ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
হে মহামানব, একবার এসো ফিরে
শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে,
এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;
লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।
এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ, স্বপ্নে সবুজ মাটি
নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি;
কোথাও নেইকো পার
মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার
আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,
এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল,
ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো,
হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।
ব্যাহত জীবনযাত্রা, চুপি চুপি কান্না বও বুকে,
হে নীড়-বিহারী সঙ্গী! আজ শুধু মনে মনে ধুঁকে
ভেবেছ সংসারসিন্ধু কোনোমতে হয়ে যাবে পার
পায়ে পায়ে বাধা ঠেলে। তবু আজো বিস্ময় আমার—
ধূর্ত, প্রবঞ্চক যারা কেড়েছে মুখের শেষ গ্রাস
তাদের করেছ ক্ষমা, ডেকেছ নিজের সর্বনাশ।
তোমার ক্ষেতের শস্য
চুরি ক’রে যারা গুপ্তকক্ষতে জমায়
তাদেরি দুপায়ে প্রাণ ঢেলে দিলে দুঃসহ ক্ষমায়;
লোভের পাপের দুর্গ গম্বুজ ও প্রাসাদে মিনারে
তুমি যে পেতেছ হাত; আজ মাথা ঠুকে বারে বারে
অভিশাপ দাও যদি, বারংবার হবে তা নিস্ফল—
তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল।
তুমি তো প্রহর গোনো,
তারা মুদ্রা গোনে কোটি কোটি,
তাদের ভাণ্ডার পূর্ণ; শূন্য মাঠে কঙ্কাল-করোটি
তোমাকে বিদ্রূপ করে, হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে—
কুজ্ঝটি তোমার চোখে, তুমি ঘুরে ফেরো দুর্বিপাকে।
পৃথিবী উদাস, শোনো হে দুনিয়াদার!
সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু কালো পাহাড়
দগ্ধ হৃদয়ে যদিও ফেরাও ঘাড়
সামনে পেছনে কোথাও পাবে না পার:
কি করে খুলবে মৃত্যু ঠেকানো দ্বার—
এই মুহূর্তে জবাব দেবে কি তার?
লক্ষ লক্ষ প্রাণের দাম
অনেক দিয়েছি; উজাড় গ্রাম।
সুদ ও আসলে আজকে তাই
যুদ্ধশেষের প্রাপ্য চাই।
কৃপণ পৃথিবী, লোভের অস্ত্র
দিয়ে কেড়ে নেয় অন্নবস্ত্র,
লোলুপ রসনা মেলা পৃথিবীতে
বাড়াও ও-হাত তাকে ছিঁড়ে নিতে
লোভের মাথায় পদাঘাত হানো—
আনো, রক্তের ভাগীরথী আনো।
দৈত্যরাজের যত অনুচর
মৃত্যুর ফাঁদ পাতে পর পর;
মেলো চোখ আজ ভাঙো সে ফাঁদ—
হাঁকো দিকে দিকে সিংহনাদ।
তোমার ফসল, তোমার মাটি
তাদের জীয়ন ও মরণকাঠি
তোমার চেতনা চালিত হাতে।
এখনও কাঁপবে আশঙ্কাতে?
স্বদেশপ্রেমের ব্যাঙ্গমা পাখি
মারণমন্ত্র বলে, শোনো তা কি?
এখনো কি তুমি আমি স্বতন্ত্র?
করো আবৃত্তি, হাঁকো সে মন্ত্র:
শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার!
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়—
হিসাব কি দিবি তার?
