কেউ কথা রাখেনি
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
জসীমউদ্দীনের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ (১৯২৯) বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক পঠিত কাহিনিকাব্যগুলোর একটি। রূপাই ও সাজুর করুণ প্রেমকাহিনি নিয়ে রচিত এই দীর্ঘ কাব্য গ্রামবাংলার জীবন, প্রকৃতি ও লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।
এই এক গাঁও, ওই এক গাঁও — মধ্যে ধু ধু মাঠ,
ধান কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ।— জসীমউদ্দীন, ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কাব্যের পটভূমি দুটি গ্রাম ও তাদের মাঝের ধু-ধু মাঠ। এই মাঠের দুই পাশে দুটি গ্রাম—এক গ্রামের চাষি রূপাই, অন্য গ্রামের মেয়ে সাজু। দুজনের মধ্যে গভীর প্রেম হয় এবং বিয়েও হয়। কিন্তু জমির ধানকাটা নিয়ে গ্রাম্য বিবাদে রূপাই খুনের দায়ে ফেরারি হয়ে সংসার ছেড়ে চলে যায়। এদিকে সাজু স্বামীর বিরহে নকশী কাঁথা সেলাই করে—কাঁথার প্রতিটি ফোঁড়ে সে বুনে চলে তাদের প্রেম ও বিরহের গাথা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাজু মৃত্যুবরণ করে; আর ফিরে আসে রূপাই—শুধু সাজুর কবর আর সেই নকশী কাঁথাটিকে খুঁজে পেতে। কাব্যটি শেষ হয় করুণ মিলনে—মৃত্যুর ওপারে দুজনের মিলন, আর মাঠের বুকে পড়ে থাকে সেই কাঁথা—বিরহের শিল্পরূপ। সংক্ষেপে, এটি প্রেম, বিচ্ছেদ ও শিল্পের কাহিনি; গ্রামবাংলার মাটিতে গাঁথা এক অমর ট্র্যাজেডি।
‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যের সবচেয়ে বড় শৈল্পিক সিদ্ধি এর শিরোনাম-প্রতীকের বহুমাত্রিকতা। নকশী কাঁথা শুধু একটি হস্তশিল্প নয়; এটি এই কাব্যের কেন্দ্রীয় রূপক। সাজু তার বিরহের প্রতিটি মুহূর্ত কাঁথায় সেলাই করে—ফলে কাঁথাটি হয়ে ওঠে তার জীবনের দিনলিপি, তার প্রেমের দলিল, তার বেদনার শিল্পরূপ। কাব্যের শেষে যখন রূপাই ফিরে আসে, তখন সাজু নেই; আছে শুধু কাঁথা। অর্থাৎ মানুষ চলে যায়, কিন্তু শিল্প থেকে যায়—এই সত্য ‘সোনার তরী’র সুরের সঙ্গে মিলে যায়, কিন্তু সম্পূর্ণ গ্রামীণ ভাষায়। এই রূপক কাব্যটিকে শুধু প্রেমকাহিনি থেকে উন্নীত করে শিল্পতত্ত্বের কাব্যে পরিণত করেছে। কাব্যের আরেকটি শক্তি এর লোকজ ভিত্তি। জসীমউদ্দীন ‘বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী’—এই রাখালী গান দিয়ে কাব্য শুরু করেন; ফলে পাঠক প্রথম থেকেই লোকসংগীতের জগতে প্রবেশ করেন। কাব্যজুড়ে ছড়িয়ে আছে পল্লীগানের সুর, প্রবাদ, লোকবিশ্বাস—যা কাব্যটিকে শহুরে সাহিত্যের বাইরে একটি স্বতন্ত্র জগৎ দেয়। রূপাই ও সাজু বাস্তব চরিত্র ছিলেন বলে জানা যায়; ফলে কাহিনিতে একটি প্রামাণ্যতার স্পর্শ আছে। প্রকৃতি এই কাব্যে শুধু পটভূমি নয়, একটি চরিত্র। ধু-ধু মাঠ, জলীর বিল, ধান-কাউনের ক্ষেত—প্রকৃতি এখানে নায়ক-নায়িকার আবেগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলায়; বিরহের সময় প্রকৃতিও বিষণ্ণ, মিলনের স্মৃতিতে প্রকৃতিও উজ্জ্বল। এই ‘প্রকৃতি-মানব’ একাত্মতা রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়, কিন্তু ভাষা সম্পূর্ণ জসীমউদ্দীনের—সরল, সুরেলা, মাটির গন্ধমাখা। কাব্যটির আন্তর্জাতিক খ্যাতিও উল্লেখযোগ্য: ১৯২৯ সালেই ই. এম. মিলফোর্ড এর ইংরেজি অনুবাদ করেন (‘The Field of the Embroidered Quilt’)—বাংলা কাব্যের এত দ্রুত বিদেশি অনুবাদ বিরল ঘটনা। