ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ (১৯৩৩) পল্লী-বাংলার ট্র্যাজিক প্রেমের মহাকাব্যিক কবিতা। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর পর পল্লীকবির দ্বিতীয় বিখ্যাত আখ্যানকাব্য এটি — বাউণ্ডুলে সোজন বাদিয়া ও দুলীর প্রেম, শিমুলতলী গ্রামের পটভূমিতে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কালো ছায়ায়। ‘বন পুড়ে গেলে সব লোকে দেখে, মনের অনল যার দ্বিগুন জ্বলিছে’ — এই পংক্তি বাংলা কবিতার অমর উক্তিগুলোর একটি।
বন পুড়ে গেলে সব লোকে দেখে, মনের অনল যার
দ্বিগুন জ্বলিছে, তবু কেহ তার জানেনাক সমাচার— জসীমউদ্দীন, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতার নায়ক সোজন বাদিয়া — গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়ানো বাউণ্ডুলে যুবক। শিমুলতলী গ্রামে তার পরিচয় হয় দুলীর সঙ্গে; দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রেম। কিন্তু তাদের প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের প্রাচীর — দাঙ্গার আগুনে পুড়ে যায় গ্রামের শান্তি, আর সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয় দুটি হৃদয়ের স্বপ্ন। ভুল বোঝাবুঝি ও সামাজিক চাপে বিচ্ছিন্ন হয় সোজন-দুলী; শেষে দুজনেরই জীবনে নেমে আসে ট্র্যাজেডি। কবিতাটি শুধু প্রেমকাহিনি নয় — হিন্দু-মুসলমানের মিলিত গ্রামজীবন, প্রকৃতির সৌন্দর্য, এবং সাম্প্রদায়িকতার বিভীষিকার এক মর্মস্পর্শী দলিল।
'সোজন বাদিয়ার ঘাট' জসীমউদ্দীনের কবি-পরিচয়ের পূর্ণ প্রকাশ — পল্লীকবি নামটি তার এই ধরনের কবিতার জন্যই। 'নকশী কাঁথার মাঠ' (১৯২৯) যেমন রূপাই-সাজুর করুণ প্রেমকাহিনি, 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' তেমনি সোজন-দুলীর ট্র্যাজেডি; দুটোতেই পল্লী-বাংলার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতি প্রধান চরিত্র। কিন্তু এই কবিতার একটি অতিরিক্ত মাত্রা আছে — সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা। যে সময়ে (ত্রিশের দশক) বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়ছিল, সেই সময়ে জসীমউদ্দীন লিখলেন এমন এক গ্রামের কাহিনি, যেখানে হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে বাস করে, একসঙ্গে হাসে-কাঁদে — আর দাঙ্গা সেই স্বর্গকে নরক করে। এটি ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবির নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ। সোজন বাদিয়া চরিত্রটি লক্ষণীয় — সে বাউণ্ডুলে, গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়ায়, সমাজের বাঁধা নিয়ম মানে না; এই মুক্ততাই তাকে দুলীর প্রেমে পড়তে দেয়, আবার এই মুক্ততাই সমাজের চোখে তাকে সন্দেহজনক করে। প্রেম ও সমাজের এই দ্বন্দ্বই কবিতার মূল টান। কবিতার সবচেয়ে বিখ্যাত পংক্তি — 'বন পুড়ে গেলে সব লোকে দেখে, মনের অনল যার / দ্বিগুন জ্বলিছে, তবু কেহ তার জানেনাক সমাচার' — বাংলা কবিতায় অন্তর্দহনের সবচেয়ে স্মরণীয় রূপকগুলোর একটি। বাইরের আগুন সবাই দেখে, কিন্তু মনের আগুন কেউ দেখে না — এই সরল সত্য কবি বলেছেন এমন চিত্রে, যা একবার শুনলে ভোলা যায় না। এই পংক্তি আজ প্রবাদে পরিণত হয়েছে। ছন্দের দিক থেকে কবিতাটি পয়ার-ত্রিপদীর মিশ্রণে, লোক-ছন্দের স্বাভাবিক প্রবাহে রচিত — পড়তে পড়তে মনে হয় গল্প শুনছি, কবিতা পড়ছি না। এই আখ্যান-স্বাভাবিকতাই জসীমউদ্দীনের বিশেষত্ব; তিনি পল্লীর মানুষের মুখের ভাষাকেই কাব্যভাষা করেছেন। প্রকৃতি-বর্ণনায় কবি অতুলনীয় — শিমুলতলীর মাঠ, ঘাট, নদী, চাঁদনী রাত পাঠকের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কবিতাটি পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ও মঞ্চে রূপায়িত হয়, স্কুল-পাঠ্যক্রমে স্থান পায়, আর 'পল্লীকবি' উপাধিকে চিরস্থায়ী করে। আজও গ্রামবাংলার পাঠকের কাছে সোজন-দুলী শুধু কবিতার চরিত্র নয় — চেনা মানুষ। জসীমউদ্দীনের ভাষা নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ আছে — কেউ বলেন তা অতি সরল। কিন্তু এই সরলতাই তার অস্ত্র; পল্লীর মানুষের মুখের ভাষায় তিনি যে কাব্য রচনা করেছেন, তা শহুরে কবিতার জটিলতাকে চ্যালেঞ্জ করে। 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' এই চ্যালেঞ্জের সফলতম প্রমাণ।
প্রেম, পল্লীজীবন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ট্র্যাজেডি, প্রকৃতি
আখ্যানকাব্যের গঠন — দীর্ঘ কাহিনি-কবিতা, পয়ার-ত্রিপদীর লোক-ছন্দে রচিত। চিত্রধর্মী প্রকৃতি-বর্ণনা — শিমুলতলীর গ্রামজীবন জীবন্ত। 'বন পুড়ে গেলে...' — অন্তর্দহনের অমর রূপক। সংলাপ ও বর্ণনার মিশ্রণে নাটকীয় গতি। ভাষা সরল, লোক-মুখের বাংলা — পল্লীকবির স্বাক্ষর-শৈলী।
১৯৩৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত — 'নকশী কাঁথার মাঠ' (১৯২৯)-এর সাফল্যের পর জসীমউদ্দীনের দ্বিতীয় মহাকাব্যিক আখ্যানকবিতা। ত্রিশের দশকের বাংলায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পটভূমিতে লেখা এই কবিতা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বার্তা দেয়। পল্লী-জীবনের রূপকার হিসেবে জসীমউদ্দীন এই সময়েই 'পল্লীকবি' উপাধিতে ভূষিত হন। কবিতাটি পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয় এবং স্কুল-পাঠ্যক্রমে স্থান পায়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে…”
“কবিতা তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শতরূপে শতবার জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার। চিরকাল ধ’রে মুগ্ধ…”