প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা,
ভেঙেছিস ঘরবাড়ি,
সে কথা কি আমি জীবনে মরণে
কখনো ভুলতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবই।
শোন্ রে মজুতদার,
ফসল ফলানো মাটিতে রোপণ
করব তোকে এবার।
তারপর বহুশত যুগ পরে
ভবিষ্যতের কোনো যাদুঘরে
নৃতত্ত্ববিদ্ হয়রান হয়ে মুছবে কপাল তার,
মজুতদার ও মানুষের হাড়ে মিল খুঁজে পাওয়া ভার।
তেরোশো সালের মধ্যবর্তী মালিক, মজুতদার
মানুষ ছিল কি? জবাব মেলে না তার।
আজ আর বিমূঢ় আস্ফালন নয়,
দিগন্তে প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়;
আজকের নৈঃশব্দ হোক যুদ্ধারম্ভের স্বীকৃতি।
দুহাতে বাজাও প্রতিশোধের উন্মত্ত দামামা,
প্রার্থনা করো: হে জীবন, যে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা—
আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি,
প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের
তুষার-গলানো উত্তাপ।
টুকরে টুকরো ক’রে ছেঁড়ো তোমার
অন্যায় আর ভীরুতার কলঙ্কিত কাহিনী।
শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে
একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।
তা যদি না হয় মাথার উপরে ভয়ঙ্কর
বিপদ নামুক, ঝড়ে বন্যায় ভাঙুক ঘর;
তা যদি না হয়, বুঝব তুমি মানুষ নও−
গোপনে গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও।
ভারতবর্ষ মাটি দেয়নিকো, দেয় নি জল
দেয় নি তোমার মুখেতে অন্ন, বাহুতে বল
পূর্বপুরুষ অনুপস্থিত রক্তে, তাই
ভারতবর্ষে আজকে তোমার নেইকো ঠাঁই॥
'হে মহামানব, একবার এসো ফিরে' — গ্রাম-নগরের ভিড়ে একবার চোখ মেলো; এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার, লোকচক্ষুর আড়ালে জমেছে অন্ধকার। মারী-মড়ক-মন্বন্তর-ঘন ঘন বন্যার আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল; চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল; ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো — 'হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।' তারপর তিরস্কার — যারা তোমার ক্ষেতের শস্য চুরি করে গুপ্তকক্ষে জমায়, তাদেরই দুপায়ে তুমি প্রাণ ঢেলে দিয়েছ দুঃসহ ক্ষমায়; 'তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল।' তুমি প্রহর গোনো, তারা মুদ্রা গোনে কোটি কোটি; শূন্য মাঠে কঙ্কাল-করোটি তোমাকে বিদ্রূপ করে। তারপর সরাসরি যুদ্ধঘোষণা — 'শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার! তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড় — হিসাব কি দিবি তার?' প্রিয়াকে কেড়েছিস, ভেঙেছিস ঘরবাড়ি — 'স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই।' দুহাতে বাজাও প্রতিশোধের উন্মত্ত দামামা; শোষক-শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে একত্রিত হোক সংহতি। 'তা যদি না হয়, বুঝব তুমি মানুষ নও — গোপনে গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও।' শেষ স্তবকে চরম উচ্চারণ — ভারতবর্ষ মাটি দেয়নি, জল দেয়নি, মুখে অন্ন দেয়নি যাকে, পূর্বপুরুষ যার রক্তে অনুপস্থিত — ভারতবর্ষে তার ঠাঁই নেই।
