ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
আমি অন্তঃপুরের মেয়ে, চিনবে না আমাকে। তোমার শেষ গল্পের বইটি পড়েচি, শরৎবাবু, “বাসি ফুলের মালা।”— তোমার নায়িকা এলোকেশীর মরণদশা ধরেছিল পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে। পঁচিশ বছর বয়সের সঙ্গে ছিল তার রেশারেশি, দেখলেম, তুমি মহদাশয় বটে, জিতিয়ে দিলে তাকে।
নিজের কথা বলি।
বয়স আমার অল্প। একজনের মন ছুঁয়েছিল আমার এই কাঁচা বয়সের মায়া।
তাই জেনে পুলক লাগত আমার দেহে,— ভুলে গিয়েছিলেম, অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে আমি। আমার মতো এমন আছে হাজার হাজার মেয়ে অল্প বয়সের মন্ত্র তাদের যৌবনে।
তোমাকে দোহাই দিই
একটি সাধারণ মেয়ের গল্প লেখো তুমি। বড়ো দুঃখ তার। তারো স্বভাবের গভীরে অসাধারণ যদি কিছু তলিয়ে থাকে কোথাও, কেমন করে প্রমাণ করবে সে, এমন ক-জন মেলে যারা তা ধরতে পারে।
কাঁচাবয়সের জাদু লাগে ওদের চোখে, মন যায় না সত্যের খোঁজে, আমরা বিকিয়ে যাই মরীচিকার দামে।
কথাটা কেন উঠল তা বলি। মনে করো তার নাম নরেশ।
সে বলেছিল কেউ তার চোখে পড়েনি আমার মতো। এত বড়ো কথাটা বিশ্বাস করব-যে সাহস হয় না,— না করব-যে এমন জোর কই।
একদিন সে গেল বিলেতে। চিঠিপত্র পাই কখনো বা।
মনে মনে ভাবি, রাম রাম, এত মেয়েও আছে সে দেশে, এত তাদের ঠেলাঠেলি ভিড়।
আর তারা কি সবাই অসামান্য, এত বুদ্ধি, এত উজ্জ্বলতা।
আর তারা সবাই কি আবিষ্কার করেচে এক নরেশ সেনকে স্বদেশে যার পরিচয় চাপা ছিল দশের মধ্যে।
গেল মেল-এর চিঠিতে লিখেচে লিজির সঙ্গে গিয়েছিল সমুদ্রে নাইতে। বাঙালী কবির কবিতা ক-লাইন দিয়েচে তুলে, সেই যেখানে ঊর্ধ্বশী উঠচে সমুদ্র থেকে। তার পরে বালির পরে বসল পাশাপাশি,—
সামনে দুলচে নীল সমুদ্রের ঢেউ, আকাশে ছড়ানো নির্ম্মল সূর্য্যালোক। লিজি তাকে খুব আস্তে আস্তে বল্লে,
“এই সেদিন তুমি এসেচ, দুদিন পরে যাবে চলে, ঝিনুকের দুটি খোলা, মাঝখানটুকু ভরা থাক্ একটি নিরেট অশ্রুবিন্দু দিয়ে,— দুর্লভ মূল্যহীন।” কথা বলবার কী অসামান্য ভঙ্গী
সেই সঙ্গে নরেশ লিখেচে “কথাগুলি যদি বানানো হয় দোষ কী, কিন্তু চমৎকার,— হীরে-বসানো সোনার ফুল কি সত্য, তবুও কি সত্য নয়?” বুঝতেই পারচ,
একটা তুলনার সঙ্কেত ওর চিঠিতে অদৃশ্য কাঁটার মতো
আমার বুকের কাছে বিঁধিয়ে দিয়ে জানায়- আমি অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে।
মূল্যবানকে পূরো মূল্য চুকিয়ে দিই এমন ধন নেই আমার হাতে। ওগো না হয় তাই হোলো, না হয় ঋণীই রইলেম চিরজীবন।
পায়ে পড়ি তোমার, একটা গল্প লেখো তুমি, শরৎবাবু, নিতান্ত সাধারণ মেয়ের গল্প,—
