ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না: তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন—
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ,
আমি একাই—ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন—
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে—
আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছ বারংবার;
তবু কেন বোঝ না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে, গ্রামে—দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়—
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না: কবে আমরা জ্বলে উঠব—
সবাই—শেষবারের মতো!
কবিতার বক্তা একটি ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি। সে বলছে—আমি এত নগণ্য যে চোখেও পড়ি না, তবু জেনো, আমার মুখে উসখুস করছে বারুদ, বুকে জ্বলে ওঠার দুরন্ত উচ্ছ্বাস। সেদিনের কথা মনে আছে? আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায় ঘরের কোণে আগুন জ্বলে উঠেছিল; আমি কত ঘর পুড়িয়েছি, কত প্রাসাদ ধূলিসাৎ করেছি—আমি একাই, ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি। এমনি বহু নগর-রাজ্য ছারখার করে দিতে পারি, তবু আমাদের অবজ্ঞা করবে? এই সেদিন আমরা সবাই একই বাক্সে জ্বলে উঠেছিলাম; তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ আমরা শুনেছি। আমাদের অসীম শক্তি তোমরা বারবার অনুভব করেছ, তবু বোঝ না—আমরা তোমাদের পকেটে বন্দী থাকব না; বেরিয়ে পড়ব শহরে-গঞ্জে-গ্রামে, দিগন্ত থেকে দিগন্তে। আমরা বারবার জ্বলি অবহেলায়—তা তোমরা জানো; কিন্তু জানো না, কবে আমরা সবাই একসঙ্গে জ্বলে উঠব—শেষবারের মতো। অর্থাৎ শোষিত জনতাকে যতই তুচ্ছ ভাবা হোক, সংগঠিত হলে তারাই ইতিহাস বদলে দেবে।
‘দেশলাই কাঠি’ কবিতার জাদু এর বক্তা-নির্বাচনে—কথা বলছে পৃথিবীর সবচেয়ে তুচ্ছ বস্তুগুলোর একটি। কিন্তু এই তুচ্ছতার ভেতরেই সুকান্ত লুকিয়ে রেখেছেন তার রাজনৈতিক দর্শনের সারকথা: ইতিহাস বদলায় রাজা-মহারাজারা নয়, বদলায় নগণ্য, অবহেলিত, ‘চোখেও পড়ে না’ এমন মানুষেরা। ‘মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ’—‘উসখুস’ শব্দটি লক্ষণীয়; এটি অস্থিরতা, অধৈর্য, আসন্ন বিস্ফোরণের পূর্বাভাস। বারুদ এখনো জ্বলেনি, কিন্তু জ্বলার জন্য উদগ্রীব—এ যেন বিপ্লবের ঠিক আগের মুহূর্তের জনতা। কবিতাটি একটি নাটকীয় এককসংলাপ (dramatic monologue); বক্তা সরাসরি ‘তোমরা’ বলে সম্বোধন করছে শোষক-সুবিধাভোগীদের, আর পাঠক সেই ‘তোমরা’র আসনে বসে অস্বস্তি বোধ করে। দ্বিতীয় স্তবকে অতীতের দৃষ্টান্ত—‘মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?’—এই প্রশ্নে ইতিহাসের সাক্ষ্য টানা হয়েছে: ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, তেভাগা—ছোটো মানুষেরাই প্রাসাদ ধূলিসাৎ করেছে বারবার। ‘আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়’—এই পংক্তিটি কবিতার মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্র; অবজ্ঞাই আগুনের কারণ। শোষক যত অবজ্ঞা করে, শোষিতের ক্রোধ তত জমে। তৃতীয় স্তবকে একবচন থেকে বহুবচনে উত্তরণ—‘আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে’। বাক্সটি এখানে সংগঠনের রূপক—বিচ্ছিন্ন কাঠিগুলো আলাদা থাকলে নিভে যায়, কিন্তু এক বাক্সে একসঙ্গে জ্বললে তা মহা-অগ্নিকাণ্ড। ‘তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ’—ভয়ের এই চিত্র শোষকের ভবিষ্যৎ। চতুর্থ স্তবকের ‘আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব / শহরে, গঞ্জে, গ্রামে—দিগন্ত থেকে দিগন্তে’—এই বিস্তারের কল্পনায় গেরিলা-আন্দোলনের ছায়া; বিপ্লব আর রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আর শেষ স্তবকের শেষ পংক্তি—‘সবাই—শেষবারের মতো!’