান কীভাবে জাতির আত্মপরিচয় হয়ে উঠতে পারে, ‘আমার সোনার বাংলা’ তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। গানটির আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর ‘ঘরোয়া’ আবেদন—এখানে দেশপ্রেমের কোনো রণহুংকার নেই, আছে মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা। ‘তোমার কাছে শুনে শুনে তোমার মুখের বাণী আমার হৃদয় জুড়ায়’—এই পংক্তিতে দেশপ্রেম রূপ নিয়েছে পারিবারিক মমতার। এই কৌশলেই গানটি যুদ্ধের ময়দান থেকে শিশুর ঘুমপাড়ানি—সর্বত্র প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই গান প্রচারিত হতো; মুক্তিযোদ্ধারা এই গান গেয়ে যুদ্ধে যেতেন। লক্ষণীয়, রবীন্দ্রনাথ আরও অনেক স্বদেশি গান লিখেছিলেন—‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’—কিন্তু ‘আমার সোনার বাংলা’র মতো এমন সরল, এমন সর্বজনীন আর কোনোটি হয়নি। এর কারণ, এই গানে কবি দেশকে ‘ভাব’ হিসেবে নয়—‘মা’ হিসেবে দেখিয়েছেন; আর মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো যুক্তি মানে না, তা স্বতঃস্ফূর্ত।
দেশপ্রেম, মাতৃভূমি-বন্দনা, স্বদেশি চেতনা, বাংলার প্রকৃতি, জাতীয় ঐক্য
গানটি রবীন্দ্রসংগীতের স্বদেশ পর্যায়ের অন্তর্গত; এর সুর বাউলাঙ্গের—গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানের সুর অবলম্বনে রচিত। এই লোকসুর-ভিত্তি গানটিকে শাস্ত্রীয় কাঠিন্য থেকে মুক্ত করে সর্বসাধারণের গান করে তুলেছে। গঠনের দিক থেকে গানটিতে স্থায়ী ও অন্তরার আবর্তন আছে; ‘মরি হায়, হায় রে’—এই ধুয়ার মতো পংক্তি আবেগকে তীব্র করে। ভাষা অত্যন্ত সহজ ও চিত্রধর্মী—ফাগুনের আমের বন, অঘ্রানের ভরা ক্ষেত, মায়ের বদনখানি মলিন—প্রতিটি চিত্র বাঙালির চেনা জগতের। মাতৃ-সম্বোধনের বারবার ব্যবহার (‘ও মা’) গানটিকে প্রার্থনার মর্যাদা দিয়েছে। ছন্দ ও সুরের মিলনে গানটি একই সঙ্গে গভীর ও গাইতে সহজ—এই দ্বৈত গুণই এর চিরস্থায়িত্বের ভিত্তি। সুরের সরলতা গানটিকে ‘গণসংগীত’ করে তুলেছে—যেকোনো বয়সের, যেকোনো শ্রেণির মানুষ সহজে গাইতে পারেন। এই গণমুখিতাই জাতীয় সংগীত হিসেবে এর নির্বাচনের অন্যতম কারণ।
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করার (বঙ্গভঙ্গ) সিদ্ধান্ত নিলে সারা বাংলায় তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। এই স্বদেশি আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—তিনি রাখিবন্ধন উৎসবের প্রবর্তন করেন, স্বদেশি গান রচনা করেন, পথে নেমে প্রতিবাদ করেন। ‘আমার সোনার বাংলা’ এই পর্বেরই ফসল; ১৯০৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ গানটি রচিত হয় বলে ধারণা করা হয়। গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বাউল’ পত্রিকায় এবং পরে ‘গীতবিতান’-এর স্বদেশ অংশে সংকলিত হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে, কিন্তু এই গান বাঙালির মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কণ্ঠে কণ্ঠে এই গান ধ্বনিত হয়; ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে একে জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' (১৯৭৯) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী…”
“কবিতা সম্পর্কে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ (১৯৫২) ভাষা-আন্দোলনের প্রথম ও…”