বাতাসে লাশের গন্ধ
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ (‘হিন্দু-মুসলমান’ কবিতা) বাংলা ভাষায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সবচেয়ে সুন্দর ও স্মরণীয় প্রকাশ। একই বৃন্তে ফোটা দুটি কুসুমের রূপকে কবি দেখিয়েছেন—জন্মভূমি এক, মাটি এক, রক্ত এক; বিভেদ কৃত্রিম, ঐক্য স্বাভাবিক। আজও সম্প্রীতির যেকোনো অনুষ্ঠানে এই গান গাওয়া হয়।
মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান,
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।— কাজী নজরুল ইসলাম, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
গানটির কেন্দ্রীয় রূপক ফুল—একই বৃন্তে ফোটা দুটি কুসুম যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি হিন্দু-মুসলমানও এই মাটির অবিচ্ছেদ্য সন্তান। 'মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ'—চোখের মণি আর প্রাণের মতো দুই সম্প্রদায় পরস্পরের অস্তিত্বের শর্ত। পরের স্তবকগুলোতে ঐক্যের বাস্তব ভিত্তি—একই আকাশ, একই রক্ত, একই নাড়ীর টান, একই দেশের হাওয়া-জল, একই ভাষায় মাকে ডাকা। শেষে ভবিষ্যতের স্বপ্ন—অন্ধকার রাতের হানাহানি শেষে সকালে ভায়ে ভায়ে জানাজানি হবে। সংক্ষেপে, এটি সম্প্রীতির জাতীয় সংগীত—বিভেদের বিরুদ্ধে, মিলনের পক্ষে।
'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান'—বাংলা ভাষায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সবচেয়ে সুন্দর ও স্মরণীয় প্রকাশ এই দুটি পংক্তি। নজরুলের এই নাট্যগীতি ('হিন্দু-মুসলমান' কবিতা হিসেবেও পরিচিত) একটি ফুলের রূপকে দুই সম্প্রদায়ের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে তুলে ধরেছে—একই বৃন্তে ফোটা দুটি কুসুমকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি হিন্দু-মুসলমানও এই মাটির অবিচ্ছেদ্য সন্তান। রূপকটি গভীরভাবে চিন্তা করা। বৃন্ত একটি—অর্থাৎ জন্মভূমি এক, মাটি এক, আকাশ এক। কুসুম দুটি—অর্থাৎ প্রকাশ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু উৎস এক। 'মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ'—এই পংক্তিতে কবি দুই সম্প্রদায়কে শরীরের অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন; চোখের মণি আর প্রাণ—একটি ছাড়া অন্যটি অচল। এই জৈবিক রূপক সম্প্রীতিকে শুধু নৈতিক আদর্শ নয়, অস্তিত্বের শর্তে পরিণত করে। গানটির পরের স্তবকগুলোতে এই ঐক্যের বাস্তব ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে—'এক সে আকাশ মায়ের কোলে যেন রবি-শশী দোলে, এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ীর টান'। একই আকাশ, একই রক্ত, একই নাড়ীর টান—জৈবিক ও ভৌগোলিক সত্যকে কবি সম্প্রীতির যুক্তি হিসেবে দাঁড় করান। 'মোরা এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল'—দৈনন্দিন জীবনের এই সাদৃশ্যই আসল ঐক্যের ভিত্তি, কোনো তাত্ত্বিক ঘোষণা নয়। ঐতিহাসিক পটভূমি মনে রাখা জরুরি। নজরুলের যুগে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম হাতিয়ার ছিল; 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে স্বাধীনতা-আন্দোলনকে দুর্বল করা হতো। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নজরুল ঘোষণা করলেন—বিভেদ কৃত্রিম, ঐক্য স্বাভাবিক। এটি ছিল শুধু কবিতা নয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। গানটির শেষাংশে ভবিষ্যতের স্বপ্ন—'চিনতে নেরে আঁধার রাতে করি মোরা হানাহানি, সকাল হলে হবে রে ভাই ভায়ে ভায়ে জানাজানি'। অন্ধকার রাতে ভাই ভাইকে চিনতে না পেরে লড়ে; সকাল হলে, অর্থাৎ জ্ঞানের আলো এলে, ভ্রাতৃত্ব ফিরে আসবে। এই আশাবাদ নজরুলের চিরায়ত—যত অন্ধকারই হোক, ভোর হবেই। আজও, উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যেকোনো অনুষ্ঠানে এই গান গাওয়া হয়। দুটি কুসুমের এই রূপক প্রমাণ করে—সত্যিকারের কবিতা সীমান্ত মানে না, যুগ মানে না; তা শুধু মানুষের হৃদয়ের কথা বলে। নজরুলের নিজের জীবন ছিল এই গানের জীবন্ত দলিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বড়ো অংশ ছিলেন হিন্দু; তিনি বিয়ে করেছিলেন প্রমিলা দেবীকে—ধর্মীয় গোঁড়ামিকে উপেক্ষা করে। তাঁর সন্তানদের নামেও এই উদারতার ছাপ। ফলে 'একই বৃন্তে দুটি কুসুম' শুধু কবিতার কথা নয়—তাঁর যাপিত জীবনের কথা। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে এই গানের স্থান বিশেষ—স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিটি বড়ো আয়োজনে এটি গাওয়া হয়, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে জাতীয় পর্যায়ের সমাবেশ পর্যন্ত।
হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি, মানবতা, দেশপ্রেম
নাট্যগীতি (কাহারবা তালে); ফুলের রূপক—এক বৃন্ত, দুই কুসুম—ঐক্যের জৈবিক প্রতিমা। 'নয়ন-মণি' ও 'প্রাণ'—শরীরী রূপকে সম্প্রীতিকে অস্তিত্বের শর্তে উন্নীত করা। পুনরাবৃত্তিমূলক গঠন ('এক সে আকাশ', 'এক সে দেশের')—মন্ত্রের মতো ঐক্যের ঘোষণা। ভাষা সহজ, গীতিময়, সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার উপযোগী।
নজরুল-গীতি (নাট্যগীতি, সম্প্রীতি পর্যায়) হিসেবে প্রচলিত; কবিতা হিসেবে 'হিন্দু-মুসলমান' নামে পরিচিত। নজরুলের যুগে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ ছিল ব্রিটিশ 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতির হাতিয়ার; এই পটভূমিতে এই গান ছিল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দর্শনের—'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম'—এই পংক্তি আজ প্রবাদে পরিণত; উপমহাদেশে সম্প্রীতির প্রতিটি অনুষ্ঠানে গানটি গাওয়া হয়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' (১৯৭৯) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী…”
“কবিতা সম্পর্কে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ (১৯৫২) ভাষা-আন্দোলনের প্রথম ও…”