ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) বাংলা কবিতায় জাগরণের ডাকের সবচেয়ে কাব্যময় রূপগুলোর একটি। ঘুমন্ত মাঝি ও দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজের রূপকে কবি ঘুমন্ত জাতিকে জাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন — ভোর হয়ে গেছে, কিন্তু মাঝি এখনো জাগেনি।
কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা।
নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।— ফররুখ আহমদ, ‘সাত সাগরের মাঝি’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
ভোর হয়ে গেছে — কত আঁধার পর্দা পার হয়ে ভোর হলো, নারঙ্গি বনে সবুজ পাতা কাঁপছে — কিন্তু মাঝি এখনো ঘুমিয়ে। তার দুয়ারে সাত-সাগরের জোয়ার ফেনা এনেছে, দুয়ারে ডাকছে জাহাজ — অথচ জাহাজ অচল, হালে পানি নেই, পাল ওড়ে না। কবি মাঝিকে ডাকেন — উঠে এসো মাঝিমাল্লার দলে, দেখবে তোমার কিশতি আবার সাগরজলে ভেসেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন — তোমার সেতারা (ভাগ্য-তারা) নেভেনি; তোমার অতীতের গৌরবময় সফরের কথা কি ভুলে গেছ? সকাল হয়ে গেছে, তবু তুমি জাগলে না? এই বারবার প্রশ্নই কবিতাটির প্রাণ — ঘুমন্ত জাতির প্রতি জাগরণের আকুতি।
ফররুখ আহমদের 'সাত সাগরের মাঝি' (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৪৪) বাংলা কবিতায় জাগরণের ডাকের সবচেয়ে কাব্যময় রূপগুলোর একটি। কবিতার কেন্দ্রীয় চিত্র — ঘুমন্ত মাঝি, আর দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ। 'কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা। নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।' — ভোর হয়ে গেছে, প্রকৃতি জেগেছে, কিন্তু মাঝি এখনো ঘুমিয়ে। এই মাঝি আসলে প্রতীক — ঘুমন্ত জাতি, ঘুমন্ত সমাজ, যাকে কবি জাগাতে চান। ১৯৪৪ সাল — দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্ত, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তুঙ্গে, আর বাংলার মুসলমান সমাজ নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় খুঁজছে। ফররুখ আহমদ ছিলেন এই নবজাগরণের কবি; 'সাত সাগরের মাঝি' কাব্যগ্রন্থে তিনি মুসলিম ঐতিহ্যের গৌরবময় অতীত — সিন্ধু-জয়ের নাবিক, সাগর-পাড়ির বণিক — স্মরণ করিয়ে দেন। কবিতার ভাষা লক্ষণীয়: 'সাত-সাগর', 'দরিয়া', 'কিশতি', 'বেসাতি', 'সেতারা' — আরবি-ফারসি শব্দের এই ব্যবহার কবিতাকে দেয় এক ভিন্ন সুর, যা তৎকালীন বাংলা কবিতায় ছিল অভিনব। কিন্তু কবিতাটি শুধু অতীত-বিলাস নয়; এর আসল জোর বর্তমানের প্রতি আহ্বানে: 'তুমি উঠে এসো, তুমি উঠে এসো মাঝিমাল্লার দলে' — এই পুনরাবৃত্তি যেন সত্যিকারের ডাক। 'হে মাঝি! তোমার সেতারা নেভেনি একথা জানো তো তুমি' — অর্থাৎ তোমার ভাগ্য-তারা এখনো নেভেনি, সম্ভাবনা এখনো আছে। কবিতার শেষাংশে স্মৃতিচারণ — 'ভুলেছ কি সেই প্রথম সফর' — অতীতের গৌরবকে বর্তমানের প্রেরণায় বদলে দেয়। সমালোচকরা এই কবিতায় দেখেছেন রোমান্টিক জাতীয়তাবাদের প্রকাশ; কিন্তু এর কাব্যমূল্য শুধু রাজনীতিতে নয় — প্রকৃতির চিত্র ('নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা'), সাগরের বিশালতা, আর জাগরণের আকুতি একে দিয়েছে চিরন্তন আবেদন। ফররুখ আহমদের কবি-পরিচয়ের সঙ্গে 'সাত সাগরের মাঝি' অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত — এই কাব্যগ্রন্থই তাকে 'মুসলিম নবজাগরণের কবি' হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। তার অন্য বিখ্যাত কবিতা 'পাঞ্জেরী'তেও একই জাগরণের ডাক শোনা যায়। ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় তার কবিতা নতুন করে পাঠ করা হয়; যদিও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাকে নিয়ে বিতর্কও হয়েছে — কেউ কেউ তার কবিতায় সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পেয়েছেন। কিন্তু 'সাত সাগরের মাঝি' কবিতাটিকে শুধু এই বিতর্কে আটকে রাখা অন্যায় হবে; এর কাব্যমূল্য — সাগরের বিশাল চিত্রকল্প, জাগরণের আকুতি, আরবি-ফারসি শব্দের সংগীতময় ব্যবহার — স্বতন্ত্রভাবে বিচার্য। কবিতার শেষ প্রশ্ন — 'তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?' — আজও প্রতিটি ঘুমন্ত বিবেকের উদ্দেশে প্রযোজ্য। ফররুখ আহমদ দেখিয়েছেন, ঐতিহ্যের গৌরব স্মরণ করা আর বর্তমানের দায়িত্ব এড়ানো এক নয়; অতীতের স্মৃতি হতে হবে ভবিষ্যতের প্রেরণা।
জাগরণ, জাতীয়তাবাদ, সাগর-যাত্রা, অতীত-গৌরব
কবিতাটির কেন্দ্রীয় রূপক — ঘুমন্ত মাঝি ও অচল জাহাজ — ঘুমন্ত জাতির প্রতীক। 'তবু জাগলে না? তবু, তুমি জাগলে না?' — এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে দিয়েছে সংগীতময় আবেদন। আরবি-ফারসি শব্দের (দরিয়া, কিশতি, বেসাতি, সেতারা) ব্যবহারে সাগর-যাত্রার আবহ তৈরি। প্রকৃতির চিত্র — নারঙ্গি বন, সবুজ পাতা, ভোর — জাগরণের পটভূমি হিসেবে কাজ করে। অতীত-স্মৃতি ও বর্তমান-আহ্বানের সংযোগে কবিতাটি পেয়েছে মহাকাব্যিক বিস্তার।
১৯৪৪ সালে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, বাংলায় দুর্ভিক্ষের (১৯৪৩) ক্ষত তাজা, আর মুসলিম লীগের রাজনীতিতে বাংলার মুসলমান সমাজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। এই পটভূমিতে ফররুখ আহমদ (১৯১৮–১৯৭৪) মুসলিম ঐতিহ্যের গৌরবময় অতীতকে স্মরণ করিয়ে একটি সাংস্কৃতিক নবজাগরণের ডাক দেন। 'সাত সাগরের মাঝি' তাকে বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র আসন দেয়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”