বাতাসে লাশের গন্ধ
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ (১৯৫২) ভাষা-আন্দোলনের প্রথম ও সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাগুলোর একটি। ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের স্মরণে রচিত এই কবিতায় শোককে রূপ দেওয়া হয়েছে প্রতিজ্ঞায়—কান্না নয়, ফাঁসির দাবি।
এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়— মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতাটি শুরু হয় শহীদদের স্মৃতিস্থলে দাঁড়িয়ে—‘এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়’। কবি ঘোষণা করেন, তিনি কাঁদতে আসেননি; আজ তিনি শোকে বিহ্বল নন, ক্রোধে উন্মত্ত নন—আজ তিনি প্রতিজ্ঞায় অবিচল। এরপর কবিতা এগোয় শহীদদের জীবনের করুণ চিত্রমালায়—যে শিশু আর পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে না, যে গৃহবধূ আর স্বামীর প্রতীক্ষায় প্রদীপ হাতে দুয়ারে দাঁড়াবে না, যে জননী আর সন্তানকে বুকে জড়াতে পারবে না, যে তরুণ প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে আনতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। এই অসংখ্য ভাইবোনের নামে, হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত মাতৃভাষার নামে, কবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছেন—যারা নির্বিচারে হত্যা করেছে তাদের। সংক্ষেপে, এটি শোকের কবিতা নয়, বিচারের দাবির কবিতা; কান্নার নয়, প্রতিজ্ঞার কবিতা।
এই কবিতার সবচেয়ে বড় শৈল্পিক সিদ্ধি শোকের রূপান্তর। সাধারণত শোকগাথা পাঠককে কাঁদায়; কিন্তু এই কবিতা পাঠককে দাঁড় করায়। ‘আজ আমি শোকে বিহ্বল নই / আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই / আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল’—এই ত্রিপদী প্রতিজ্ঞা কবিতার নৈতিক কেন্দ্র। কবি দুটি চরম অবস্থাকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন—অসহায় শোক ও অন্ধ ক্রোধ; তিনি বেছে নিয়েছেন তৃতীয় পথ—সচেতন, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এই পরিণত বোধ একটি তরুণ কবির কলমে বিস্ময়কর; ১৯৫২ সালে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর বয়স ছিল মাত্র পঁচিশ। কবিতার চিত্রমালা লক্ষণীয়। কবি শহীদদের সংখ্যায় নয়, তাদের জীবনের অসমাপ্ত গল্পে দেখেন—শিশু, গৃহবধূ, জননী, তরুণ—প্রতিটি চিত্র একটি করে অসমাপ্ত জীবন। ‘যে তরুণ মাটির কোলে লুটিয়ে পড়ার আগে বারবার একটি প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে চেষ্টা করেছিল’—এই পংক্তিতে মৃত্যুর মুহূর্তটিও মানবিক; শহীদ এখানে প্রতীক নন, রক্তমাংসের মানুষ। এই মানবিকতাই কবিতাটিকে প্রচারণার ঊর্ধ্বে তুলে শিল্পে পরিণত করেছে। ‘হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত যে ভাষায় আমি মাকে সম্বোধনে অভ্যস্ত’—এই পংক্তিতে ভাষা-আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। বাংলা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মায়ের ভাষা, হাজার বছরের ঐতিহ্যের বাহন। এই যুক্তিই পরবর্তীকালে ভাষা-আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক দাবি থেকে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের আন্দোলনে রূপ দেয়। কবিতাটি ‘একুশের প্রথম কবিতা’ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে—ভাষা-শহীদদের নিয়ে রচিত প্রথম সার্থক কাব্য। এর ভাষা গদ্যছন্দ-ঘেঁষা, সরল, সংযত; অলংকারের চেয়ে সত্যের ওজন বেশি। এই সংযমই কবিতাটিকে আবেগের বন্যা থেকে বাঁচিয়ে দৃঢ়তার শিলায় পরিণত করেছে। আজও প্রতি ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে এই কবিতা পাঠ করা হয়; ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’—এই পংক্তি বাঙালির প্রতিবাদী চেতনার মন্ত্রে পরিণত হয়েছে। কবিতাটির ভাষা-রাজনীতির দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ‘যে ভাষায় আমি মাকে সম্বোধনে অভ্যস্ত’—এই পংক্তিতে কবি ভাষাকে মায়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন; ফলে মাতৃভাষার ওপর আঘাত মায়ের ওপর আঘাতের সমান। এই মাতৃ-রূপকই ভাষা-আন্দোলনকে আবেগের গভীরতম স্তরে নিয়ে যায়—এটি আর শুধু রাজনৈতিক দাবি থাকে না, হয়ে ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন। কবিতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীনের ঐতিহ্যের উল্লেখও তাৎপর্যপূর্ণ—কবি বোঝাতে চান, বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। এই ঐতিহ্য-চেতনা আন্দোলনকে দেয় ঐতিহাসিক বৈধতা। কবিতাটির সংযত ভাষা—কোনো গালাগালি নেই, কোনো উন্মত্ততা নেই—এর নৈতিক শক্তি বাড়ায়; পাঠক বোঝেন, এই দাবি প্রতিহিংসার নয়, ন্যায়বিচারের।
ভাষা-আন্দোলন, শহীদ ও আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ, মাতৃভাষা
গদ্যছন্দ-ঘেঁষা মুক্ত কাঠামো; সরল, সংযত ও প্রত্যক্ষ ভাষা। ত্রিপদী প্রতিজ্ঞা (‘শোকে বিহ্বল নই / ক্রোধে উন্মত্ত নই / প্রতিজ্ঞায় অবিচল’) কবিতার নৈতিক কেন্দ্র। তালিকাভুক্তিমূলক চিত্রমালা (শিশু, গৃহবধূ, জননী, তরুণ)—প্রতিটি চিত্র একটি অসমাপ্ত জীবন। শোক থেকে প্রতিজ্ঞায় রূপান্তরের নাটকীয় কাঠামো। ‘মায়ের ভাষা’ ও ‘হাজার বছরের ঐতিহ্য’—এমন প্রত্যয়ে ভাষা-আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি। অলংকারের বাহুল্যহীনতা; সত্য ও সংযমই প্রধান শৈল্পিক শক্তি। সম্বোধনধর্মী সমাপ্তি (‘ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’) কবিতাটিকে ঘোষণাপত্রের মর্যাদা দেয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলা ভাষার দাবিতে মিছিলে পুলিশের গুলিতে ছাত্রসহ অনেকে নিহত হন। এই ঘটনার পরপরই—মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে—মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী এই কবিতা রচনা করেন। কবিতাটি ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে প্রকাশিত হয়—যা ভাষা-আন্দোলনের প্রথম সাহিত্যিক দলিল। এই সংকলনেই ভাষা-আন্দোলনের চেতনা প্রথম সাহিত্যরূপ পায়। কবিতাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয় এবং প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানে পাঠের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই কবিতা প্রেরণার উৎস ছিল। ‘একুশের প্রথম কবিতা’ হিসেবে এটি বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তিস্তম্ভ; আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের (২১ ফেব্রুয়ারি) চেতনার সঙ্গেও এই কবিতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' (১৯৭৯) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ (১৯৭১-৭২) মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী কাব্যিক…”