ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে।।
গেরাম বেড়ে অগাধ পানি
নাই কিনারা নাই তরণী পারে।
বাঞ্ছা করি দেখব তারে
কেমনে সে গাঁয় যাই রে।।
কি বলবো সেই পড়শির কথা
তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা নাইরে।
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।।
পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেতো দূরে।
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।।
গানের বক্তা বলছেন—বাড়ির কাছেই আরশিনগর, সেখানে এক পড়শি বসত করে, কিন্তু আমি একদিনও তাকে দেখিনি। গ্রাম ঘিরে অগাধ পানি—নেই কিনারা, নেই পার হওয়ার তরণী। মনে বাসনা, তাকে দেখব; কিন্তু সে গাঁয়ে যাই কেমন করে? সেই পড়শির কথা কী বলব—তার হাত-পা-কাঁধ-মাথা কিছুই নেই; ক্ষণেক থাকে শূন্যের ওপর, ক্ষণেক ভাসে জলে। পড়শি যদি আমায় ছুঁত, যম-যাতনা সব দূরে যেত। সে আর লালন একখানে রয়, তবু লক্ষ যোজন ফাঁক। অর্থাৎ পরম সত্তা দেহের ভেতরেই আছে—অতি নিকটে, অথচ মায়ার আবরণে অদৃশ্য; সাধনা ছাড়া তার দেখা মেলে না।
‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’—শিরোনামেই গোটা বাউল দর্শন। ‘আরশি’ মানে আয়না; আরশিনগর হলো আয়নার নগর—অর্থাৎ নিজের দেহ, নিজের অন্তর। বাউল বিশ্বাস করে, যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহভাণ্ডে; স্রষ্টাকে খুঁজতে মক্কা-কাশী যেতে হয় না, তিনি বসত করেন ‘বাড়ির কাছে’—নিজের ভেতরে। কিন্তু ট্র্যাজেডি এই যে, ‘আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে’—এত কাছে থেকেও দেখা হয় না। কেন? দ্বিতীয় স্তবকে উত্তর: ‘গেরাম বেড়ে অগাধ পানি, নাই কিনারা নাই তরণী পারে’। এই দেহ-গ্রাম ঘিরে আছে অগাধ মায়ার পানি; পার হওয়ার নৌকা (গুরুর কৃপা, সাধনা) ছাড়া ওপারে যাওয়া যায় না। ‘বাঞ্ছা করি দেখব তারে, কেমনে সে গাঁয় যাই রে’—এই আকুলতাই বাউল সাধনার প্রাণ। তৃতীয় স্তবকে পড়শির বর্ণনা দার্শনিকভাবে চমকপ্রদ: ‘তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা নাইরে’—পরম সত্তা নিরাকার, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ তার নেই। ‘ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর, ক্ষণেক ভাসে নীরে’—তিনি একই সঙ্গে অতীন্দ্রিয় (শূন্য) ও সর্বব্যাপী (নীর); উপনিষদের ‘তদেজতি তন্নৈজতি’ (তিনি চলেন, তিনি চলেন না)—এই ভাবনারই লোকায়ত রূপ। চতুর্থ স্তবকে মুক্তির আশ্বাস: ‘পড়শি যদি আমায় ছুঁতো, যম যাতনা সকল যেতো দূরে’—সেই পরশ পেলে জন্ম-মৃত্যুর যন্ত্রণা শেষ। আর শেষ দুই পংক্তি বাংলা গানের ইতিহাসের অন্যতম গভীরতম দার্শনিক উক্তি: ‘সে আর লালন একখানে রয়, তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে’। অদ্বৈতবাদের এই প্যারাডক্স—জীব ও ব্রহ্ম এক, অথচ অজ্ঞানের ব্যবধান লক্ষ যোজন—শংকরের মায়াবাদেরই বাউল সংস্করণ। লালন এখানে নিজের নাম ব্যবহার করেছেন (‘সে আর লালন’), যা বাউল গানের রীতি—ভণিতায় নিজেকে উল্লেখ করে বক্তব্যকে