মূল কন্টেন্টে যান

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে

কবিতা

সব লোকে কয়, লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে, জাতির কি রূপ, দেখলাম না এই নজরে॥

কেউ মালা কেউ তসবীর গলে
তাইত রে জাত ভিন্ন বলে
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়
জাতের চিহ্ন রয় কারে॥

ছুন্নৎ দিলে হয় মুসলমান
নারীর তবে কি হয় বিধান
বামন চিনি পৈতেয় প্রমাণ
বামনী চিনি কি প্রকারে॥

জগৎ বেড়ে জাতির কথা
লোকে গল্প করে যথাতথা
লালন বলে, জাতির ফাৎনা
ডুবিয়েছি সাধ-বাজারে॥

কবিতার সারসংক্ষেপ

লোকে জিজ্ঞেস করে — লালন, তুমি কোন জাতের? লালন পাল্টা বলেন — জাতির কোনো রূপই তো আমি দেখিনি। কেউ গলায় মালা পরে, কেউ তসবী — এই বাইরের চিহ্ন দেখেই জাত ভিন্ন বলা হয়; কিন্তু জন্ম ও মৃত্যুর বেলায় জাতের কোনো চিহ্ন থাকে কি? খৎনা দিলে যদি মুসলমান হয়, তাহলে নারীর ক্ষেত্রে কী বিধান? পৈতে দেখে ব্রাহ্মণ চেনা গেলেও ব্রাহ্মণীকে কী দেখে চেনা যাবে? জগৎজুড়ে জাত নিয়ে লোকে গল্প করে; লালন বলেন — জাতের এই কৃত্রিম ফাৎনা তিনি সাধনার বাজারে ডুবিয়ে দিয়েছেন।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

'সব লোকে কয়, লালন কি জাত সংসারে' — বাউল দর্শনের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ এই গানে। লালনের সময়ে (ঊনবিংশ শতক) বাংলার সমাজ জাত-পাতের কঠোর বেড়াজালে বন্দী; সেই সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লালন প্রশ্ন করেন — জাত আসলে কী? গানের শুরুতেই তিনি সমাজের প্রশ্নটিকে উল্টে দেন: লোকে জিজ্ঞেস করে লালন কোন জাতের; লালন পাল্টা বলেন, 'জাতির কি রূপ, দেখলাম না এই নজরে' — অর্থাৎ জাত নামের বস্তুটির কোনো দৃশ্যমান রূপই নেই, এটি মানুষের বানানো কল্পনা। তারপর একের পর এক যুক্তির আঘাত। 'কেউ মালা কেউ তসবীর গলে, তাইত রে জাত ভিন্ন বলে' — মালা (হিন্দু) আর তসবী (মুসলমান) তো গলার বাইরের জিনিস; ভেতরের মানুষটি তো একই। 'যাওয়া কিম্বা আসার বেলায় জাতের চিহ্ন রয় কারে' — জন্ম ও মৃত্যুর সময় কোনো জাতের চিহ্ন থাকে না; শিশু জন্মায় মানুষ হয়ে, মৃতদেহও হয় শুধুই মৃতদেহ। সবচেয়ে তীক্ষ্ণ আঘাতটি নারীকে কেন্দ্র করে: 'ছুন্নৎ দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কি হয় বিধান' — পুরুষের খৎনা দিয়ে যদি মুসলমানত্ব নির্ধারিত হয়, তাহলে নারীর ক্ষেত্রে কী হবে? আর 'বামন চিনি পৈতেয় প্রমাণ, বামনী চিনি কি প্রকারে' — ব্রাহ্মণকে পৈতে দেখে চেনা গেলেও ব্রাহ্মণীকে কী দেখে চেনা যাবে? এই প্রশ্নগুলো শুধু ধর্মীয় গোঁড়ামিকেই নয়, পিতৃতান্ত্রিক সমাজকেও নাড়া দেয়। শেষে লালন ঘোষণা করেন: 'জাতির ফাৎনা ডুবিয়েছি সাধ-বাজারে' — ফাৎনা হলো মাছ ধরার ভাসমান চিহ্ন; জাতের এই কৃত্রিম চিহ্ন তিনি সাধনার বাজারে ডুবিয়ে দিয়েছেন। বাউল দর্শনের মূল কথা — মানুষের ভেতরেই সত্যের সন্ধান — এই গানে তার সবচেয়ে সরল ও শক্তিশালী রূপ পেয়েছে। আজও, ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদের এই যুগে, লালনের এই প্রশ্ন সমান প্রাসঙ্গিক। লালনের এই গানের প্রভাব শুধু বাউল সমাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রবীন্দ্রনাথ লালনের গানে গভীরভাবে মুগ্ধ ছিলেন; শিলাইদহে থাকার সময় তিনি লালনের শিষ্যদের কাছ থেকে গান শুনতেন, এমনকি লালনের দর্শন তার নিজের মানবতাবাদী চিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছে। বাউল দর্শনের কেন্দ্রীয় তত্ত্ব — 'মানুষের ভেতরেই সত্য' — এই গানে পেয়েছে সবচেয়ে সরল রূপ। গানটি বাউল সুরে গাওয়া হয়; সুরের সরলতাই এর বাণীকে আরও তীক্ষ্ণ করে। আজকের বাংলাদেশে, যেখানে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় নিয়ে বিভেদ বাড়ছে, সেখানে লালনের এই প্রশ্ন — 'জাতির কি রূপ, দেখলাম না এই নজরে' — নতুন করে প্রাসঙ্গিক। এই গান শেখায়, মানুষকে বিচার করতে হয় তার কাজে, তার হৃদয়ে — জন্মের চিহ্নে নয়। লালন কোনো পুঁথি লেখেননি, কোনো প্রতিষ্ঠান গড়েননি; শুধু গান গেয়ে গেছেন — আর সেই গানই হয়ে আছে বাংলার বিবেকের কণ্ঠস্বর।

প্রধান ভাব ও বার্তা

জাত-বিরোধিতা, মানবতাবাদ, বাউল দর্শন, ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

গানটি প্রশ্নোত্তর-কাঠামোয় গড়া — সমাজের প্রশ্নের জবাবে লালনের পাল্টা প্রশ্ন, যা শ্রোতাকে চিন্তায় বাধ্য করে। যুক্তির ধারাবাহিক আঘাত: বাইরের চিহ্ন বনাম ভেতরের মানুষ, জন্ম-মৃত্যুর সার্বজনীনতা, নারী-প্রসঙ্গ — প্রতিটি স্তবক একটি করে যুক্তি। 'ফাৎনা ডুবিয়েছি সাধ-বাজারে' — লোকজ উপমায় দার্শনিক ঘোষণা। ভাষা সরল, কিন্তু প্রতিটি পংক্তি প্রশ্নবাণে তীক্ষ্ণ। গান হিসেবে গাওয়ার উপযোগী পুনরাবৃত্তিমূলক ধুয়ো-কাঠামো।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

ঊনবিংশ শতকের বাংলায় জাত-পাতের কঠোরতা ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে; একই সময়ে ব্রাহ্মসমাজসহ সংস্কার আন্দোলনও চলছিল। লালন (আনুমানিক ১৭৭৪–১৮৯০) কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলনের অংশ ছিলেন না — তিনি ছিলেন বাউল সাধক, যার গান মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত। রবীন্দ্রনাথ লালনের গানে মুগ্ধ ছিলেন এবং তার দর্শন রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদেও প্রতিফলিত হয়। 'লালন-গীতিকা' সংকলন (১৯৫৮) এই মৌখিক ঐতিহ্যকে মুদ্রিত রূপ দেয়।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।