বাতাসে লাশের গন্ধ
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ (১৯৭১-৭২) মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী কাব্যিক দলিলগুলোর একটি। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় স্বাধীনতার মূল্য—রক্ত, ত্যাগ ও বেদনার—তুলে ধরা হয়েছে গণমানুষের জীবন্ত চিত্রমালায়।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে— শামসুর রাহমান, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতাটি স্বাধীনতাকে সম্বোধন করে লেখা। শুরুতে প্রশ্ন—তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার রক্তগঙ্গায় ভাসতে হবে? আর কতবার খাণ্ডবদহন দেখতে হবে? এরপর ‘তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা’—এই পুনরাবৃত্ত বাক্যে যুদ্ধের বিভীষিকার একের পর এক চিত্র: সাকিনা বিবির কপাল ভাঙা, হরিদাসীর সিঁথির সিঁদুর মোছা, শহরের বুকে ট্যাঙ্কের আগমন, ছাত্রাবাস-বস্তি উজাড়, গ্রামের পর গ্রাম ছাই। মাঝে আবার সেই প্রশ্ন ফেরে—আর কতবার? তারপর কবিতা এগোয় স্বাধীনতার প্রতীক্ষায় থাকা সাধারণ মানুষের তালিকায়—থুথুরে বুড়ো, মোল্লাবাড়ির বিধবা, হাড্ডিসার অনাথ কিশোরী, সগীর আলী, কেষ্ট দাস, মতলব মিয়া, রুস্তম শেখ, রাইফেল কাঁধে তেজী তরুণ। সবাই অধীর প্রতীক্ষায়। কবিতা শেষ হয় অটল প্রত্যয়ে—পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘোষণা তুলে, নতুন নিশান উড়িয়ে, এই বাংলায় তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা। সংক্ষেপে, এটি স্বাধীনতার মূল্য ও অনিবার্যতার কবিতা; বেদনার মধ্য দিয়ে আশার ঘোষণা।
এই কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি এর গণমানুষের দৃষ্টিকোণ। মুক্তিযুদ্ধের অনেক কবিতায় বীরত্ব ও রণহুংকার প্রধান; কিন্তু শামসুর রাহমান দেখিয়েছেন যুদ্ধের অন্য মুখ—সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। সাকিনা বিবি, হরিদাসী, মোল্লাবাড়ির বিধবা, হাড্ডিসার কিশোরী, সগীর আলী, কেষ্ট দাস, মতলব মিয়া, রুস্তম শেখ—এই নামগুলো কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়; এরা ১৯৭১-এর বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম-শহরের চেনা মুখ। কবি স্বাধীনতার দাম মাপছেন এদের জীবন দিয়ে—ফলে স্বাধীনতা আর কোনো বিমূর্ত ধারণা থাকে না; হয়ে ওঠে রক্তমাংসের বাস্তবতা। এই মানবিকতাই কবিতাটিকে প্রচারণামূলক যুদ্ধ-কবিতা থেকে উন্নীত করে মহৎ শিল্পে পরিণত করেছে। কবিতার গঠন লক্ষণীয়: তিনটি পুনরাবৃত্তিমূলক বলয়। প্রথম বলয়—প্রশ্ন (‘আর কতবার?’); দ্বিতীয় বলয়—বিভীষিকার চিত্রমালা (‘তুমি আসবে বলে’); তৃতীয় বলয়—প্রতীক্ষার তালিকা ও প্রত্যয় (‘তোমাকেই আসতে হবে’)। এই বৃত্তাকার অগ্রগতি পাঠককে নিয়ে যায় সংশয় থেকে সাক্ষ্য হয়ে সংকল্পে। ‘তুমি আসবে বলে’ বাক্যটির পুনরাবৃত্তি বিশেষভাবে শক্তিশালী—প্রতিবার এই বাক্য ফিরে আসে একটি নতুন বিভীষিকার চিত্র নিয়ে; ফলে স্বাধীনতার আগমনী-বার্তা ও যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ একসঙ্গে চলে—আশা ও বেদনার যুগপৎ স্রোত। ‘রক্তগঙ্গা’ ও ‘খাণ্ডবদহন’—এই দুটি চিত্রকল্পে পুরাণ ও ইতিহাসের মিলন। খাণ্ডবদহন মহাভারতের প্রসঙ্গ—অর্জুনের অগ্নিকাণ্ডে খাণ্ডব বন পুড়েছিল; কবি এই পৌরাণিক ধ্বংসের সঙ্গে ১৯৭১-এর গ্রাম-পোড়ানোর মিল দেখেন। ফলে যুদ্ধটি শুধু সমকালীন ঘটনা থাকে না—হয়ে ওঠে মানব-ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত ট্র্যাজেডি। আবার ‘রক্তগঙ্গা’য় গঙ্গার পবিত্রতা ও রক্তের অপবিত্রতার বৈপরীত্য যুদ্ধের নৈতিক জটিলতাকে ধারণ করে। কবিতার শেষাংশের তালিকাটি (‘সগীর আলী... রুস্তম শেখ... সেই তেজী তরুণ’) গণতান্ত্রিক—এখানে কৃষক, জেলে, মাঝি, রিকশাওয়ালা, যোদ্ধা—সবাই সমান; স্বাধীনতা কারো একার নয়, সবার। