কৃষ্ণকলি
“কবিতা কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে…”
পাল্কী চলে!
পাল্কী চলে!
গগন-তলে
আগুণ জ্বলে!
স্তব্ধ গাঁয়ে
আদুল্ গায়ে
যাচ্ছে কারা
রৌদ্রে সারা!
ময়রা মুদি
চক্ষু মুদি
পাটায় ব’সে
দুলছে ক’সে!
দুধের চাঁছি
শুষছে মাছি,—
উড়ছে কতক
ভন্ ভনিয়ে।—
আস্ছে কারা
হন্ হনিয়ে?
হাটের শেষে
রুক্ষ বেশে
ঠিক দু’পুরে
ধায় হাটুরে!
কুকুর গুলো
শুঁকছে ধূলো,—
ধুঁকছে কেহ
ক্লান্ত দেহ।
ঢুক্ছে গরু
দোকান-ঘরে,
আমের গন্ধে
আমোদ করে!
পাল্কী চলে,
পাল্কী চলে—
দুল্কি চালে
নৃত্য তালে!
ছয় বেহারা,—
জোয়ান তারা,—
গ্রাম ছড়িয়ে
আগ্ বাড়িয়ে
নাম্ল মাঠে
তামার টাটে!
তপ্ত তামা,—
যায় না থামা,—
উঠ্ছে আলে
নাম্ছে গাঢ়ায়,—
পাল্কী দোলে
ঢেউয়ের নাড়ায়।
ঢেউয়ের দোলে
অঙ্গ দোলে,
মেঠো জাহাজ
সাম্নে বাড়ে—
ছয় বেহারার
চরণ-দাঁড়ে।
কাজ্লা সবুজ
কাজল প’রে
পাটের জমী
ঝিমায় দূরে!
ধানের জমী
প্রায় সে নেড়া,
মাঠের বাটে,
কাঁটার বেড়া!
‘সামাল্’ হেঁকে
চল্ল বেঁকে
ছয় বেহারা,—
মর্দ্দ তারা।
জোর হাঁটুনি
খাট্নি ভারি;
মাঠের শেষে
তালের সারি।
তাকাই দূরে,
শূন্যে ঘুরে
চিল্ ফুকারে
মাঠের পারে।
গরুর বাথান,—
গোয়াল-থানা,—
ওই গো! গাঁয়ের
ওই সীমানা!
বৈরাগী সে,—
কণ্ঠী বাঁধা,—
ঘরের কাঁথে
লেপ্ছে কাদা;
মট্কা থেকে
চাষার ছেলে
দেখছে,—ডাগর
চক্ষু মেলে!—
দিচ্ছে চালে
পোয়াল গুছি;
বৈরাগীটির
মূর্ত্তি শুচি।
পর্জাপতি
হলুদ বরণ,—
শশার ফুলে
রাখছে চরণ!
কার বহুড়ি
বাসন মাজে?—
পুকুর ঘাটে
ব্যস্ত কাজে,—
এঁটো হাতেই
হাতের পোছায়
গায়ের মাথার
কাপড় গোছায়।
পাল্কী দেখে
আস্ছে ছুটে
ন্যাংটা খোকা,—
মাথায় পুঁটে!,
পোড়োর আওয়াজ
যাচ্ছে শোনা;—
খোড়ো ঘরে
চাঁদের কোণা।
পাঠশালাটি
দোকান-ঘরে,
গুরু মশাই
দোকান করে!,
পোড়ো ভিটের
পোতার পরে
শালিক নাচে,
ছাগল চরে।
গ্রামের শেষে
অশথ-তলে
বুনোর ডেরায়
চুল্লী জ্বলে;
টাট্কা কাঁচা
শাল-পাতাতে
উড়ছে ধোঁয়া
ফ্যান্সা ভাতে।
গ্রামের সীমা
ছাড়িয়ে ফিরে
পাল্কী মাঠ
নাম্ল ধীরে;
আবার মাঠে,—
তামার টাটে,—
কেউ ছোটে কেউ
কষ্টে হাঁটে;
মাঠের মাটি
রৌদ্রে ফাটে,
পাল্কী মাতে
আপন নাটে!
শঙ্খ-চিলের
সঙ্গে যেচে—
পাল্লা দিয়ে
মেঘ চলেছে!
তাতারসির
তপ্ত রসে
বাতাস সাঁতার
দেয় হরষে!
গঙ্গা ফড়িং
লাফিয়ে চলে;
বাঁধের দিকে
সূর্য্য ঢলে।
পাল্কী চলে রে!
অঙ্গ ঢলে রে!
আর দেরী কত?
আরো কত দূর?
