মূল কন্টেন্টে যান

আত্মবিলাপ

কবিতা

আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু, হায়,
তাই ভাবি মনে?
জীবন-প্রবাহ বহি কাল-সিন্ধু পানে যায়,
ফিরাব কেমনে
দিন দিন আয়ুহীন, হীনবল দিন দিন,—
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না? এ কি দায়!

রে প্রমত্ত মন মম! কবে পোহাইবে রাতি?
জাগিবি রে কবে?
জীবন-উদ্যানে তোর যৌবন-কুসুম-ভাতি
কত দিন রবে?
নীর-বিন্দু দূর্ব্বাদলে, নিত্য কি রে ঝলঝলে?
কে না জানে অম্বুবিম্ব অম্বুমুখে সদ্যঃপাতি?

নিশার স্বপন-মুখে সুখী যে, কি সুখ তার?
জাগে সে কাঁদিতে।
ক্ষণপ্রভা প্রভা-দানে বাড়ায় মাত্র আঁধার
পথিকে ধাঁদিতে!
মরীচিকা মরুদেশে, নাশে প্রাণ তৃষাক্লেশে —
এ তিনের ছল সম ছল রে এ কু-আশার।

প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণে সাদে;
কি ফল লভিলি?
জ্বলন্ত-পাবক-শিখা-লোভে তুই কাল-ফাঁদে
উড়িয়া পড়িলি!
পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায়, ধাইলি, অবোধ, হায়!
না দেখিলি, না শুনিলি, এবে রে পরাণ কাঁদে

বাকী কি রাখিলি তুই বৃথা অর্থ-অন্বেষণে,
সে সাধ সাধিতে?
ক্ষত মাত্র হাত তোর মৃণাল-কণ্টকগণে
কমল তুলিতে!
নারিলি হরিতে মণি, দংশিল কেবল ফণী!
এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি, মন, কেমনে!

যশোলাভ লোভে আয়ু কত যে ব্যয়িলি হায়,
কব তা কাহারে?
সুগন্ধ কুসুম-গন্ধে অন্ধ কীট যথা ধায়,
কাটিতে তাহারে,—
মাৎসর্য্য-বিষদশন, কামড়ে রে অনুক্ষণ!
এই কি লভিলি লাভ, অনাহারে, অনিদ্রায়?

মুকুতা-ফলের লোভে, ডুবে রে অতল জলে
যতনে ধীবর,
শতমুক্তাধিক আয়ু কালসিন্ধু জলতলে
ফেলিস্‌, পামর!
ফিরি দিবে হারাধন, কে তোরে, অবোধ মন,
হায় রে, ভুলিবি কত আশার কুহক-ছলে!

