মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হ’লো আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুম: সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চীৎকারে।

খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।

সে ভাষা বোঝে না কেউ
কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।

আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা
পেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগের
পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর
অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে।

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান:
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে
চ’লে যেতে হবে আমাদের।

চ’লে যাবে—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
ক’রে যাবো আশীর্বাদ,
তারপর হব ইতিহাস॥

কবিতার সারসংক্ষেপ

আজ রাতে যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো, তার মুখে খবর পাওয়া গেল—সে পেয়েছে ‘ছাড়পত্র’, অর্থাৎ নতুন বিশ্বের দ্বারে প্রবেশের অধিকারপত্র। জন্মমাত্র তার সুতীব্র চীৎকারেই সে এই অধিকার ঘোষণা করেছে। শিশুটি খর্বদেহ ও নিঃসহায় হলেও তার মুষ্টিবদ্ধ উত্তোলিত হাত যেন কোনো দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞার ইঙ্গিত দেয়। কেউ তার ভাষা বোঝে না—কেউ হাসে, কেউ মৃদু তিরস্কার করে। কিন্তু কবি মনে মনে সেই ভাষা বুঝেছেন; তিনি পেয়েছেন আসন্ন যুগের নতুন চিঠি, পড়েছেন ভূমিষ্ঠ শিশুর পরিচয়পত্র। কবির ঘোষণা: নতুন শিশু এসেছে, তাকে স্থান ছেড়ে দিতে হবে; জীর্ণ, ব্যর্থ, মৃত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই পৃথিবী থেকে পুরনো প্রজন্মকে চলে যেতে হবে। তবে যাওয়ার আগে, যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, প্রাণপণে পৃথিবীর জঞ্জাল সরিয়ে এই বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবেন তিনি—নবজাতকের কাছে এটাই তার দৃঢ় অঙ্গীকার। শেষে নিজের দেহের রক্তে নতুন শিশুকে আশীর্বাদ করে কবি নিজে ‘ইতিহাস’ হয়ে যাবেন।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘ছাড়পত্র’ কবিতার মূলে আছে প্রজন্ম-চেতনা—পুরনো প্রজন্মের আত্মসমালোচনা ও নতুন প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অভূতপূর্ব ঘোষণা। ‘ছাড়পত্র’ শব্দটি এখানে দ্ব্যর্থক: একদিকে তা নবজাতকের জন্মসনদ—নতুন বিশ্বে প্রবেশের অধিকার; অন্যদিকে তা পুরনো প্রজন্মের বিদায়পত্র—জীর্ণ পৃথিবী থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ। এই দ্বৈত অর্থই কবিতার দার্শনিক গভীরতা। শিশুর ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’ একটি শক্তিশালী প্রতীক—অসহায় দেহে লুকিয়ে থাকা প্রতিরোধের সংকল্প; ভবিষ্যতের বিপ্লবের বীজ। কবি যখন বলেন ‘চ’লে যেতে হবে আমাদের’, তখন তা পরাজয়ের স্বীকারোক্তি নয়—তা নৈতিক সততা। তিনি স্বীকার করছেন, তার প্রজন্ম পৃথিবীকে জঞ্জালে ভরিয়ে দিয়েছে; তাই নতুন প্রজন্মের পথ থেকে সরে দাঁড়ানোই ন্যায়। কিন্তু এই সরে দাঁড়ানো নিষ্ক্রিয় নয়—‘প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল’—এই পংক্তিতে আছে সক্রিয় প্রায়শ্চিত্তের শপথ। ‘জঞ্জাল’ শব্দটি লক্ষণীয়—তা শুধু ময়লা নয়; তা যুদ্ধ, শোষণ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িকতা—সব ধরনের মানবসৃষ্ট আবর্জনা। কবিতার শেষ চার পংক্তি বাংলা কবিতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী সমাপনিগুলোর একটি: ‘আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে ক’রে যাবো আশীর্বাদ, তারপর হব ইতিহাস।’ এখানে কবি নিজের মৃত্যুকে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু সেই মৃত্যুকে করেছেন অর্থবহ—রক্তের আশীর্বাদে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন সিঞ্চিত হবে। ইতিহাস হওয়া এখানে বিলুপ্তি নয়—তা স্মরণীয় হয়ে থাকা। জীবনীগত দিক থেকে এই কবিতা আরও বেদনাদায়ক: মাত্র একুশ বছর বয়সে যক্ষ্মায় মৃত্যুবরণকারী সুকান্ত যেন নিজের অকালমৃত্যুরই পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি নিজে ‘ইতিহাস’ হলেন, কিন্তু তার অঙ্গীকারের বাণী রয়ে গেল। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সহজ প্রবাহে, কোনো কঠিন অলংকার ছাড়াই কবি এই গভীর ভাব প্রকাশ করেছেন—এই সরলতাই কবিতাটিকে সবার কবিতা করে তুলেছে। নবজাতকের জন্মদিনে, স্কুলের অনুষ্ঠানে, নববর্ষের প্রভাতফেরিতে—যখনই নতুন শুরুর কথা আসে, তখনই এই কবিতা পাঠ করা হয়। কারণ প্রতিটি নতুন প্রাণই একটি ‘ছাড়পত্র’ নিয়ে আসে—আর প্রতিটি পুরনো প্রাণেরই দায়িত্ব সেই নতুনের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে যাওয়া। কবিতাটির ভাষা নিয়ে একটি কথা বলা দরকার—সুকান্ত এখানে কোনো দুরূহ শব্দ ব্যবহার করেননি; ‘জঞ্জাল’, ‘ধ্বংসস্তূপ’, ‘মুষ্টিবদ্ধ’—সবই চেনা শব্দ, কিন্তু সাজানোর গুণে তারা অসাধারণ হয়ে উঠেছে। এই গণমুখী ভাষাই সুকান্তের কবিতাকে ‘জনগণের কবিতা’ করে তুলেছে। ‘ইতিহাস’ শব্দটিও লক্ষণীয়—কবি ‘মৃত্যু’ বলেননি, বলেছেন ‘ইতিহাস’; অর্থাৎ তার বিদায় মানে বিলুপ্তি নয়—স্মৃতিতে, চেতনায় থেকে যাওয়া। নিজের অকালমৃত্যুর দিকে তাকিয়ে একুশ বছরের এক তরুণের এই পরিণত উচ্চারণ বাংলা কবিতায় বিরল। এই কবিতা শুধু বাঙালির নয়—যেকোনো দেশের, যেকোনো যুগের পাঠক এতে নিজের প্রজন্মের দায় খুঁজে পাবেন। কারণ প্রতিটি যুগেই পুরনো প্রজন্মকে প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হয়: তোমরা নতুনদের জন্য কী রেখে যাচ্ছ? ‘ছাড়পত্র’ সেই প্রশ্নেরই কাব্যিক রূপ—আর সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় প্রতিটি পাঠকের।