—বাংলা কবিতার অন্যতম শিহরণ-জাগানো সমাপ্তি। ‘শেষবারের মতো’ মানে চূড়ান্ত, নির্ণায়ক, আর কোনো আপস নয়। ১৯৪৩-৪৭ সালে লেখা এই কবিতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, নৌ-বিদ্রোহ ও তেভাগা আন্দোলনের উত্তাপ আছে। সুকান্ত দেখেছিলেন—ক্ষুদ্র মানুষের সম্মিলিত শক্তিই ইতিহাসের ইঞ্জিন। ভাষা সরল, ছন্দ মুক্ত, কিন্তু প্রতিটি পংক্তিতে আগুনের হলকা। এই কবিতা শুধু পড়ার নয়—এটি উচ্চারণের, মিছিলের, শপথের কবিতা। ‘একই বাক্সে’—এই চিত্রটির রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। বাক্স মানে সংগঠন—ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি, পার্টি। বিচ্ছিন্ন কাঠি আলাদা জ্বললে নিভে যায়, কিন্তু বাক্সভর্তি কাঠি একসঙ্গে জ্বললে তা দাবানল। সুকান্ত এখানে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের চেয়ে সংগঠিত আন্দোলনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন—যা তার কমিউনিস্ট রাজনীতিরই প্রতিফলন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র সঙ্গে এই কবিতার তুলনা চলে: দুটোতেই ‘আমি’র দম্ভ, দুটোতেই ধ্বংসের আনন্দ। কিন্তু নজরুলের ‘আমি’ মহাজাগতিক, আর সুকান্তের ‘আমি’ একটি দেশলাইয়ের কাঠি—অর্থাৎ নজরুল আকাশ থেকে নামেন, সুকান্ত মাটি থেকে ওঠেন। এই মাটির গন্ধই সুকান্তকে আলাদা করে। কবিতাটি মে দিবস, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে নিয়মিত পাঠ হয়; শিশু-কিশোরদের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতাগুলোর একটি—কারণ এর ভাষা সহজ, কিন্তু আগুন সত্যিকারের।
বিপ্লব, শ্রেণিসংগ্রাম, জনতার শক্তি, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
নাটকীয় এককসংলাপ—জড়বস্তু (দেশলাই কাঠি) প্রথম পুরুষে বক্তা, সরাসরি ‘তোমরা’ সম্বোধনে পাঠককে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। রূপকই কবিতার প্রাণ: কাঠি = শোষিত জনতা, বারুদ = বিপ্লবী চেতনা, বাক্স = সংগঠন, আগুন = বিপ্লব। একবচন থেকে বহুবচনে (‘আমি’ থেকে ‘আমরা’) উত্তরণ কবিতার গঠনগত মোড়—ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে। ‘শেষবারের মতো!’—বিস্ময়চিহ্নে শেষ হওয়া চূড়ান্ত ঘোষণা কবিতাকে প্রায় রণহুংকারে পরিণত করেছে। ভাষা সহজ, ছন্দ মুক্ত, পুনরাবৃত্তিতে (‘আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব’) ছন্দোময় গতি।
‘দেশলাই কাঠি’ ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থের (১৯৪৮) অন্তর্গত; গ্রন্থের কবিতাগুলো ১৯৪৩-৪৭ সালে রচিত। এই সময় বাংলা দেখেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংস, পঞ্চাশের মন্বন্তরে লাখো মানুষের মৃত্যু, ১৯৪৬-এর নৌ-বিদ্রোহ ও তেভাগা আন্দোলন। তরুণ সুকান্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; তার কবিতায় শ্রমিক-কৃষকের জাগরণই কেন্দ্রীয় বিষয়। ‘দেশলাই কাঠি’ সেই জাগরণেরই রূপক-ঘোষণা—নগণ্য মানুষের হাতেই ইতিহাসের বারুদ।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”