ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শতরূপে শতবার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধ’রে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীত-হার;
কত রূপ ধ’রে পরেছ গলায় নিয়েছ সে উপহার,
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহ-মিলন-কথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমির-রজনী ভেদিয়া তোমারি মুরতি এসে,
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।
আমরা দু-জনে ভাসিয়া এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে,
অনাদি কালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা কোটি প্রেমিকের মাঝে,
বিরহ-বিধুর নয়ন-সলিলে মিলন-মধুর লাজে।
পুরাতন প্রেম নিত্য-নূতন সাজে।
আজি সেই চিরদিবসের প্রেম অবসান লভিয়াছে
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
নিখিলের সুখ নিখিলের দুখ, নিখিল প্রাণের প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশিছে সকল প্রেমের স্মৃতি,
সকল কালের সকল কবির গীতি।
জোড়াসাঁকো
২ ভাদ্র, ১২৯৬
—মানসী
কবি অনুভব করেন — যেন যুগে যুগে, জন্মে জন্মে তিনি একই প্রিয়াকে ভালোবেসেছেন, শত রূপে শতবার। চিরকাল ধরে তার মুগ্ধ হৃদয় গানের হার গেঁথেছে, প্রিয়া তা গলায় পরেছেন। অতীতের সব প্রেমকাহিনি শুনতে শুনতে কালের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে ওঠে প্রিয়ার মূর্তি — চিরস্মৃতিময় ধ্রুবতারার বেশে। দুজনে ভেসে এসেছেন যুগল প্রেমের স্রোতে, অনাদি কালের হৃদয়-উৎস থেকে; কোটি প্রেমিকের মাঝে খেলা করেছেন বিরহ ও মিলনের। শেষে ব্যক্তিগত প্রেম সার্বজনীনতায় উত্তীর্ণ হয় — একটি প্রেমের মাঝে মিশে যায় নিখিলের সুখ-দুঃখ, সব প্রেমের স্মৃতি, সব কালের সব কবির গীতি।
রবীন্দ্রনাথের 'অনন্ত প্রেম' (মানসী, ১৮৯০) প্রেমকে দেখেছে জন্ম-মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে — যেন প্রেম কোনো এক জীবনের ঘটনা নয়, অনাদি কালের স্রোত। কবিতার প্রথম পংক্তিই ঘোষণা: 'তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শতরূপে শতবার, জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।' — এই 'যেন' শব্দটি লক্ষণীয়; কবি নিশ্চিত দাবি করেন না, বরং অনুভবের গভীর থেকে বলেন — মনে হয়, যেন যুগে যুগে তোমাকেই ভালোবেসেছি। এই সংশয়-মেশানো নিশ্চয়তাই কবিতাটির দার্শনিক সৌন্দর্য। রবীন্দ্রনাথ এখানে ভারতীয় দর্শনের জন্মান্তরবাদকে প্রেমের কবিতায় রূপ দিয়েছেন — কিন্তু তাকে কোনো ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে নয়, অনুভূতির সত্য হিসেবে। 'চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীত-হার' — প্রেম এখানে শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ক নয়; তা সৃজনশীলতারও উৎস — হৃদয় গান গাঁথে, কবি কবিতা লেখেন। দ্বিতীয় স্তবকে অতীতের দিকে তাকান কবি: 'যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা' — মানবসভ্যতার সব প্রেমকাহিনি যেন তার নিজেরই কাহিনি; 'অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে দেখা দেয় অবশেষে কালের তিমির-রজনী ভেদিয়া তোমারি মুরতি এসে' — অতীতের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে ওঠে প্রিয়ার মূর্তি, 'চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে' — ধ্রুবতারা যেমন দিক হারানো নাবিকের নিশানা, তেমনি এই