দারিদ্র্য
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“এতক্ষণে”— অরিন্দম কহিলা বিষাদে;—
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল
রক্ষঃপুরে। হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ? নিকষা-সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ! শূলী-শম্ভুনিভ
কুম্ভকর্ণ! ভ্রাতৃপুত্ত্র বাসববিজয়ী!
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরুজন তুমি
পিতৃতুল্য। ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।
উত্তরিল বিভীষণ;— “বৃথা এ সাধনা,
ধীমান্! রাঘবদাস আমি; কি প্রকারে
তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ?” উত্তরিলা কাতরে রাবণি;—
“হে পিতৃব্য! তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে।
রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে!
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থানুর ললাটে;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধূলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে,
কে তুমি? জনম তব কোন্ মহাকুলে?
কেবা সে অধম রাম? স্বচ্ছ-সরোবরে
করে কেলি রাজহংস, পঙ্কজ কাননে;
যায় কি সে কভু, প্রভু! পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র-কেশরী,
কবে, হে বীরকেশরি, সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।
ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষ্মণ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
কহ, মহারথি, এ কি মহারথি-প্রথা?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
এ কথা। ছাড়হ পথ, আসিব ফিরিয়া
এখনি। দেখিব আজি, কোন্ দেববলে
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি।
দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ
রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের। কি দেখি
ডরিবে এ দাস হেন দুর্ব্বল মানবে?
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রগল্ভে পশিল
দম্ভী; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
বনবাসী! হে বিধাতঃ নন্দন কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্ল কমলে
কীটবাস? কহ, তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি, ভ্রাতৃ-পুত্ত্র তব?
তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”
মহামন্ত্রবলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদনে লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষ্যি রাবণ-আত্মজে;—
“নহি দোষী আমি, বৎস! বৃথা ভর্ৎস মোরে
তুমি। নিজ কর্ম্মদোষে, হায়, মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা মজিলা আপনি।
বিরত সতত পাপে দেবকুল; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী; প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কাল-সলিলে!
রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি। পরদোষে কে চাহে মজিতে?”
রুষিলা বাসবত্রাস। গম্ভীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী; —“ধর্ম্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি—কোন্ ধর্ম্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি—এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি? শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পর পর সদা।
এ শিক্ষা, হে রক্ষোবর! কোথায় শিখিলে?
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা। হেন সহবাসে
হে পিতৃব্য, বর্ব্বরতা কেন না শিখিবে?
গতি যার নীচসহ নীচ সে দুর্ম্মতি।”
উপরের অংশটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (১৮৬১)-এর ষষ্ঠ সর্গের সুবিদিত ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ অংশ — নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে মেঘনাদ ও বিভীষণের ঐতিহাসিক সংলাপ। উইকিসংকলন (bn.wikisource.org) থেকে গৃহীত।
যুদ্ধযাত্রার আগে মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতা অগ্নির পূজায় রত। মায়াদেবীর কৌশলে ও খুল্লতাত বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ সেখানে প্রবেশ করে নিরস্ত্র মেঘনাদকে যুদ্ধে আহ্বান জানায়। অস্ত্রাগারে যেতে চাইলে মেঘনাদ দেখেন, দ্বার রোধ করে দাঁড়িয়ে আছেন বিভীষণ। তখনই এই সংলাপ — মেঘনাদ প্রথমে অনুনয় করেন ('ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে'), বিভীষণ জানান তিনি রাঘবের দাস; তখন মেঘনাদের কণ্ঠে ফোটে অভিমান ও ক্ষোভের বান — কুলমর্যাদার প্রশ্ন, যুক্তির পর যুক্তি, উপমার পর উপমা। বিভীষণ আত্মপক্ষ সমর্থন করলে মেঘনাদ শেষ আঘাত হানেন — 'গতি যার নীচসহ নীচ সে দুর্ম্মতি'। এটি পরাজয়-নিশ্চিত বীরের মর্যাদার শেষ ঘোষণা।
'বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ' বাংলা সাহিত্যে ট্র্যাজিক বীরের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতি। মধুসূদন রামায়ণের চেনা কাহিনিকে উল্টে দিয়েছেন — এখানে নায়ক রাম নন, মেঘনাদ; আর প্রশ্নের মুখে রামপক্ষের মিত্র বিভীষণ। এই পুনর্লেখনের মূলে আছে মধুসূদনের মানবতাবাদ: পরাজিতেরও মর্যাদা আছে, এবং সেই মর্যাদার কবি তিনি। রামায়ণের ঐতিহ্যগত পাঠে মেঘনাদ 'রাক্ষস', কিন্তু মধুসূদনের হাতে সে হয়ে উঠেছে পিতৃভক্ত, কুলাভিমানী, বীর — যার একমাত্র 'অপরাধ' জন্মসূত্রে রাক্ষসকুলে জন্ম। সংলাপটির শৈল্পিক শক্তি এর যুক্তি-শৃঙ্খলে। মেঘনাদ একের পর এক উপমা দেন — চাঁদ কি ধুলায় গড়াগড়ি যায়? রাজহংস কি পঙ্কিল সলিলে নামে? মৃগেন্দ্র কি শৃগালের সঙ্গে মিত্রতা করে? প্রতিটি উপমাই বলে, মহাকুলের সন্তানের পক্ষে নীচের সঙ্গে হাত মেলানো অসম্ভব। 'স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থানুর ললাটে' — চাঁদকে শিবের ললাটে স্থাপনের চিত্রটি এই যুক্তির চূড়া: প্রতিটি বস্তুরই নিজস্ব মর্যাদার স্থান আছে, সেই স্থান থেকে নামা মানে নিজের অবমাননা। লক্ষ্মণকে 'ক্ষুদ্রমতি নর' বলার পেছনেও যুক্তি আছে — বীরের ধর্ম অস্ত্রহীনের সঙ্গে যুদ্ধ না করা; লক্ষ্মণ সেই ধর্ম ভেঙেছেন, তাই তিনি 'মহারথীপ্রথা'র বাইরে। অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ এখানে চরম সার্থকতায় পৌঁছেছে — মিলহীন চতুর্দশাক্ষর পংক্তির গম্ভীর প্রবাহ বীরের কণ্ঠের উপযুক্ত বাহন। লক্ষণীয়, মেঘনাদ শুরুতে নম্র ('কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরুজন তুমি / পিতৃতুল্য') — কিন্তু বিভীষণের 'রাঘবদাস' স্বীকারোক্তি শুনে তার কণ্ঠে আসে তীব্রতা। এই ক্রমবিকাশ সংলাপটিকে নাটকীয় করে তোলে; পাঠক যেন মঞ্চে দুই চরিত্রের মুখোমুখি সংঘাত দেখছেন। বিভীষণের যুক্তিও কম শক্তিশালী নয় — পাপপূর্ণ লঙ্কা ডুবছে, পরদোষে কে মজতে চায়? — কিন্তু মেঘনাদের শেষ আঘাত সব যুক্তিকে ছাড়িয়ে যায়: 'গতি যার নীচসহ নীচ সে দুর্ম্মতি'। সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ, চিরস্মরণীয় — বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্ধৃত পংক্তিগুলোর একটি। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত এই কাব্য বাংলা কবিতায় আধুনিক যুগের সূচনা করে; আর এই সংলাপ-অংশটি প্রমাণ করে, মধুসূদন শুধু ছন্দের বিপ্লবী নন, মানব-চরিত্রেরও গভীর পাঠক। পরাজয় আসন্ন জেনেও মর্যাদা না-ছাড়া — এই বীরত্বের আদর্শ আজও পাঠককে অভিভূত করে। উল্লেখ্য, এই সংলাপ-অংশের জনপ্রিয়তার পেছনে স্কুল-পাঠ্যক্রমের ভূমিকা অপরিসীম — কিন্তু পাঠ্যবইয়ের বাইরেও মঞ্চ, আবৃত্তি ও আলোচনায় এটি সমান জীবন্ত। মধুসূদন যে 'ভুল' পক্ষের বীরকে নায়ক করেছিলেন, বাংলা পাঠক তাকে ভালোবেসে সেই ভুলকে শুদ্ধ করেছেন।
বীরত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, কুলমর্যাদা, ট্র্যাজেডি, ন্যায়-অন্যায়
অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত সংলাপ-কাব্য — মিলহীন চতুর্দশাক্ষর পংক্তির গম্ভীর প্রবাহ। যুক্তি-শৃঙ্খল ও উপমার ধারা প্রধান শৈল্পিক কৌশল: চাঁদ-শিব, রাজহংস-পঙ্কিল সলিল, মৃগেন্দ্র-শৃগাল। নাটকীয় ক্রমবিকাশ — নম্র অনুনয় থেকে তীব্র ভর্ৎসনায় উত্তরণ। শেষ পংক্তির সংক্ষিপ্ত তীক্ষ্ণতা ('গতি যার নীচসহ নীচ সে দুর্ম্মতি') সমগ্র সংলাপের সারসংক্ষেপ।
১৮৬১ সালে 'মেঘনাদবধ কাব্য' মহাকাব্যে প্রকাশিত — বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ষষ্ঠ সর্গে বর্ণিত মেঘনাদ-বধের কাহিনি রামায়ণের, কিন্তু মধুসূদনের দৃষ্টিকোণ সম্পূর্ণ নতুন — রাক্ষস-পক্ষের মানবিকতা। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের পটভূমিতে এই কাব্য প্রচলিত মূল্যবোধের প্রতি প্রশ্ন তোলে। 'বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ' অংশটি স্কুল-পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি এই সংলাপ মুখস্থ করে বড় হয়েছে।
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
“কবিতা সব লোকে কয়, লালন কি জাত সংসারে। লালন বলে, জাতির কি রূপ, দেখলাম…”