যে দুর্ভাগিনীকে দূরের থেকে পাল্লা দিতে হয় অন্তত পাঁচ সাতজন অসামান্যার সঙ্গে- অর্থাৎ সপ্তরথিনীর মার।
বুঝে নিয়েচি আমার কপাল ভেঙেচে, হার হয়েছে আমার। কিন্তু তুমি যার কথা লিখবে, তাকে জিতিয়ে দিয়ো আমার হয়ে, পড়তে পড়তে বুক যেন ওঠে ফুলে। ফুল চন্দন পড়ুক তোমার কলমের মুখে।
তাকে নাম দিয়ো মালতী। ঐ নামটা আমার। ধরা পড়বার ভয় নেই; এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে, তারা সবাই সামান্য মেয়ে, তারা ফরাসী জর্ম্মান জানে না, কাঁদতে জানে।
কী করে জিতিয়ে দেবে।
উচ্চ তোমার মন, তোমার লেখনী মহীয়সী। তুমি হয়তো ওকে নিয়ে যাবে আগের পথে, দুঃখের চরমে, শকুন্তলার মতো। দয়া কোরো আমাকে। নেমে এসো আমার সমতলে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাত্রির অন্ধকারে
দেবতার কাছে যে অসম্ভব বর মাগি – সে বর আমি পাব না, কিন্তু পায় যেন তোমার নায়িকা। রাখ না কেন নরেশকে সাতবছর লণ্ডনে, বারে বারে ফেল করুক তার পরীক্ষায়, আদরে থাক্ আপন উপাসিকা-মণ্ডলীতে। ইতিমধ্যে মালতী পাস করুক এম, এ, কলকাতা বিদ্যালয়ে, গণিতে হোক প্রথম, তোমার কলমের এক আঁচড়ে। কিন্তু ঐখানেই যদি থামো তোমার সাহিত্য-সম্রাট নামে পড়বে কলঙ্ক। আমার দশা যাই হোক খাটো কোরো না তোমার কল্পনা। তুমি তো কৃপণ নও বিধাতার মতো।
মেয়েটাকে দাও পাঠিয়ে য়ুরোপে। সেখানে যারা জ্ঞানী যারা বিদ্বান যারা বীর, যারা কবি যারা শিল্পী যারা রাজা, দল বেঁধে আসুক ওর চারদিকে। জ্যোতির্বিদের মতো আবিষ্কার করুক ওকে, শুধু বিদুষী বলে নয়, নারী বলে।
ওর মধ্যে যে বিশ্ববিজয়ী জাদু আছে ধরা পড়ুক তার রহস্য, মূঢ়ের দেশে নয়, যে দেশে আছে সমজদার, আছে দরদী, আছে ইংরেজ, জর্ম্মান, ফরাসী। মালতীর সম্মানের জন্য সভা ডাকা হোক্ না,— বড়ো বড়ো নামজাদার সভা।
মনে করা যাক্ সেখানে বর্ষণ হচ্চে মুষলধারে চাটুবাক্য, মাঝখান দিয়ে সে চলেচে অবহেলায়- ঢেউয়ের উপর দিয়ে যেন পালের নৌকো। ওর চোখ দেখে ওরা করচে কানাকানি,
সবাই বলচে, ভারতবর্ষের সজল মেঘ আর উজ্জ্বল রৌদ্র মিলেচে ওর মোহিনী দৃষ্টিতে।
(এইখানে জনান্তিকে বলে রাখি, সৃষ্টিকর্ত্তার প্রসাদ সত্যই আছে আমার চোখে। বলতে হোলো নিজের মুখেই, এখনো কোনো য়ুরোপীয় রসজ্ঞের সাক্ষাৎ ঘটেনি কপালে।) নরেশ এসে দাঁড়াক সেই কোণে, আর তার সেই অসামান্য মেয়ের দল। আর তার পরে? তার পরে আমার নটে শাকটি মুড়োলো, স্বপ্ন আমার ফুরোলো। হায়রে সামান্য মেয়ে বিধাতার শক্তির অপব্যয়॥
২৯ শ্রাবণ, ১৩৩৯
