মূল কন্টেন্টে যান

ভালো আছি ভালো থেকো

কবিতা সম্পর্কে

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার থেকে প্রিয়জনের উদ্দেশে লেখা। ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ — এই পংক্তি বাংলা কবিতার সবচেয়ে কোমল বিদায়-উক্তিগুলোর একটি। ১৯৯০ সালে ‘মৌলিক মুখোশ’ কাব্যে প্রকাশিত কবিতাটি পরে ‘তোমাকে চাই’ চলচ্চিত্রে গান হিসেবে অমর হয়।

ভালো আছি, ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো

— রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবিতাটি একটি চিঠি — প্রেমিক প্রিয়জনকে লিখছেন: ভালো আছি, তুমিও ভালো থেকো; আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো। দূরত্ব যতই হোক, ভালোবাসা অটুট — 'আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে / আছো তুমি হৃদয় জুড়ে'। ঝিনুক যেমন খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ পুষে রাখে, কুসুম যেমন পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম ঢেকে রাখে — তেমনি প্রেমিকের হৃদয়ে প্রিয়জনের স্মৃতি সুরক্ষিত। কবিতাটি শেষ হয় একই আশ্বাসে — ভালো থেকো, চিঠি লিখো। এটি বিচ্ছেদের কবিতা, কিন্তু হতাশার নয়; দূরত্বের মধ্যেও ভালোবাসার স্থায়িত্বের কবিতা।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

'ভালো আছি ভালো থেকো' কবিতার পেছনে আছে এক মর্মান্তিক সত্য, যা একে শুধু প্রেমের কবিতা থেকে উন্নীত করে জীবনের দলিলে। বহুল প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তার স্ত্রী তসলিমা নাসরিনের উদ্দেশে লেখা বিদায়-পত্রে এই কবিতাটি রেখে যান — আত্মহত্যার আগে, ১৯৯১ সালে। এই প্রেক্ষাপটে 'ভালো আছি, ভালো থেকো' পংক্তিটি পড়লে এর কোমলতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বেদনা স্পষ্ট হয় — যে মানুষটি নিজে আর ভালো থাকার পথে নেই, তিনি প্রিয়জনকে ভালো থাকার আশীর্বাদ দিচ্ছেন। এই আত্মবিসর্জনমূলক ভালোবাসাই কবিতার প্রাণ। 'আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো' — এই চিত্রকল্পটি অসাধারণ। প্রেমিক এমন এক ঠিকানায় চিঠি চাইছেন, যেখানে ডাক পৌঁছায় না; অর্থাৎ তিনি জানেন, এই যোগাযোগ আর সম্ভব নয় — তবু চিঠি চান। এই অসম্ভবের আকাঙ্ক্ষাই কবিতার হৃদয়। আকাশ এখানে দূরত্বেরও প্রতীক, আবার মৃত্যুরও — যিনি আকাশে চলে যাচ্ছেন, তিনি পেছনে থাকা প্রিয়জনের চিঠি চান। ঝিনুক-মুক্তো ও কুসুম-ফসলের উপমা দুটি লক্ষণীয় — দুটোতেই বাইরের কঠিন আবরণের ভেতরে কোমল সম্পদ রক্ষিত; যেন কবি বলছেন, বাইরের কঠোরতা (বিচ্ছেদ, দূরত্ব, এমনকি মৃত্যু) ভেতরের ভালোবাসাকে স্পর্শ করতে পারবে না। 'আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে / আছো তুমি হৃদয় জুড়ে' — এই পংক্তি ভালোবাসার সর্বব্যাপিতার ঘোষণা; শরীর দূরে গেলেও হৃদয় জুড়ে প্রিয়জনের উপস্থিতি। কবিতাটির দ্বিতীয় জীবন শুরু হয় ১৯৯৬ সালে, যখন 'তোমাকে চাই' চলচ্চিত্রে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে এটি গান হয় — সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত ছবিতে। গান হিসেবে এর জনপ্রিয়তা কবিতার খ্যাতিকে ছাড়িয়ে যায়; কিন্তু মনোযোগী পাঠক জানেন, এই সুরের পেছনে আছে এক কবির শেষ চিঠি। রুদ্রের কবিতায় যে তীব্রতা ও সততা ছিল — 'বাতাসে লাশের গন্ধ'র ক্ষোভ থেকে এই কবিতার কোমলতা পর্যন্ত — তার পুরোটাই এই ছোট্ট কবিতায় ধরা আছে। ক্ষোভের কবিও যে কত কোমলভাবে ভালোবাসতে পারেন, এই কবিতা তার প্রমাণ। তাই এটি শুধু প্রেমের কবিতা নয়; এটি এক বিদ্রোহী হৃদয়ের সবচেয়ে নরম স্বীকারোক্তি। রুদ্র মাত্র ৩৪ বছর বেঁচেছিলেন; 'মৌলিক মুখোশ' তার শেষ কাব্যগ্রন্থ। এই কবিতা তাই তার কাব্যজীবনেরও এক ধরনের বিদায়-পত্র। পাঠক যখন জানেন এই পটভূমি, তখন প্রতিটি পংক্তি আরো ভারী হয়ে ওঠে — ভালোবাসার এই কোমলতাই রুদ্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল।

প্রধান ভাব ও বার্তা

প্রেম, বিদায়, বিরহ, মৃত্যু, স্মৃতি

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

পত্র-কবিতার গঠন — সরাসরি সম্বোধনে প্রিয়জনের সঙ্গে সংলাপ। 'আকাশের ঠিকানায়' — অসম্ভবকে সম্ভব করার চিত্রকল্প। ঝিনুক-মুক্তো ও কুসুম-ফসলের উপমা — বাইরের কঠোরতায় ভেতরের কোমলতার সুরক্ষা। পুনরাবৃত্তিমূলক গঠন (প্রতিটি স্তবকের শেষে 'ভালো আছি, ভালো থেকো') কবিতাটিকে গানের মতো স্মরণীয় করে তুলেছে — যা পরবর্তীতে এর গান-রূপের পথ প্রশস্ত করে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯৯০ সালে 'মৌলিক মুখোশ' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত; রচনাকাল ১৯৯১-এর আগে। বহুল প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, কবির আত্মহত্যার (জুন ১৯৯১) আগে লেখা বিদায়-পত্রে এই কবিতাটি পাওয়া যায়। ১৯৯৬ সালে 'তোমাকে চাই' চলচ্চিত্রে (পরিচালনা: মতিন রহমান; অভিনয়ে সালমান শাহ ও শাবনূর) আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরারোপে এটি গান হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কবিতা থেকে গান — এই রূপান্তর বাংলা সাহিত্যে বিরল দৃষ্টান্ত।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।