ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের দ্বন্দ্বের কবিতা। একই শিরোনামের কাব্যগ্রন্থের (১৯৮২) শিরোনাম-কবিতা এটি, যার জন্য কবি ১৯৮৩ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। চাঁদ আর চিতাকাঠের ডাক উপেক্ষা করে কবি বেছে নেন জীবন — ‘কিন্তু, এখনি যাবো না, একাকী যাবো না অসময়ে’।
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।
এতো কালো মেখেছি দু হাতে— শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতাটি শুরু হয় আত্ম-সমালোচনা দিয়ে — 'ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো। / এতো কালো মেখেছি দু হাতে / এতোকাল ধরে!' জীবনের পাপ ও ব্যর্থতার বোঝা কবিকে মৃত্যুর দিকে টানে; খাদের পাশে দাঁড়ালে চাঁদ ডাকে, গঙ্গার তীরে দাঁড়ালে চিতাকাঠ ডাকে — 'আয় আয় আয়'। কবি স্বীকার করেন, যেতে তিনি পারেন — 'যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি'। কিন্তু তারপর আসে সেই বিখ্যাত প্রশ্ন — 'কিন্তু, কেন যাবো?' উত্তরটি সহজ ও মানবিক: 'সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো'। তাই সিদ্ধান্ত — 'যাবো / কিন্তু, এখনি যাবো না / তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো / একাকী যাবো না, অসময়ে।' মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু তার সময় এখন নয়; জীবনের টান এখনো প্রবল।
'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' কবিতার শক্তি এর সততায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায় এখানে কোনো দার্শনিক তত্ত্ব প্রচার করছেন না; তিনি শুধু নিজের মনের একটি সন্ধিক্ষণের কথা বলছেন — যে মুহূর্তে মানুষ ভাবে, চলে যাওয়াই কি ভালো নয়? 'এতো কালো মেখেছি দু হাতে' — এই স্বীকারোক্তিতে কোনো আত্ম-করুণা নেই, আছে নির্মোহ আত্ম-বিচার। জীবনের ভুল, পাপ, ব্যর্থতা — সব মিলিয়ে হাত কালো; এই বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে চলে যাওয়া কি সহজ নয়? চাঁদ ও চিতাকাঠের 'আয় আয় আয়' ডাক — মৃত্যুর আকর্ষণকে কবি দিয়েছেন প্রায় সংগীতময় রূপ; মৃত্যু এখানে ভয়ংকর নয়, বরং স্নিগ্ধ ও আমন্ত্রণময়। খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে চাঁদ ডাকে, গঙ্গার তীরে দাঁড়ালে চিতাকাঠ ডাকে — প্রকৃতি ও মৃত্যু একসঙ্গে আহ্বান জানায়। এই কারণেই কবিতাটি এত মানবিক — মৃত্যু-চিন্তা প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষেরই চিন্তা, কিন্তু কবি একে বলেছেন নির্ভয়ে, লুকোছাপা না করে। কিন্তু কবিতার মোড় ঘোরে 'কিন্তু, কেন যাবো?' প্রশ্নে। এই প্রশ্নটি বাংলা কবিতার ইতিহাসে জীবন-প্রেমের সবচেয়ে সরল ও গভীর উচ্চারণগুলোর একটি। উত্তরটিও তেমনি সরল — 'সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো'। কোনো মহান আদর্শ নয়, কোনো দার্শনিক যুক্তি নয়; শুধু একটি শিশুর মুখ, একটি চুমো। এই ক্ষুদ্র, ব্যক্তিগত টানই মৃত্যুর মহান আকর্ষণকে পরাজিত করে। এখানেই শক্তির জীবনদর্শন — জীবনের অর্থ বড় বড় তত্ত্বে নয়, ছোট ছোট স্নেহের বন্ধনে। শেষ পংক্তিগুলো — 'তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো / একাকী যাবো না, অসময়ে' — জীবনের প্রতি এই অঙ্গীকারকে সামাজিক রূপ দেয়; কবি একা বাঁচতে চান না, সবার সঙ্গে বাঁচতে চান। 'অসময়ে' শব্দটি লক্ষণীয় — মৃত্যুকে অস্বীকার করা হয়নি, শুধু তার সময় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে; এটাই পরিণত মানসিকতা। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের জন্য শক্তি ১৯৮৩ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান — প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, কিন্তু কবিতাটির প্রকৃত পুরস্কার পাঠকের হৃদয়। আজও হতাশার মুহূর্তে অসংখ্য পাঠক এই কবিতায় সান্ত্বনা খোঁজেন; আবৃত্তি-শিল্পীদের কণ্ঠে 'কিন্তু, কেন যাবো?' আজও শ্রোতাদের চোখে জল আনে। কারণ প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন মুহূর্ত আসে, যখন এই প্রশ্নটি নিজেকে করতে হয় — আর এই কবিতা সেই প্রশ্নের সবচেয়ে মানবিক উত্তর দেয়। সমালোচকরা বলেন, শক্তির এই কবিতা আসলে একটি 'জীবন-সমর্থন' — আত্মহত্যার চিন্তার বিরুদ্ধে কবিতার জবাব। এই কারণে মনোবিজ্ঞানীরাও কখনো কখনো হতাশাগ্রস্ত মানুষকে এই কবিতা পড়তে বলেন। কবিতা যে জীবন বাঁচাতে পারে, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী?
মৃত্যুচিন্তা, জীবনের প্রতি টান, পিতৃত্ব, আশা, আত্ম-বিচার
কথোপকথনধর্মী, সরল ভাষা — যেন নিজের সঙ্গে নিজের আলাপ। 'আয় আয় আয়' ধ্বনি-পুনরাবৃত্তি মৃত্যুর ডাককে সংগীতময় করে। প্রশ্নোত্তর-কাঠামো ('কিন্তু, কেন যাবো?') কবিতাটিকে নাটকীয় গতি দেয়। চাঁদ ও চিতাকাঠ — বিপরীতধর্মী দুই প্রতীকের পাশাপাশি ব্যবহার। শেষাংশের সংক্ষিপ্ত পংক্তিগুলো ('যাবো / কিন্তু, এখনি যাবো না') সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা প্রকাশ করে।
১৯৮২ সালে 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' কাব্যগ্রন্থে (আনন্দ পাবলিশার্স) প্রকাশিত — শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ৩২তম কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৮৩ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ষাটের দশকের হাংরি আন্দোলনের এই কবি ততদিনে পরিণত; জীবনের অভিজ্ঞতা ও মৃত্যু-সচেতনতা এই পর্বের কবিতায় গভীর দার্শনিক রূপ নেয়। কবিতাটি পরবর্তীতে ইংরেজি ও মৈথিলী ভাষায় অনূদিত হয়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”