মালতী নামের এক সাধারণ মেয়ে শরৎবাবুকে চিঠি লিখছে। সে জানে, সে অসাধারণ নয় — নরেশ নামের এক যুবক একদিন বলেছিল তার চোখে আর কেউ পড়েনি তার মতো; কিন্তু বিলেত গিয়ে লিজির মতো অসামান্য, বুদ্ধিমতী, উজ্জ্বল মেয়েদের ভিড়ে নরেশ হারিয়ে গেছে, আর তার চিঠির 'অদৃশ্য কাঁটা' মালতীর বুকে বিঁধিয়ে জানিয়ে দেয় — সে অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে। তাই মালতী শরৎচন্দ্রকে দোহাই দেয়: একটি নিতান্ত সাধারণ মেয়ের গল্প লিখুন, তাকে জিতিয়ে দিন — 'পড়তে পড়তে বুক যেন ওঠে ফুলে'। সে নিজেই কল্পনার ছক সাজিয়ে দেয়: নরেশ সাত বছর লন্ডনে থেকে বারে বারে পরীক্ষায় ফেল করুক; মালতী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে প্রথম হয়ে এমএ পাস করুক; য়ুরোপে গিয়ে জ্ঞানী-বিদ্বান-বীর-কবি-শিল্পী-রাজার সভায় সে সম্মানিত হোক — শুধু বিদুষী বলে নয়, নারী বলে; নরেশ এসে দাঁড়াক সেই কোণে, তার অসামান্য মেয়েদের দল নিয়ে। তারপর হঠাৎ কল্পনার পর্দা সরে যায় — 'আমার নটে শাকটি মুড়োলো, স্বপ্ন আমার ফুরোলো' — ফিরে আসে বাস্তব: 'হায়রে সামান্য মেয়ে বিধাতার শক্তির অপব্যয়॥'
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বাসি ফুলের মালা' গল্প পড়ে মালতীর চিঠি — এই ভঙ্গিতেই 'সাধারণ মেয়ে'র শৈল্পিক চমক। রবীন্দ্রনাথ নিজে আড়ালে থেকে কলম তুলে দিয়েছেন এক সাধারণ মেয়ের হাতে; কবিতাটি তাই একই সঙ্গে কবিতা ও সমালোচনা — শরৎচন্দ্রের নায়িকা এলোকেশীর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের মরণদশার প্রতি ইঙ্গিত করে মালতী যেন বলে, অসামান্য নারীর গল্প তো অনেক হলো, এবার সাধারণ মেয়ের গল্প লিখুন। এই দাবির মধ্যে লুকিয়ে আছে তৎকালীন সাহিত্যের পুরুষ-দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি নীরব প্রতিবাদ। মালতীর কল্পনা লক্ষণীয় — সে শরৎচন্দ্রকে শকুন্তলার মতো 'দুঃখের চরমে' নিয়ে যাওয়ার পথ বাতিল করে দেয়; দয়া করে 'নেমে এসো আমার সমতলে' বলে সে চায় বাস্তবসম্মত জয়। নরেশের সাত বছর লন্ডনে ফেল করা, মালতীর গণিতে প্রথম হয়ে এমএ পাস — এই কল্পনা শুধু প্রতিশোধ নয়; শিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে নারীর সম-অধিকারের দাবি। য়ুরোপের সভায় 'শুধু বিদুষী বলে নয়, নারী বলে' আবিষ্কৃত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা — নারীত্বকেই মর্যাদার ভিত্তি করার দাবি — ১৯৩২ সালের পক্ষে অগ্রসর চিন্তা। 'সপ্তরথিনীর মার' উপমাটি অসাধারণ — মহাভারতের অভিমন্যু-বধের স্মৃতি টেনে মালতী বোঝায়, একজন সাধারণ মেয়েকে লড়তে হয় একসঙ্গে পাঁচ-সাতজন অসামান্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে; এ লড়াই অসম। ঝিনুকের দুটি খোলার মধ্যে 'নিরেট অশ্রুবিন্দু' — লিজির এই উক্তি উদ্ধৃত করে মালতী দেখায়, ভাষার চমকেও সে হেরে যায়। কিন্তু কবিতার শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত শেষে — দীর্ঘ কল্পনার পর এক লহমায় স্বপ্নভঙ্গ। 