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাব্যটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন—যা এর শিল্পমর্যাদার স্বীকৃতি। আজও ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে আছে; রূপাই-সাজুর কাহিনি বাঙালির সম্মিলিত স্মৃতির অংশ। এর কারণ, কাব্যটি প্রেমকে দেখায় তার সবচেয়ে সরল ও গভীর রূপে—কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই, শুধু একটি কাঁথার ফোঁড়ে ফোঁড়ে। কাব্যটির নারী-চরিত্র সাজুর বিশ্লেষণও দাবি রাখে। সাজু শুধু বিরহিণী নন; তিনি একজন শিল্পী। স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি কাঁথা সেলাই করেন—অর্থাৎ তিনি তার বেদনাকে রূপ দেন, তাকে স্থায়ী করেন। এই সৃজনশীলতা তাকে শুধু দুঃখী নারী থেকে উন্নীত করে স্রষ্টার মর্যাদা দেয়। পুরুষ-প্রধান গ্রামীণ সমাজে একজন নারীর এই শিল্পী-পরিচয় জসীমউদ্দীনের প্রগতিশীল দৃষ্টির পরিচয়। আর রূপাই—সে বীর নয়, সে পলাতক; খুনের দায়ে ফেরারি। কিন্তু তার পলায়নও প্রেমেরই প্রকাশ—সে ফিরতে পারে না, কারণ সমাজ তাকে ফিরতে দেবে না। এইভাবে কাব্যটি ব্যক্তিগত প্রেমের সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে। শেষে মৃত্যুর ওপারে মিলন—এই সমাপ্তি বাস্তবতার কাছে হার না মানা প্রেমের জয়; শরীর মরে, কিন্তু প্রেম ও শিল্প বাঁচে—কাঁথাটি তার সাক্ষী।
প্রেম ও বিরহ, গ্রামবাংলা, লোকসংস্কৃতি, শিল্প ও জীবন
দীর্ঘ কাহিনিকাব্য; আখ্যান ও গীতিকবিতার সমন্বয়। নকশী কাঁথা কেন্দ্রীয় রূপক—বিরহের শিল্পরূপ, স্মৃতির দলিল। রাখালী গান দিয়ে শুরু; লোকগান, প্রবাদ ও পল্লীসুরের প্রাচুর্য। প্রকৃতি সক্রিয় চরিত্র—নায়ক-নায়িকার আবেগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলায়। ভাষা সরল, সুরেলা, চিত্রধর্মী; পয়ার-ত্রিপদীর মিশ্রণে গীতিময়তা। করুণ রসের প্রাধান্য; শেষে মৃত্যুর ওপারে মিলনের দার্শনিক সমাপ্তি। বাস্তব চরিত্রভিত্তিক কাহিনিতে প্রামাণ্যতার স্পর্শ।
১৯২৯ সাল—‘কল্লোল’ যুগের পর বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার জোয়ার। এই সময়ে জসীমউদ্দীন পল্লীজীবনের কাব্য নিয়ে এলেন এবং প্রমাণ করলেন, গ্রামের গল্পও আধুনিক পাঠকের হৃদয় জয় করতে পারে। ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়; একই বছর এর ইংরেজি অনুবাদ (‘The Field of the Embroidered Quilt’, অনুবাদক ই. এম. মিলফোর্ড) প্রকাশিত হয়—যা বাংলা কাব্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রাথমিক নিদর্শন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাব্যটির প্রচ্ছদ অঙ্কন করেন। এই কাব্যই জসীমউদ্দীনকে ‘পল্লীকবি’ হিসেবে চিরস্থায়ী করে; ‘কবর’ (১৯২৫) তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল, ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ তাঁকে অমরত্ব দেয়। পরবর্তীকালে এই কাব্য অবলম্বনে নাটক, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটক নির্মিত হয়েছে।
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”