'বোধন' নামটি নিজেই একটি প্রতিবাদ — শারদীয়া দুর্গাপূজার বোধনে দেবীর জাগরণ হয় অশুভ-বিনাশের জন্য; সুকান্ত সেই পবিত্র অনুষঙ্গ ছিনিয়ে এনে প্রয়োগ করেন মজুতদার-শোষকের বিরুদ্ধে জাগরণে। ধর্মীয় রূপকের এই রাজনৈতিক পুনর্ব্যবহার সুকান্তের কবিতার চেনা কৌশল। কবিতার গঠন তিন পর্বে: প্রথমে মহামানবের প্রতি আহ্বান — দেশের দুর্দশার চিত্র ('এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার'); দ্বিতীয়ে আত্ম-সমালোচনা — শোষককে ক্ষমা করাই আমাদের অন্যায়, 'তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল' — এই পংক্তিতে সুকান্ত প্রতিবাদের দর্শন দেন: নীরবতা ও ক্ষমা শোষণের সহযোগী। তৃতীয় পর্বে সরাসরি আক্রমণ — 'শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার!' সম্বোধনের এই তুই-তোকারিতে কবিতা আদালতের কাঠগড়া থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছায়। 'তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড় — হিসাব কি দিবি তার?' — মন্বন্তরের (১৯৪৩) প্রত্যক্ষ স্মৃতি এই পংক্তিতে রক্তমাংস পায়; মজুতদারি যে গণহত্যারই নামান্তর, সুকান্ত তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন। 'রক্তের ভাগীরথী আনো', 'লোভের মাথায় পদাঘাত হানো' — চিত্রকল্পে হিংস্রতা আছে, কিন্তু তা প্রতিরক্ষামূলক হিংস্রতা — আক্রান্তের প্রত্যাঘাত। শেষ স্তবকের অভিশাপ — 'ভারতবর্ষে আজকে তোমার নেইকো ঠাঁই' — নৈতিক চরমতায় পৌঁছায়; যার রক্তে পূর্বপুরুষের সংগ্রাম নেই, সে এই মাটির উত্তরাধিকারী নয়। সমালোচকরা এই চরমতাকে প্রশ্ন করতে পারেন, কিন্তু ১৯৪৩-৪৭-এর পটভূমিতে — মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগের মুখে দাঁড়িয়ে একুশ বছরের কবির এই গর্জনই ছিল সত্য। 'ছাড়পত্র'তে মরণোত্তর (১৯৪৭) প্রকাশিত এই কবিতা সুকান্তকে 'গণমানুষের কবি' করে তোলে। ভাষার দিক থেকে 'বোধন' সুকান্তের মিশ্র রেজিস্টারের নিদর্শন — একদিকে 'হে মহামানব'র সংস্কৃত-গম্ভীর সম্বোধন, অন্যদিকে 'শোন্ রে মজুতদার'র রাস্তার ভাষা; একদিকে 'রক্তের ভাগীরথী'র পৌরাণিক চিত্রকল্প, অন্যদিকে 'মুদ্রা গোনে কোটি কোটি'র সাংবাদিক সরলতা। এই মিশ্রণই সুকান্তের স্বাতন্ত্র্য — তিনি একই সঙ্গে মহাকাব্যিক ও প্রচারপত্রিক। 'বোধন' নামের দুর্গাপূজা-সংযোগ আরও গভীরে: শারদীয়া বোধনে দেবীকে জাগানো হয় মহিষাসুর-বধের জন্য; সুকান্তের বোধনেও 'অসুর' আছে — মালিক-মজুতদার। কিন্তু দেবী এখানে আসেন না; আসতে হয় 'মহামানব'কে — অর্থাৎ মানুষকেই নিজের মুক্তির দেবতা হতে হয়। এই ধর্মনিরপেক্ষ পুনর্পাঠ সুকান্তের মার্কসবাদী দৃষ্টির পরিচয় দেয়। সমালোচনার ইতিহাসে 'বোধন' নিয়ে বিতর্কও আছে — শেষ স্তবকের চরমতা কি কবিতার শিল্পকে ক্ষুণ্ণ করে? কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক মনে করেন, ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের প্রত্যক্ষদর্শীর কণ্ঠে এই চরমতাই সত্য।
শোষণ-বিরোধিতা, জাগরণ, ন্যায়
সম্বোধন-প্রধান বক্তৃতাধর্মী কবিতা; 'হে মহামানব' থেকে 'শোন্ রে মজুতদার' — সম্বোধনের তীব্রতা বৃদ্ধিতে গঠন। ধর্মীয় 'বোধন' অনুষঙ্গের রাজনৈতিক পুনর্ব্যবহার। 'রক্তের ভাগীরথী', 'কঙ্কাল-করোটি'র মতো তীব্র চিত্রকল্প। শেষে অভিশাপ-ভঙ্গিতে নৈতিক চরমতা। মুক্তছন্দের দ্রুত, আঘাতি চাল।
'ছাড়পত্র' কাব্যগ্রন্থে মরণোত্তর প্রকাশিত, ১৯৪৭। ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ও দেশভাগ-পূর্ব সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পটভূমিতে রচিত। একুশ বছর বয়সে মৃত্যুর (১৯৪৭) আগে সুকান্ত এই কবিতায় শোষকের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধঘোষণা করেন।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”