'আমার নটে শাকটি মুড়োলো' — রূপকথার সমাপ্তি-সূত্র ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দেন, এই জয় কল্পনাতেই সম্ভব; বাস্তবে মালতীরা হেরেই যায়। এই তিক্ত-মধুর সমাপ্তিই কবিতাটিকে শুধু নারীবাদী ইশতেহার না রেখে মহৎ সাহিত্য করে তোলে — কল্পনা এখানে পলায়ন নয়, প্রতিরোধের একমাত্র অস্ত্র। গদ্যকবিতার ঢিলেঢালা চালে চিঠির স্বর, মাঝে মাঝে ছন্দের ঝলক, আর শেষে ২৯ শ্রাবণ ১৩৩৯ তারিখ — 'পুনশ্চ' পর্বের রবীন্দ্রনাথের পরিণত শিল্পের নিদর্শন। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক সম্পর্কও এখানে প্রাসঙ্গিক — শরৎচন্দ্র তখন বাঙালি পাঠকের সবচেয়ে প্রিয় ঔপন্যাসিক, নারী-চরিত্রের স্রষ্টা হিসেবে খ্যাত; তাঁকেই এই চিঠি লেখানোয় রবীন্দ্রনাথ যেন জনপ্রিয় সাহিত্যের দরবারে সাধারণ মেয়ের মামলা দায়ের করেন। 'ফুল চন্দন পড়ুক তোমার কলমের মুখে' — আশীর্বাদের এই ভঙ্গিতে লুকিয়ে আছে তীব্র ব্যঙ্গ: লেখকের কলমই তো বিধাতা, সে চাইলেই মালতীকে জিতিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শেষে কবি সেই আশ্বাসও ফিরিয়ে নেন — স্বপ্ন ফুরোলো, রইল শুধু 'বিধাতার শক্তির অপব্যয়' বলে দীর্ঘশ্বাস। এই দীর্ঘশ্বাসই কবিতাটিকে আবেগের ঊর্ধ্বে তুলে শিল্পে পরিণত করে।
নারীর আত্মমর্যাদা, কল্পনা ও বাস্তব, সাহিত্যে নারী
শরৎচন্দ্রকে লেখা পত্রাকারে গদ্যকবিতা; কবির আত্মগোপন — নায়িকার কণ্ঠে সম্পূর্ণ কবিতা। 'সপ্তরথিনীর মার', 'ঝিনুকের দুটি খোলা'র মতো পৌরাণিক ও চিত্রধর্মী রূপক। দীর্ঘ কল্পনা-বিলাসের পর আকস্মিক স্বপ্নভঙ্গ — 'আমার নটে শাকটি মুড়োলো'। শেষে তারিখাঙ্কন (২৯ শ্রাবণ, ১৩৩৯) — 'পুনশ্চ' কাব্যের বৈশিষ্ট্য। সংলাপধর্মী, গদ্যচালিত ভাষায় মাঝে মাঝে কাব্যিক উচ্ছ্বাস।
১৯৩২ সালে 'পুনশ্চ' কাব্যে প্রকাশিত — রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতার পরিণত পর্ব। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তখন বাংলার জনপ্রিয়তম ঔপন্যাসিক; তাঁর 'বাসি ফুলের মালা' গল্পের নায়িকা এলোকেশীর প্রসঙ্গ টেনে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নারী-চরিত্রের প্রশ্ন তোলেন। উনিশ-শত তিরিশের দশকে নারীশিক্ষা ও নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পটভূমিতে এই কবিতা বিশেষ তাৎপর্য পায়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”