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবি নিজের মনকে সম্বোধন করে বলছেন—আশার ছলনায় ভুলে আমি কী ফল পেলাম, হায়! জীবন-প্রবাহ কাল-সিন্ধুর দিকে বয়ে যাচ্ছে, ফেরাব কেমন করে? দিন দিন আয়ু ক্ষয় হচ্ছে, বল ক্ষয় হচ্ছে, তবু আশার নেশা ছুটল না—এ কী দায়! হে প্রমত্ত মন, তোর রাত কবে পোহাবে, কবে জাগবি? যৌবনের ফুল কতদিন থাকবে? দূর্বাদলে শিশিরবিন্দু কি চিরকাল ঝলঝল করে? সবাই জানে, জলের প্রতিবিম্ব ক্ষণস্থায়ী। রাতের স্বপ্নে যে সুখী, সে জেগে কাঁদে; বিদ্যুতের আলো পথিককে আরও অন্ধকারে ঠেলে দেয়; মরীচিকা মরুভূমিতে তৃষ্ণার্তের প্রাণ নাশ করে—কু-আশার ছলও তেমনি। প্রেমের শিকল নিজেই পায়ে পরলি, কী পেলি? জ্বলন্ত আগুনের লোভে পতঙ্গের মতো ফাঁদে পড়লি। বৃথা অর্থের খোঁজে মৃণালের কাঁটায় হাত ক্ষত করলি, মণি পেলি না—সাপে কামড়াল। যশের লোভে আয়ু ব্যয় করলি, মাৎসর্যের বিষদংশনে জর্জরিত হলি। মুক্তোর লোভে অতল জলে ডুবে ধীবরের মতো আয়ু হারালি, পামর মন! হারানো ধন কে ফিরিয়ে দেবে? হায়, আর কতকাল আশার কুহকে ভুলবি! অর্থাৎ পার্থিব মোহ—আশা, প্রেম, অর্থ, যশ—সবই মায়া; জীবন বৃথা গেল।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘আত্মবিলাপ’ পড়লে মনে হয়, কবি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলছেন—আর এই আয়না এত নির্মম যে পাঠকেরও নিজের মুখ দেখা হয়ে যায়। মধুসূদনের জীবনই এই কবিতার পাঠ্যপুস্তক: হিন্দু কলেজের মেধাবী ছাত্র, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ, মাদ্রাজে সাংবাদিকতা, ইংরেজি কবি হওয়ার স্বপ্নে বিলেতযাত্রা, ব্যারিস্টার হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা, চরম দারিদ্র্য, অবশেষে বাংলায় ফিরে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। ‘আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু’—এই প্রথম পংক্তিই তার গোটা জীবনের সারসংক্ষেপ। যে আশা তাকে বিলেতে টেনেছিল, সেই আশাই তাকে নিঃস্ব করেছে। ‘জীবন-প্রবাহ বহি কাল-সিন্ধু পানে যায়’—কালকে সিন্ধু (সমুদ্র) বলার মধ্যে গভীর দর্শন: সময়ের স্রোত একমুখী, ফেরানো যায় না; আর সিন্ধুতে মিলিয়ে যাওয়া মানে মৃত্যুতে বিলীন হওয়া। কবিতার গঠন লক্ষণীয়—সাতটি স্তবকে কবি নিজের সাতটি ভুলের হিসাব নিয়েছেন, যেন সাতটি আঘাত। দ্বিতীয় স্তবকে ‘রে প্রমত্ত মন মম!’—এই সম্বোধনে উপনিষদীয় আত্ম-সংলাপের সুর; মনকে পৃথক সত্তা ভেবে তিরস্কার করা ভারতীয় অধ্যাত্ম-ঐতিহ্যেরই ধারা। ‘নীর-বিন্দু দূর্ব্বাদলে, নিত্য কি রে ঝলঝলে?’—শিশিরবিন্দুর এই চিত্র বৌদ্ধ দর্শনের অনিত্যতা-ভাবনার কাব্যরূপ। তৃতীয় স্তবকের তিনটি উপমা—নিশার স্বপন, ক্ষণপ্রভা (বিদ্যুৎ), মরীচিকা—তিনটিই মায়ার রূপ; ‘এ তিনের ছল সম ছল রে এ কু-আশার’ পংক্তিতে কবি সিদ্ধান্তে পৌঁছান। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ স্তবকে তিনটি নির্দিষ্ট মোহের বিচার: প্রেম (‘প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণে’—নিজেই শিকল গড়ে পায়ে পরা!), অর্থ (‘বৃথা অর্থ-অন্বেষণে’ মৃণালের কাঁটায় ক্ষত), যশ (‘মাৎসর্য্য-বিষদশন’—পরশ্রীকাতরতার বিষদাঁত)। ‘পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায়, ধাইলি, অবোধ’—পতঙ্গ-পাবক উপমাটি কালিদাসীয় ঐতিহ্যের। শেষ স্তবকের ধীবর-রূপকটি সবচেয়ে মর্মান্তিক: মুক্তোর লোভে ডুবুরি যেমন অতল জলে প্রাণ দেয়, তেমনি আশার মুক্তোর লোভে কবি আয়ু হারালেন ‘কালসিন্ধু জলতলে’। ভাষার দিক থেকে কবিতাটি তৎসম-প্রধান, মধুসূদনীয় অমিত্রাক্ষরের গাম্ভীর্য নিয়ে; ‘সাদে’ (=সাধে), ‘বাকী’, ‘ফেলিস্‌’—এই প্রাচীন রূপগুলো কবিতাকে শাস্ত্রীয় মর্যাদা দেয়। কিন্তু এই শাস্ত্রীয়তার ভেতর দিয়ে যে আত্মগ্লানি ফুটেছে, তা একান্ত আধুনিক—আত্মবিশ্লেষণ, অপরাধবোধ, অস্তিত্বের সংকট। তাই ‘আত্মবিলাপ’ শুধু মধুসূদনের নয়, প্রতিটি মানুষেরই কবিতা—যে একদিন পেছন ফিরে ভাবে, ‘কি ফল লভিনু, হায়!’ ছন্দের দিক থেকে কবিতাটি মধুসূদনের সনেট-পরীক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ইতালীয় সনেটের অষ্টক-ষটক কাঠামোকে বাংলা কবিতায় প্রতিস্থাপন করেছিলেন; ‘আত্মবিলাপ’-এ সেই কাঠামোর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে একটানা আত্মধিক্কার। ষষ্ঠ স্তবকের ‘মাৎসর্য্য-বিষদশন’ পংক্তিটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়—এখানে কবি স্বীকার করছেন, যশের পেছনে ছুটতে গিয়ে তিনি পরশ্রীকাতরতায় দংশিত হয়েছেন; এই সততা বাংলা কবিতায় বিরল। ‘বিবিধ কাব্য’ সংকলনের টীকায় ‘সাদে—সাধে’ বলে যে গ্লস দেওয়া আছে, তা প্রমাণ করে কবি সচেতনভাবে প্রাচীন রূপ ব্যবহার করতেন—ভাষার ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতে। আজ স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে এই কবিতা পড়ানো হয় নৈতিক শিক্ষার অংশ হিসেবে; কিন্তু এর আসল শক্তি নীতিকথায় নয়—একজন প্রতিভাবান মানুষের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তিতে, যা প্রতিটি পাঠককে নিজের জীবনের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।