প্রধান ভাব ও বার্তা

প্রজন্ম-অঙ্গীকার, ভবিষ্যৎ-আশা, আত্মসমালোচনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, নবজীবন

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত; ছন্দের প্রবাহ স্বাভাবিক ও কথোপকথনধর্মী, যা গভীর ভাবকে সহজভাবে প্রকাশে সাহায্য করেছে। ‘ছাড়পত্র’, ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’, ‘জঞ্জাল’, ‘ইতিহাস’—প্রতিটি শব্দ এখানে প্রতীকী অর্থ বহন করে। কবিতার গঠন একটি যুক্তিপরম্পরা অনুসরণ করে: শিশুর আগমন → তার প্রতিজ্ঞার ইঙ্গিত → কবির উপলব্ধি → পুরনো প্রজন্মের কর্তব্য → চূড়ান্ত অঙ্গীকার। এই সুসংগত কাঠামো কবিতাটিকে প্রায় ইশতেহারের মর্যাদা দিয়েছে। ভাষা সরল, সরাসরি ও আবেগময়; কোনো দুর্বোধ্য অলংকার নেই। শেষ স্তবকের সংক্ষিপ্ততা ও দৃঢ়তা কবিতার ভাবকে চরমে পৌঁছে দেয়—‘তারপর হব ইতিহাস’—এই সমাপ্তি পাঠকের মনে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি তোলে। ছন্দের দিক থেকে মাত্রাবৃত্তের মুক্ত প্রবাহ কবিতাটিকে কথ্য ভাষার কাছাকাছি এনেছে—যেন কবি পাঠকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন। এই আত্মীয়তাই কবিতাটির জনপ্রিয়তার অন্যতম রহস্য।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

কবিতাটি রচিত হয় ১৯৪৭ সালের দিকে—ভারতভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও স্বাধীনতার সন্ধিক্ষণে। এর ঠিক কয়েক বছর আগে, ১৯৪৩ সালে, বাংলায় ভয়াবহ মন্বন্তর (দুর্ভিক্ষ) ঘটে, যাতে লাখো মানুষ মারা যায়; এই ঘটনা তরুণ সুকান্তের মনে গভীর ক্ষত রেখে যায়। সুকান্ত ছিলেন মার্কসবাদী চেতনার কবি—কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত; তার কবিতায় শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার স্পষ্ট। মাত্র একুশ বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালের ১৩ মে যক্ষ্মায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর ১৯৪৮ সালে ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা বাংলা কবিতায় এক নতুন কণ্ঠের আবির্ভাব হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দেশভাগের রক্তক্ষয়ী পটভূমিতে ‘নতুন বিশ্বের’ স্বপ্ন এই কবিতাকে বিশেষ তাৎপর্য দান করে। স্বাধীনতার ঠিক আগের এই সন্ধিক্ষণে লেখা কবিতাটি তাই শুধু ব্যক্তিগত অঙ্গীকার নয়—একটি জাতির নবজন্মেরও প্রতীক।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।