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই কবিতাটিকে জাতীয় কবিতায় পরিণত করেছে। ‘তোমাকেই আসতে হবে’—এই শেষ দাবিতে কোনো সন্দেহ নেই, কোনো শর্ত নেই; শুধু অটল বিশ্বাস। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে যখন বিজয় এলো, তখন এই কবিতার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল—এবং কবিতাটি হয়ে উঠেছিল সেই বিজয়ের সাহিত্যিক স্মারক। কবিতাটির সম্বোধন-কৌশলও বিশ্লেষণের যোগ্য। ‘হে স্বাধীনতা’—স্বাধীনতাকে সম্বোধন করা মানে তাকে ব্যক্তিত্ব দেওয়া; স্বাধীনতা এখানে কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, একজন প্রিয়জন—যার জন্য অপেক্ষা করা যায়, যাকে প্রশ্ন করা যায়, যার কাছে দাবি জানানো যায়। এই ব্যক্তিকরণ কবিতাটিকে আবেগের গভীরতম স্তরে নিয়ে যায়। আবার শেষে ‘তোমাকেই আসতে হবে’—এই আদেশসূচক দাবি সম্বোধনকে রূপ দেয় সংকল্পে; প্রিয়জনের কাছে আবদার থেকে জাতির কাছে ঘোষণা। এই রূপান্তরই কবিতার নাটকীয়তা। কবিতাটির আরেকটি দিক—এটি লেখা হয়েছিল বিজয়ের আগেই; অর্থাৎ এটি আশার কবিতা, স্মৃতির নয়। পরাজয়ের অন্ধকারে বসে বিজয়ের ঘোষণা দেওয়ার এই সাহসই কবিকে মহৎ করে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে এই কবিতা পড়লে মনে হয়, কবি শুধু স্বপ্ন দেখেননি—ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, গণমানুষ, ত্যাগ ও বেদনা
স্বাধীনতাকে সম্বোধন করে রচিত দীর্ঘ গীতিকবিতা; তিনটি পুনরাবৃত্তিমূলক বলয়—প্রশ্ন, বিভীষিকার চিত্রমালা, প্রতীক্ষা ও প্রত্যয়। ‘তুমি আসবে বলে’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে’ বাক্যের পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে মন্ত্রের মতো ছন্দময় করে। গণমানুষের নামের তালিকা (সগীর আলী, কেষ্ট দাস, মতলব মিয়া, রুস্তম শেখ)—ইতিহাসের নায়কদের বদলে সাধারণ মানুষের কবিতা। পৌরাণিক চিত্রকল্প (খাণ্ডবদহন, রক্তগঙ্গা) সমকালীন যুদ্ধকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্থাপন করে। ভাষা সরল কিন্তু চিত্রে প্রাচুর্যময়; দীর্ঘ পংক্তির স্রোত যুদ্ধের ব্যাপকতাকে ধারণ করে। সমাপ্তিতে শর্তহীন প্রত্যয়—সন্দেহ থেকে সংকল্পে উত্তরণ।
১৯৭১ সাল—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। শামসুর রাহমান তখন ঢাকায়; পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবরোধের মধ্যে তিনি এই কবিতা রচনা করেন। কবিতাটি ১৯৭২ সালে ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়—যার শিরোনামই বলে দেয়, এটি অবরুদ্ধ ঢাকার কবিতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই কবিতা হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে; মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে, শরণার্থী শিবিরে এটি পাঠ করা হতো। স্বাধীনতার পর কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রতি বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে এর পাঠ ও আবৃত্তি জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়। শামসুর রাহমানকে ‘নাগরিক কবি’ বলা হয়; এই কবিতা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ—নগরের কবি হয়েও তিনি ধারণ করেছেন সারা দেশের বেদনা ও আশা।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' (১৯৭৯) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী…”
“কবিতা সম্পর্কে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ (১৯৫২) ভাষা-আন্দোলনের প্রথম ও…”