প্রেম কালের স্রোতে ভাসমান মানবের নিশানা। তৃতীয় স্তবকে 'আমরা দু-জনে ভাসিয়া এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে, অনাদি কালের হৃদয়-উৎস হতে' — প্রেমের উৎসকে কবি দেখেন মহাজাগতিক; দুটি হৃদয় মিলেছে কারণ তারা একই উৎস থেকে ভেসে এসেছে। শেষ স্তবকে ব্যক্তিগত প্রেম সার্বজনীনতায় উত্তীর্ণ হয়: 'নিখিলের সুখ নিখিলের দুখ, নিখিল প্রাণের প্রীতি, একটি প্রেমের মাঝারে মিশিছে সকল প্রেমের স্মৃতি, সকল কালের সকল কবির গীতি।' — আমার প্রেম আর শুধু আমার নয়; তাতে মিশে আছে সব প্রেমিকের স্মৃতি, সব কবির গান। ২ ভাদ্র ১২৯৬-এ জোড়াসাঁকোতে রচিত এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের যৌবনের প্রেম-দর্শনের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ; পরবর্তীকালে 'গীতাঞ্জলি'র বিশ্বপ্রেমের বীজ এখানেই নিহিত। 'মানসী' পর্বের এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের প্রেম-দর্শনের একটি সন্ধিক্ষণ চিহ্নিত করে। এর আগে 'মানসী'তেই তিনি লিখেছিলেন 'বধূ'র মতো বাস্তব প্রেমের কবিতা; 'অনন্ত প্রেম'-এ সেই প্রেম উত্তীর্ণ হয় দার্শনিকতায়। এই ধারাই পরবর্তীকালে 'গীতাঞ্জলি'তে পূর্ণতা পায় — যেখানে প্রেম আর শুধু মানব-মানবীর নয়, জীবাত্মা-পরমাত্মার। 'চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে' — এই উপমাটি বিশেষভাবে অর্থবহ: ধ্রুবতারা স্থির, অনড়, দিক্নির্দেশক; প্রেমও তেমনি কালের স্রোতে ভাসমান মানুষের স্থির নিশানা। কবিতাটি গান হিসেবেও জনপ্রিয়; সুরে বাঁধা পড়ে এর দার্শনিক গভীরতা আরও সহজে হৃদয়ে পৌঁছায়। রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য — প্রিয়া কখনো শুধু রক্তমাংসের মানুষ থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন আদর্শের প্রতিমা। 'অনন্ত প্রেম'-এ এই রূপান্তর সবচেয়ে স্পষ্ট। আজও প্রেমিক-প্রেমিকারা এই কবিতা উদ্ধৃত করেন; কারণ প্রতিটি গভীর প্রেমই নিজেকে অনন্ত বলে মনে করে — রবীন্দ্রনাথ শুধু সেই অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছেন।
প্রেম, জন্মান্তর, কাল, সার্বজনীনতা
কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত, ধীর ও গম্ভীর লয়ে — যা প্রেমের শাশ্বত ভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। 'জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার' — এই ধুয়োর পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে দিয়েছে মন্ত্রের মতো গভীরতা। 'যেন' শব্দের ব্যবহারে সংশয়-মেশানো নিশ্চয়তা — দার্শনিক সূক্ষ্মতা। চিত্রকল্পের উন্নতি: গীত-হার, তিমির-রজনী, ধ্রুবতারা, হৃদয়-উৎস — প্রতিটি চিত্র প্রেমকে মহাজাগতিক মাত্রা দেয়। শেষ স্তবকে ব্যক্তিগত থেকে সার্বজনীনতায় উত্তরণ — রবীন্দ্রনাথের চেনা কৌশল। কবিতার শেষে রচনাস্থান ও তারিখের উল্লেখ ('জোড়াসাঁকো, ২ ভাদ্র, ১২৯৬') ব্যক্তিগত দিনলিপির মর্যাদা দেয়।
১৮৯০ সালে 'মানসী' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের যৌবনের রচনা — তখন তার বয়স ঊনত্রিশ। 'মানসী' পর্বে রবীন্দ্রনাথ প্রেম, প্রকৃতি ও দর্শনের সমন্বয়ে নিজস্ব কাব্যভাষা গড়ে তুলছিলেন। ভারতীয় দর্শনের জন্মান্তরবাদকে তিনি এখানে পাশ্চাত্য রোমান্টিক প্রেম-ভাবনার সঙ্গে মিলিয়েছেন। এই কবিতার ভাবনা পরবর্তীকালে 'গীতাঞ্জলি'র বিশ্বচেতনায় পূর্ণতা পায়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”