কেউ কথা রাখেনি
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের ’পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
পুবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে, ধানের খেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেম একা, মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমিই জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এমনি ক’রে কালো কাজল মেঘ জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি ক’রে কালো কোমল ছায়া আষাঢ় মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি ক’রে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার ’পরে দেয় নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায় নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
৪ আষাঢ় [১৩০৭]
মেঘলা দিনে মাঠে কবি দেখেন এক কালো মেয়েকে — গাঁয়ের লোক যাকে শুধু 'কালো' বলে, কবি তাকে বলেন 'কৃষ্ণকলি'। মেয়েটির ঘোমটা নেই, মুক্তবেণী পিঠে লুটিয়ে আছে; তার কালো হরিণ-চোখ কবিকে মুগ্ধ করে। ঘন মেঘে আঁধার হলে শ্যামল গাই ডাকে, মেয়েটি ব্যস্ত পায়ে কুটির থেকে বেরিয়ে আসে। বর্ষার প্রকৃতি — কাজল মেঘ, তমাল-বনের ছায়া, শ্রাবণ-রজনী — মেয়েটির কালো রঙের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। কবি বারবার ঘোষণা করেন: কালো যতই কালো হোক, তিনি দেখেছেন তার কালো হরিণ-চোখ — অর্থাৎ সৌন্দর্য রঙে নয়, দৃষ্টিতে।
রবীন্দ্রনাথের 'কৃষ্ণকলি' (ক্ষণিকা, ১৯০০) বাংলা কবিতার সৌন্দর্যবোধের ইতিহাসে একটি বিপ্লব। কবিতার প্রথম পংক্তিতেই ঘোষণা: 'কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।' — সমাজ যাকে 'কালো' বলে তুচ্ছ করে, কবি তাকেই দেন 'কৃষ্ণকলি' নাম — কৃষ্ণের মতো কালো, কলির মতো ফুল। এই নামকরণেই কবিতার পুরো দর্শন: সৌন্দর্য চোখে নয়, দেখার ভঙ্গিতে। গাঁয়ের লোকের চোখে মেয়েটি শুধুই কালো; কিন্তু কবির চোখে তার 'কালো হরিণ-চোখ' — তুলনাটি লক্ষণীয়: হরিণের চোখ কালো বলেই সুন্দর, সেই কালোই তার শোভা। কবিতার পটভূমি বর্ষার গ্রামবাংলা: মেঘলা দিন, মাঠ, ঘন মেঘে আঁধার, শ্যামল দুটি গাই, ধানের ক্ষেতে ঢেউ খেলানো বাতাস। প্রকৃতির এই কালো — মেঘের কালো, তমাল-বনের ছায়া, শ্রাবণ-রজনীর আঁধার — মেয়েটির গায়ের রঙের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়; কবি দেখান, প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর রূপগুলোই কালো। 'এমনি করে কালো কাজল মেঘ জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে' — এই স্তবক তিন ঋতুর কালোকে এক সুতোয় গাঁথে। মেয়েটির চরিত্রায়ণও অসাধারণ: 'ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে, মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে' — সে লজ্জাশীলা নায়িকা নয়; স্বাধীন, প্রাণবন্ত, নিজের মতো। 'মাথার 'পরে দেয় নি তুলে বাস, লজ্জা পাবার পায় নি অবকাশ' — সমাজের চাপিয়ে দেওয়া লজ্জার বোঝা সে বয় না। কবিতার গঠন সংগীতময়: 'কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ' — এই ধুয়ো প্রতি স্তবকে ফিরে আসে, যেন গানের রিফ্রেন। ১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৪ আষাঢ়ে রচিত এই কবিতা আজও প্রাসঙ্গিক — কারণ গায়ের রঙ নিয়ে বৈষম্য আজও আছে, আর কবির এই উত্তর আজও ততটাই জরুরি: সৌন্দর্য রঙে নয়, দৃষ্টিতে। এই কবিতা শুধু পড়ার নয়, গাওয়ারও — রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে 'কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি' বাংলার ঘরে ঘরে গাওয়া হয়। গান হিসেবে এর জনপ্রিয়তা কবিতাটির ভাবকে আরও ছড়িয়ে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের নারী-ভাবনার দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি বারবার প্রচলিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করেছেন — 'চিত্রাঙ্গদা' নৃত্যনাট্যেও সেই একই বিদ্রোহ। 'কৃষ্ণকলি'র মেয়েটি কোনো রাজকন্যা নয়, সাধারণ গ্রামের মেয়ে; অথচ কবি তাকে দিয়েছেন মহাকাব্যিক মর্যাদা। এই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যবোধই রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা। কবিতার বর্ষা-চিত্রও লক্ষণীয় — বাঙালির প্রাণের ঋতু বর্ষা, আর কবি সেই বর্ষার কালোকেই করেছেন সৌন্দর্যের প্রতীক। আজকের ফর্সা-হওয়ার ক্রিমের বিজ্ঞাপনের যুগে এই কবিতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে; রবীন্দ্রনাথ একশো পঁচিশ বছর আগে যে কথা বলেছিলেন, তা আজও আমাদের সমাজ শোনেনি।
সৌন্দর্যতত্ত্ব, বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদ, প্রকৃতি, নারী
কবিতাটি গীতিধর্মী — 'কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ' ধুয়োটি প্রতি স্তবকে ফিরে এসে গানের রিফ্রেনের কাজ করেছে। 'কৃষ্ণকলি' নামকরণে রূপকের গভীরতা — কৃষ্ণ (কালো) + কলি (ফুল)। প্রকৃতি ও মানবীর একাকারকরণ: মেঘের কালো, তমাল-বনের ছায়া, শ্রাবণ-রজনীর আঁধার মেয়েটির রূপেরই প্রতিচ্ছবি। 'কালো হরিণ-চোখ' উপমায় কালো রঙের সৌন্দর্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ভাষা সহজ কিন্তু চিত্রধর্মী; ছন্দের দোলা কবিতাটিকে গান হিসেবেও জনপ্রিয় করেছে।
১৯০০ সালে 'ক্ষণিকা' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের পরিণত পর্বের রচনা। উনিশ শতকের শেষে বাঙালি সমাজে ফর্সা রঙের প্রতি পক্ষপাত ছিল প্রবল — বিয়ের বাজারে 'কালো মেয়ে' ছিল অবহেলার পাত্র। এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে 'কৃষ্ণকলি' ছিল সরাসরি প্রতিবাদ। কবিতাটি পরে রবীন্দ্রসংগীত হিসেবেও অমর হয়ে আছে।
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”