ব্যক্তিগত সাক্ষ্যে পরিণত করা। ভাষা সহজ, ছন্দ গানের; কিন্তু প্রতিটি শব্দে দর্শনের ভার। এই গান প্রমাণ করে, লালন ছিলেন শুধু গায়ক নন—তিনি ছিলেন দার্শনিক, যিনি জটিল অধ্যাত্মতত্ত্বকে গ্রামের মানুষের ভাষায় গেয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ এই গানেরই ভাবধারায় মুগ্ধ হয়ে লালনকে ‘বাউল কবি’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন। এই গানের সুর ও ছন্দের দিকটিও উল্লেখযোগ্য। বাউল গানের ঢঙে রচিত হলেও এর ভেতরে আছে গভীর শাস্ত্রীয়তা—‘আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে’ ধুয়োটি প্রতিটি স্তবকের শেষে ফিরে এসে শ্রোতার মনে একই প্রশ্ন জাগায়: আমি কি দেখেছি? রবীন্দ্রনাথ এই গানের দর্শনে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ‘মানুষের ধর্ম’ বক্তৃতামালায় বাউল সাধনার ব্যাখ্যায় লালনের ভাবধারাকে কেন্দ্রে রেখেছিলেন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিতে এই গানের ‘পড়শি’ সুফিবাদের ‘ইনসান-ই-কামিল’, খ্রিস্টান রহস্যবাদের ‘অন্তর্যামী ঈশ্বর’ এবং উপনিষদের ‘অন্তর্যামী আত্মা’—সবকটি ধারণারই সাযুজ্য বহন করে। অথচ লালন কোনো শাস্ত্র পড়েননি; তিনি গেয়েছেন নিজের উপলব্ধি। এই মৌখিক জ্ঞান-ঐতিহ্যই বাউল দর্শনের মহত্ত্ব—পুঁথিগত পাণ্ডিত্য ছাড়াই পরম সত্যে পৌঁছানো যায়, যদি অন্তর সাধনায় প্রস্তুত থাকে।
অধ্যাত্মবাদ, দেহতত্ত্ব, মনের মানুষ, মায়া ও মুক্তি
বাউল গানের রীতি—সহজ ভাষা, গভীর দর্শন; প্রতিটি চিত্রই রূপক: আরশিনগর = দেহ/অন্তর, পড়শি = পরম সত্তা, অগাধ পানি = মায়া, তরণী = গুরুকৃপা। প্যারাডক্স ও বৈপরীত্যের ব্যবহার (‘একখানে রয়, তবু লক্ষ যোজন ফাঁক’) অদ্বৈতভাবনাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করেছে। ভণিতায় কবির নিজের নাম (‘সে আর লালন’)—বাউল ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য। পুনরাবৃত্তিমূলক ধুয়ো-কাঠামো (‘আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে’) গানটিকে স্মরণীয় ও গেয় করে তুলেছে। প্রশ্নোত্তরধর্মী ভঙ্গি (‘কেমনে সে গাঁয় যাই রে’) শ্রোতাকে সাধনার অংশীদার করে।
লালন (আনু. ১৭৭৪–১৮৯০) কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়া গড়ে বাউল সাধনা ও গানের প্রচার করেন। তার গান লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়নি—শিষ্য-পরম্পরায় মৌখিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে; পরে সংগ্রাহকদের উদ্যোগে লিপিবদ্ধ হয়। ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ এই মৌখিক ঐতিহ্যেরই ফসল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের গানে মুগ্ধ হয়ে ‘মানুষের ধর্ম’ ও বিভিন্ন প্রবন্ধে বাউল দর্শনের ব্যাখ্যা দেন, ফলে লালন বিশ্বসাহিত্যের দরবারে পৌঁছান। আজ এই গান বাউল-ফকিরদের কণ্ঠে, শহুরে ব্যান্ডের পরিবেশনায়—সর্বত্র বাঙালি অধ্যাত্মচেতনার প্রতীক।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”