দুপুরের প্রখর রোদে ছয়জন বেহারা পালকি কাঁধে গ্রামের পথে চলেছে। তাদের যাত্রাপথে পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার চলমান ছবি—পাটায় বসে ঢুলছে ময়রা-মুদি, দুধের চাঁছি শুষছে মাছি, হাটের শেষে ধায় হাটুরে, ধুঁকছে কুকুর, দোকান-ঘরে ঢুকছে গরু। গ্রাম ছাড়িয়ে পালকি নামে তপ্ত মাঠে—'তপ্ত তামা, যায় না থামা'। পথে পড়ে বৈরাগী, চাষার ছেলে, বাসন-মাজা বধূ, ন্যাংটা খোকা, পাঠশালা-দোকান। দিন শেষে 'বাঁধের দিকে সূর্য্য ঢলে' আর বেজে ওঠে প্রশ্ন—'আর দেরী কত? আরো কত দূর?' সংক্ষেপে, এটি গ্রামবাংলার শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগীত—ছন্দে বাঁধা এক চলমান চিত্রপ্রদর্শনী।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে বলা হয় 'ছন্দের যাদুকর'—আর 'পালকির গান' সেই যাদুর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯১২ সালে 'কুহু ও কেকা' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত এই কবিতা পড়লে মনে হয়, পালকির বেহারাদের পায়ের তাল যেন পংক্তিতে পংক্তিতে বেজে চলেছে। 'পাল্কী চলে! পাল্কী চলে! গগন-তলে আগুণ জ্বলে!'—এই উদ্বোধনেই কবিতার ছন্দ-ইঞ্জিন চালু হয়ে যায়; তারপর আর থামে না। কবিতার বিষয় অতি সাধারণ—দুপুরের রোদে ছয় বেহারা পালকি কাঁধে গ্রামের পথে চলেছে। কিন্তু এই সাধারণ দৃশ্যকে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রূপ দিয়েছেন এক চলমান চিত্রপ্রদর্শনীতে। পালকির সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার দুপুর: পাটায় বসে ঢুলছে ময়রা-মুদি, দুধের চাঁছি শুষছে মাছি, হাটুরে ধায় হাটের শেষে, কুকুর শুঁকছে ধুলো, দোকান-ঘরে ঢুকছে গরু। প্রতিটি চিত্র মাত্র দু-তিনটি শব্দে আঁকা—'স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল্ গায়ে যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারা'—এই চারটি খণ্ডচিত্রেই দুপুরের নিস্তব্ধতা ও প্রখরতা ধরা পড়ে। কবিতার দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্য বদলায়—গ্রাম ছাড়িয়ে পালকি নামে মাঠে। 'তপ্ত তামা, যায় না থামা'—মাঠের রোদে তামার মতো তেতে ওঠা পথ; 'পাল্কী দোলে ঢেউয়ের নাড়ায়'—বেহারাদের চলনে পালকির দোলা যেন নৌকার ঢেউ। 'মেঠো জাহাজ সাম্নে বাড়ে ছয় বেহারার চরণ-দাঁড়ে'—এই রূপকটি অসাধারণ: মাঠের বুকে পালকি যেন জাহাজ, আর বেহারাদের পা যেন দাঁড়। শ্রমজীবী মানুষের শ্রমকে কবি দিয়েছেন মহাকাব্যিক মর্যাদা। ছন্দের কারিগরি লক্ষণীয়। ছোটো ছোটো পংক্তি, প্রতি পংক্তিতে দুটি করে ধ্বনি-খণ্ড, অনুপ্রাসের ঘন বুনন—'তপ্ত তামা, যায় না থামা', 'জোর হাঁটুনি খাট্নি ভারি'। এই গঠন বেহারাদের পায়ের তালেরই প্রতিরূপ—একটানা, ক্লান্তিহীন। পড়তে পড়তে পাঠকের শ্বাসও যেন বেহারাদের সঙ্গে তাল মেলায়। কবিতার শেষে দিগন্ত প্রসারিত হয়—'শঙ্খ-চিলের সঙ্গে যেচে পাল্লা দিয়ে মেঘ চলেছে', 'গঙ্গা ফড়িং লাফিয়ে চলে; বাঁধের দিকে সূর্য্য ঢলে'। দিন শেষের এই চিত্রে শ্রমের মহিমা আর প্রকৃতির বিশালতা এক হয়ে যায়। আর শেষ প্রশ্ন—'আর দেরী কত? আরো কত দূর?'—এ যেন শুধু পালকির যাত্রীর নয়, প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের প্রশ্ন। 'পালকির গান' স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে—চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইতে এর সংক্ষিপ্ত রূপ পড়ানো হয়। কিন্তু পূর্ণ কবিতাটি পড়লে বোঝা যায়, এটি শুধু শিশুতোষ ছড়া নয়—এটি গ্রামবাংলার শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগীত, ছন্দের যাদুকরের হাতে যা হয়ে উঠেছে কালজয়ী।
গ্রামবাংলা, শ্রমজীবী মানুষ, ছন্দ
ছোটো ছোটো পংক্তি, প্রতি পংক্তিতে ধ্বনি-খণ্ডের পুনরাবৃত্তি—বেহারাদের পায়ের তালের প্রতিরূপ। অনুপ্রাসের ঘন বুনন ('তপ্ত তামা, যায় না থামা')। খণ্ডচিত্রের মালা—প্রতিটি দৃশ্য দু-তিন শব্দে আঁকা। 'মেঠো জাহাজ'—শ্রমকে মহাকাব্যিক মর্যাদা দেওয়া রূপক। ১৯১২-র মুদ্রণ-বানান (পাল্কী, হসন্ত-চিহ্ন) মূল পাঠের ঐতিহ্য বহন করে।
১৯১২ সালে 'কুহু ও কেকা' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২–১৯২২) তখন বাংলা কবিতায় ছন্দ-পরীক্ষার পুরোধা; তাঁকে 'ছন্দের যাদুকর' বলা হয়। এই কবিতা পরে 'সন্দেশ' পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের চতুর্থ শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইতে কবিতাটির সংক্ষিপ্ত রূপ অন্তর্ভুক্ত—ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীর কাছে এটি পরিচিত। পূর্ণ পাঠে এটি গ্রামবাংলার শ্রমজীবনের মহাকাব্যিক উদ্যাপন।
“কবিতা কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'খুকি ও কাঠবেড়ালি' বাংলা শিশুতোষ কবিতার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনাগুলোর…”
“কবিতা বাবুরাম সাপুড়ে, কোথা যাস্ বাপুরে? আয় বাবা দেখে যা, দুটো সাপ রেখে যা—…”
“কবিতা সম্পর্কে বন্দে আলী মিয়ার 'ময়নামতির চর' নদী-চরের প্রকৃতি ও গ্রামবাংলার জীবনের সুবিদিত কবিতা…”