ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
বন্দে আলী মিয়ার ‘ময়নামতির চর’ নদী-চরের প্রকৃতি ও গ্রামবাংলার জীবনের সুবিদিত কবিতা — কবির নামের কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা। বুনো ঝাউ, বুড়ো বট আর শুকনো গাঙের তটের এই চিত্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠকের মনে গেঁথে আছে।
এ-পারের এই বুনো ঝাউ আর ও পারের বুড়ো বট
মাঝখানে তার আগাছায় ভরা শুকনো গাঙের তট;— বন্দে আলী মিয়া, ‘ময়নামতির চর’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
'ময়নামতির চর' কবিতায় কবি ময়নামতির চরের প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকেন — এ-পারের বুনো ঝাউ, ও-পারের বুড়ো বট, মাঝখানে আগাছায় ভরা শুকনো গাঙের তট। নদীর চর — বর্ষায় ডুবে যাওয়া, শীতে জেগে ওঠা ভূমি — বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক জীবনের প্রতীক। কবিতাটি এই চরের প্রকৃতি, তার রূপ-বদল, আর চর-জীবনের মানুষের সুখ-দুঃখের চিত্র তুলে ধরে। বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়; গ্রামের মানুষের প্রাণের সঙ্গে একাত্ম এক সত্তা। 'ময়নামতির চর' কাব্যগ্রন্থের এই নামকবিতা কবির প্রকৃতি-চেতনার শ্রেষ্ঠ প্রকাশগুলির একটি।
বন্দে আলী মিয়া বাংলা সাহিত্যে পরিচিত শিশুসাহিত্যিক হিসেবে — 'চোর জামাই', 'মেঘকুমারী'র মতো বইয়ের লেখক — কিন্তু তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক কবিতায় প্রকৃতি-চেতনার যে গভীরতা, 'ময়নামতির চর' তার প্রমাণ। কবিতার শুরুতেই চিত্রটি সম্পূর্ণ: 'এ-পারের এই বুনো ঝাউ আর ও পারের বুড়ো বট / মাঝখানে তার আগাছায় ভরা শুকনো গাঙের তট' — দুই পংক্তিতে একটি সমগ্র ভূদৃশ্য। লক্ষণীয় শব্দ-নির্বাচন: 'বুনো' ঝাউ — অকৃত্রিম, বন্য; 'বুড়ো' বট — প্রাচীন, প্রজ্ঞাময়; 'শুকনো' গাঙ — নদীর অনুপস্থিতিও এখানে উপস্থিতি। এই তিনটি বিশেষণেই চরের চরিত্র ফুটে ওঠে — রুক্ষ, প্রাচীন, অপেক্ষমান। চর বাংলাদেশের নদী-সভ্যতার সবচেয়ে নাটকীয় ভূমি — বর্ষায় নদীগর্ভে বিলীন, হেমন্তে জেগে ওঠা; এই জাগরণ-বিলীনতার চক্রে চরের মানুষের জীবনও আবর্তিত। বন্দে আলী মিয়া এই ভূগোলকে শুধু বর্ণনা করেন না; তাকে মানবিক অর্থ দেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি নিসর্গ-পূজার বিষয় নয়, মানুষের সহবাসী — যেমন জীবনানন্দের প্রকৃতি স্বপ্নময়, জসীমউদ্দীনের প্রকৃতি গ্রাম্য-সরল, বন্দে আলী মিয়ার প্রকৃতি তেমনি শিশুসুলভ বিস্ময় ও মমতায় ভরা। 'ময়নামতির চর' কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা হিসেবে এই কবিতা কবির আত্মপরিচয়ের মতো — ময়নামতির (কুমিল্লার) লালমাই পাহাড়-অঞ্চলের স্মৃতি তাঁর শৈশবের; চরের এই চিত্রে সেই শৈশব-ভূগোলের ছায়া। কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে — ফলে 'বুনো ঝাউ' আর 'বুড়ো বট' এখন বাঙালির সমষ্টিগত স্মৃতির অংশ। স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে দেওয়া হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় কবিতার প্রবেশদ্বার মাত্র। বন্দে আলী মিয়ার শিশুসাহিত্যিক পরিচয় তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক কবিতাকেও প্রভাবিত করেছে — 'ময়নামতির চর'-এর ভাষায় শিশুসুলভ বিস্ময় আছে, জটিলতা নেই; প্রকৃতিকে তিনি দেখেন শিশুর চোখে — কৌতূহলে, মমতায়। এই দৃষ্টিই তাঁকে জসীমউদ্দীন থেকে আলাদা করে — জসীমউদ্দীনের গ্রাম দুঃখের, বন্দে আলী মিয়ার প্রকৃতি বিস্ময়ের। কুমিল্লার ময়নামতি-লালমাই অঞ্চল — বৌদ্ধ-বিহারের ধ্বংসাবশেষের দেশ — কবির শৈশব-ভূগোল; ইতিহাস ও প্রকৃতির এই মিলন তাঁর কবিতায় অনন্য মাত্রা যোগ করে। 'চর' শব্দটিও তাৎপর্যপূর্ণ — চর অস্থায়ী ভূমি, নদীর দান; এই অস্থায়িত্বে বাঙালি জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। পাঠ্যপুস্তক-ইতিহাসে 'ময়নামতির চর' দীর্ঘদিন পঠিত — ফলে কবিতাটি এখন আর শুধু কবিতা নয়, বাঙালি শৈশবের অংশ। এই মর্যাদা খুব কম কবিতাই পায় — 'ময়নামতির চর' তাদের একটি।
প্রকৃতি, গ্রামবাংলা, নদী
চিত্রধর্মী উদ্বোধন — দুই পংক্তিতে সম্পূর্ণ ভূদৃশ্য। বিশেষণ-নির্বাচনে ('বুনো', 'বুড়ো', 'শুকনো') চরের চরিত্রায়ণ। প্রকৃতির মানবিকীকরণ — নিসর্গ মানুষের সহবাসী। সরল, সংগীতময় ভাষা — পাঠ্যপুস্তক-যোগ্য।
বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬–১৯৭৯) — শিশুসাহিত্যিক ও প্রকৃতির কবি। 'ময়নামতীর চর' কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা। কুমিল্লা-অঞ্চলের (ময়নামতি-লালমাই) শৈশব-স্মৃতি কবির প্রকৃতি-চেতনার উৎস। পাঠ্যপুস্তকে সংকলিত হয়ে কবিতাটি সর্বজনীন পরিচিতি পায়। সুনির্দিষ্ট প্রকাশসাল অজ্ঞাত।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”