ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
কাজী নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ (১৯২৫) মানবিক সাম্যের সবচেয়ে দৃপ্ত ঘোষণাগুলোর একটি। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় ধর্ম, জাতি ও বর্ণের ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছেন কবি।
গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।— কাজী নজরুল ইসলাম, ‘মানুষ’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতাটি শুরু হয় সাম্যের গানের ঘোষণায়—মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই। কবি বলেন, দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ নেই, ধর্ম-জাতির ভেদ নেই; সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে মানুষ পরস্পরের জ্ঞাতি। এরপর কবিতা এগোয় ধর্মীয় ভণ্ডামির সমালোচনায়: পূজারী মন্দিরের দুয়ার বন্ধ করে দেবতার পূজা করছে, অথচ দুয়ারের বাইরে দাঁড়িয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ—‘ক্ষুধার ঠাকুর’। কবি প্রশ্ন তোলেন, পাথরের দেবতাকে ভোগ দিয়ে কী লাভ, যখন জীবন্ত মানুষ ক্ষুধায় কাতর? কবিতার মূল বক্তব্য: ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা অধর্ম; সত্যিকারের ধর্ম হলো মানুষের সেবা, মানুষের মর্যাদা রক্ষা। শেষে কবি আহ্বান জানান—মন্দির-মসজিদের সংকীর্ণতা ভেঙে মানুষকে ভালোবাসতে, কারণ মানুষের হৃদয়ই সবচেয়ে পবিত্র তীর্থ। সংক্ষেপে, এটি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মানবতার জয়গান।
‘মানুষ’ কবিতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে হলে ১৯২৫ সালের বাংলাকে মনে রাখতে হবে—যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ক্রমশ রাজনৈতিক বিভেদের হাতিয়ার হয়ে উঠছিল। এই পটভূমিতে নজরুলের ঘোষণা—‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই’—ছিল একটি বৈপ্লবিক বক্তব্য। তিনি শুধু সহনশীলতার কথা বলেননি; তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন মানুষের মর্যাদার সামনে। ‘ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে’—এই চিত্রটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত। মন্দিরের ভেতরে পাথরের দেবতা ভোগ পাচ্ছে, বাইরে জীবন্ত মানুষ ক্ষুধায় মরছে—এই বৈপরীত্য ধর্মীয় আচারের অসারতা উন্মোচন করে। নজরুল এখানে কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নন; তিনি বিরুদ্ধে ধর্মের নামে অমানবিকতার। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ—কবি আস্তিক্যবাদী ছিলেন, কিন্তু তাঁর ঈশ্বর মন্দির-মসজিদে বন্দী নন; তিনি মানুষের মধ্যে বাস করেন। কবিতার গঠন লক্ষণীয়: শুরুতে সার্বজনীন ঘোষণা (‘গাহি সাম্যের গান’), মাঝে নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত (পূজারী ও ক্ষুধার্তের কাহিনি), শেষে আহ্বান। এই ত্রিস্তরীয় গঠন যুক্তির মতো এগোয়—নীতি, প্রমাণ, সিদ্ধান্ত। ফলে কবিতাটি শুধু আবেগের নয়, যুক্তিরও কবিতা। ভাষার দিক থেকে নজরুল এখানে সংযত—‘বিদ্রোহী’র ঝড় নেই, আছে দৃঢ়, প্রায় গদ্যধর্মী যুক্তির স্রোত। এই সংযম কবিতাটির নৈতিক ওজন বাড়ায়; পাঠক মনে করেন, কবি রাগে নয়, বিবেকে কথা বলছেন। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের অন্যান্য কবিতার (‘সাম্যবাদী’, ‘পাপ’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘কুলি-মজুর’) সঙ্গে ‘মানুষ’ একটি সমন্বিত দর্শন গড়ে তোলে—যেখানে পতিতা, চোর, কুলি-মজুর—সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষও সমান মর্যাদার অধিকারী। এই দৃষ্টিভঙ্গি নজরুলকে তাঁর যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে রাখে। আজও যখন ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি হয়, তখন ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই’—এই পংক্তি প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। কবিতাটি প্রমাণ করে, সত্যিকারের ধার্মিকতা মানুষকে ভালোবাসায়; আর মানুষকে ঘৃণা করে কোনো ধর্ম টিকে থাকতে পারে না। কবিতাটির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক এর ‘সাম্যবাদী’ প্রেক্ষাপট। এই কাব্যের এগারোটি কবিতায় নজরুল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে—চোর, বারাঙ্গনা, কুলি-মজুর, পাপী—সমান মর্যাদা দিয়েছেন। ‘মানুষ’ এই দর্শনের শিরোমণি; এখানে কবি ঘোষণা করেন, মর্যাদার মাপকাঠি পেশা বা ধর্ম নয়—মানুষ হওয়াটাই যথেষ্ট। এই দৃষ্টিভঙ্গি ১৯২৫ সালের রক্ষণশীল সমাজে ছিল বৈপ্লবিক। ‘নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি’—এই পংক্তি আজকের বিশ্বায়নের যুগেও প্রাসঙ্গিক; জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে মানবিক ঐক্যের ডাক। কবিতাটি পড়লে মনে হয়, নজরুল শুধু কবি ছিলেন না—ছিলেন একজন নৈতিক দার্শনিক, যিনি কবিতাকে ব্যবহার করেছেন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা দিতে।
মানবতা, সাম্য, ধর্মীয় সহনশীলতা, সামাজিক ন্যায়
সার্বজনীন ঘোষণা দিয়ে শুরু, দৃষ্টান্ত দিয়ে যুক্তি, আহ্বানে সমাপ্তি—ত্রিস্তরীয় যুক্তিনির্ভর গঠন। ‘ক্ষুধার ঠাকুর’—এমন বৈপরীত্যধর্মী চিত্রকল্পে ধর্মীয় ভণ্ডামির উন্মোচন। ভাষা ‘বিদ্রোহী’র তুলনায় সংযত ও গদ্যধর্মী; আবেগের চেয়ে বিবেকের সুর প্রধান। পুনরাবৃত্তি ও সমান্তরাল গঠন (‘নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি’) কবিতাটিকে মন্ত্রের মতো স্মরণীয় করে। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের অন্যান্য কবিতার সঙ্গে মিলে একটি সমন্বিত মানবতাবাদী দর্শন গড়ে তোলে। সরাসরি সম্বোধন (‘পূজারী, দুয়ার খোলো’) পাঠককে নৈতিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
১৯২৫ সাল—‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের বছর। এই সময়ে ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন তীব্র হচ্ছিল; হিন্দু-মহাসভা ও মুসলিম লীগের উত্থান, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশঙ্কা। নজরুল এই পটভূমিতে ‘সাম্যবাদী’ কাব্যে ১১টি কবিতায় মানবিক সাম্যের দর্শন তুলে ধরেন—‘মানুষ’ তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। উল্লেখ্য, নজরুল নিজে ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারের সন্তান হয়েও হিন্দু পুরাণ ও ইসলামী ঐতিহ্য—দুটোকেই সমান শ্রদ্ধায় ব্যবহার করেছেন; তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা ছিল জীবনচর্চার অংশ, শুধু কবিতার বিষয় নয়। এই কবিতা প্রকাশের পর রক্ষণশীল মহলে সমালোচনা হলেও প্রগতিশীল পাঠকমহলে এটি ব্যাপক সাড়া জাগায়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের সঙ্গেও এই কবিতার সুর মিলে যায়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”