মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা সম্পর্কে

কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর একটি। ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত এই গান স্বাধীনতা আন্দোলনের তরুণদের উদ্দেশে রচিত — মিছিলে, সমাবেশে, যুদ্ধক্ষেত্রে গাওয়া এই গান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে গৃহীত হয়।

চল চল চল
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল

— কাজী নজরুল ইসলাম, ‘চল চল চল’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবি ডাক দেন — চল, চল, চল! ঊর্ধ্ব গগনে বাজছে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণী; ভোরের তরুণদল এগিয়ে চলেছে। কারাগার, ফাঁসি, লাঠির ভয়কে তুচ্ছ করে এগিয়ে যেতে হবে — নতুন ভোরের দিকে, নতুন সমাজের দিকে। সামরিক রূপকে সাজানো এই গান তরুণদের শেখায় কঠোর হতে, নির্ভীক হতে; আকাশ নিজেই যেন যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে। মিছিলের তালে তালে গাওয়া এই গান শুধু যুদ্ধের ডাক নয় — গঠনেরও আহ্বান।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

কাজী নজরুল ইসলামের 'চল্ চল্ চল্' (সন্ধ্যা, ১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর একটি — যা ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। কবিতার শুরুতেই ডাক: 'চল্ চল্ চল্! ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল' — মাদলের তালে তালে এগিয়ে চলার আহ্বান; এই ছন্দই কবিতার প্রাণ — পড়তে পড়তে পাঠকের পা যেন নিজে থেকেই তাল মেলায়। নজরুল এই গান লেখেন ১৯২০-এর দশকের শেষে, যখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছিল; 'সন্ধ্যা' কাব্যগ্রন্থের এই গান সরাসরি সেই তরুণদের উদ্দেশে — যারা কারাগার, ফাঁসি, লাঠির ভয়কে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাবে। কবিতার বৈশিষ্ট্য এর সামরিক রূপক: 'নিম্নে উতলা ধরণী-তল, অরুণ প্রাতের তরুণ দল' — ভোরের তরুণদল যেন সেনাবাহিনী; 'করুণা-কোমল' নয়, 'কঠোর' হওয়ার ডাক। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা এখানে পূর্ণ প্রকাশিত — কিন্তু শুধু ধ্বংসের ডাক নয়; 'চল্' শব্দের পুনরাবৃত্তিতে আছে গঠনেরও আহ্বান — নতুন সমাজ, নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে চলা। সংগীত হিসেবে এর সুরও নজরুলের নিজের দেওয়া; মার্চ-ছন্দের এই গান মিছিলে, সমাবেশে, যুদ্ধক্ষেত্রে গাওয়া হয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে এই গান ছিল প্রেরণার উৎস; স্বাধীনতার পর জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি রণসংগীতের মর্যাদা পাওয়া তাই ঐতিহাসিক ন্যায়। কবিতাটির ভাষা সহজ, কিন্তু ভাব গভীর: 'ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল' — আকাশ নিজেই যেন যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে; প্রকৃতি এই সংগ্রামের সাক্ষী ও সহযোদ্ধা। আজও, প্রায় একশো বছর পর, কোনো মিছিলে বা খেলার মাঠে এই গান বাজলে রক্তে তাল ওঠে — এটাই নজরুলের জাদু: তিনি শুধু কবিতা লেখেননি, লিখেছিলেন সময়ের হৃৎস্পন্দন। এই গানের সুর নজরুল নিজে দিয়েছিলেন — মার্চ-ছন্দের দ্রুত তাল, যা মিছিলের পায়ের সঙ্গে মিলে যায়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা এই গান গেয়ে রণাঙ্গনে যেতেন; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এটি নিয়মিত প্রচারিত হতো। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার একে রণসংগীত হিসেবে গ্রহণ করে — জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা'র পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এটি বাজানো হয়। নজরুলের অন্যান্য রণসংগীত — 'কারার ঐ লৌহকপাট', 'দুর্গম গিরি কান্তার মরু' — একই ধারার; কিন্তু 'চল চল চল'-এর মতো সরল ও প্রত্যক্ষ ডাক আর কোনোটিতে নেই। গানটির একটি বৈশিষ্ট্য — এতে কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর নাম নেই; ফলে যেকোনো যুগের যেকোনো সংগ্রামে এটি প্রযোজ্য। এই সার্বজনীনতাই একে চিরস্থায়ী করেছে। আজকের তরুণ প্রজন্মও আন্দোলনের মিছিলে এই গান গায় — প্রমাণ করে, নজরুলের ডাক সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে।

প্রধান ভাব ও বার্তা

দেশপ্রেম, সংগ্রাম, তরুণদের জাগরণ, স্বাধীনতা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

গানটি মার্চ-ছন্দে রচিত — 'চল্ চল্ চল্'-এর পুনরাবৃত্তি পাঠকের পায়ে তাল তোলে। সামরিক রূপকের ব্যবহার: মাদল, তরুণদল, অরুণ প্রাত — যুদ্ধের আবহ। 'ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল' — প্রকৃতিকে সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে চিত্রায়ণ। ভাষা সহজ ও প্রত্যক্ষ, কিন্তু ধ্বনিময় — মিছিলে গাওয়ার উপযোগী। নজরুল নিজে সুর দিয়েছিলেন; কবিতা ও সংগীতের এই মিলন গানটিকে দিয়েছে অসাধারণ প্রাণ। সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ পংক্তি — কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯২৯ সালে 'সন্ধ্যা' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশের সময় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তুঙ্গে — সাইমন কমিশন-বিরোধী আন্দোলন, তরুণদের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের ঢেউ। নজরুল নিজে ছিলেন এই আন্দোলনের কবি — 'বিদ্রোহী' (১৯২২) তাকে আগেই 'বিদ্রোহী কবি' উপাধি দিয়েছিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এই গান মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়; ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ একে রণসংগীতের মর্যাদা দেয়।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।