প্রধান ভাব ও বার্তা

আত্মসমালোচনা, মোহভঙ্গ, জীবনের অনিত্যতা, পার্থিব মায়া

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

চতুর্দশপদী (সনেট) ধারার কবিতা—মধুসূদনই বাংলায় সনেটের প্রবর্তক। আত্ম-সংলাপমূলক গঠন: কবি নিজের মনকে ‘রে প্রমত্ত মন’, ‘অবোধ মন’, ‘পামর’ বলে সম্বোধন করে বিচারকের আসনে বসেছেন। উপমা-রূপকের ঘনঘটা—কাল-সিন্ধু, নীর-বিন্দু, ক্ষণপ্রভা, মরীচিকা, পতঙ্গ-পাবক, ধীবর—প্রতিটি চিত্র অনিত্যতার ভিন্ন রূপ। তৎসম-প্রধান গুরুগম্ভীর ভাষা, প্রাচীন ক্রিয়ারূপ (‘সাদে’, ‘ফেলিস্‌’) কবিতাকে শাস্ত্রীয় মর্যাদা দিয়েছে। প্রশ্নবোধক পংক্তির (‘ফিরাব কেমনে’, ‘জাগিবি রে কবে?’) বারবার ব্যবহার আত্মজিজ্ঞাসাকে তীব্র করেছে। সাত স্তবকে সাতটি মোহের বিচার—সুসংহত নৈতিক কাঠামো।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৮৬৫ সালে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে বসে মধুসূদন পেত্রার্কের সনেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলা চতুর্দশপদী রচনা শুরু করেন; ১৮৬৬ সালে ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তখন তার জীবনের সবচেয়ে সংকটময় পর্ব—বিলেত-ফেরত, ব্যারিস্টারি-ব্যর্থ, চরম অর্থকষ্ট, স্ত্রী হেনরিয়েটার সঙ্গে টানাপোড়েন। ‘আত্মবিলাপ’ এই পর্বেরই ফসল—বহির্জগতে ব্যর্থ কবির অন্তর্জগতের হিসাবনিকাশ। উনিশ শতকের নবজাগরণের পটভূমিতে, যখন বাঙালি পাশ্চাত্য-মোহ ও স্বদেশ-চেতনার টানাপোড়েনে দুলছিল, তখন মধুসূদনের এই আত্মস্বীকারোক্তি একটি প্রজন্মেরই স্বীকারোক্তি হয়ে ওঠে।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।