মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!
তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা!
অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে,
গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,
তনু ভরি’ যৌবন, তাপসী অপর্ণা!
ঝর্ণা!

পাষাণের স্নেহধারা! তুষারের বিন্দু!
ডাকে তোরে চিত-লোল উতরোল সিন্ধু|
মেঘ হানে জুঁইফুলী বৃষ্টি ও-অঙ্গে,
চুমা-চুমকীর হারে চাঁদ ঘেরে রঙ্গে,
ধূলা-ভরা দ্যায় ধরা তোর লাগি ধর্ণা!
ঝর্ণা!

এস তৃষার দেশে এস কলহাস্যে –
গিরি-দরী-বিহীরিনী হরিনীর লাস্যে,
ধূসরের ঊষরের কর তুমি অন্ত,
শ্যামলিয়া ও পরশে কর গো শ্রীমন্ত;
ভরা ঘট এস নিয়ে ভরসায় ভর্ণা;
ঝর্ণা!

শৈলের পৈঠৈয় এস তনুগত্রী!
পাহাড়ে বুক-চেরা এস প্রেমদাত্রী!
পান্নার অঞ্জলি দিতে দিতে আয় গো,
হরিচরণ-চ্যুতা গঙ্গার প্রায় গো,
স্বর্গের সুধা আনো মর্ত্যে সুপর্ণা!
ঝর্ণা!

মঞ্জুল ও-হাসির বেলোয়ারি আওয়াজে
ওলো চঞ্চলা! তোর পথ হল ছাওয়া যে!
মোতিয়া মোতির কুঁড়ি মূরছে ও-অলকে;
মেখলায়, মরি মরি, রামধনু ঝলকে
তুমি স্বপ্নের সখী বিদ্যুত্পর্ণা
ঝর্ণা!

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবি ঝর্ণাকে সম্বোধন করে বলছেন—ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা! তুমি তরলিত চন্দ্রিকা, চন্দন-বর্ণা; তোমার অঞ্চল গৈরিক-স্বর্ণে সিঞ্চিত, কুন্তলে গিরি-মল্লিকা দোলে; যৌবনে ভরপুর তুমি তাপসী অপর্ণা। তুমি পাষাণের স্নেহধারা, তুষারের বিন্দু; উতরোল সিন্ধু তোমায় ডাকে। মেঘ তোমার অঙ্গে জুঁইফুলের বৃষ্টি হানে, চাঁদ তোমায় ঘিরে রঙ্গে চুমকির হার পরায়; ধূলোভরা ধরা তোমার লাগি ধর্ণা দেয়। এসো তৃষার দেশে কলহাস্যে, হরিণীর লাস্যে; ধূসর ঊষরের অবসান ঘটাও, তোমার পরশে শ্যামল করো; ভরা ঘট নিয়ে এসো ভরসায়। শৈলের পৈঠায় এসো, পাহাড়ের বুক চিরে এসো প্রেমদাত্রী; পান্নার অঞ্জলি দিতে দিতে আয়, হরির চরণচ্যুতা গঙ্গার মতো স্বর্গের সুধা মর্ত্যে আনো। তোমার মঞ্জুল হাসির বেলোয়ারি আওয়াজে, ওলো চঞ্চলা, তোমার পথ ছেয়ে গেছে; তোমার অলকে মোতির কুঁড়ি, মেখলায় রামধনু ঝলকায়—তুমি স্বপ্নের সখী, বিদ্যুৎবর্ণা। অর্থাৎ ঝর্ণা প্রকৃতির দানশীল সৌন্দর্যের প্রতীক—যে তৃষার্ত পৃথিবীকে জীবন দেয়।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘ঝর্ণা’ কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়, কবি শুধু ঝর্ণা দেখেননি—তিনি ঝর্ণার শব্দ শুনেছেন, আর সেই শব্দকেই ছন্দে বেঁধেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘ছন্দের যাদুকর’ নামে খ্যাত; এই কবিতা সেই খ্যাতির শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। প্রতি স্তবকের ছয়টি পংক্তি যেন জলের ধারার মতো গড়িয়ে যায়—‘ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!’—এই উদ্বোধনী ধ্বনিতেই জলপতনের কলকলানি। কবিতার প্রধান কৌশল মানবীকরণ: ঝর্ণা এখানে এক যুবতী নারী—‘তনু ভরি’ যৌবন’, ‘তাপসী অপর্ণা’ (অপর্ণা = পার্বতী, যিনি তপস্যায় পর্ণও খেতেন না)। এই পৌরাণিক ইঙ্গিত ঝর্ণাকে দেবী-মর্যাদা দেয়। চিত্রকল্পের ঘনত্ব বিস্ময়কর: ‘তরলিত চন্দ্রিকা’ (গলে যাওয়া জ্যোৎস্না), ‘চন্দন-বর্ণা’, ‘অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে’ (গেরুয়া-সোনায় ভেজা আঁচল), ‘গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে’ (কানে পাহাড়ি মল্লিকা ফুলের দুল)—প্রতিটি চিত্রে রং, গন্ধ ও গতির মিলন। দ্বিতীয় স্তবকে ঝর্ণার মহিমা: ‘পাষাণের স্নেহধারা’—কঠিন পাথর থেকেও স্নেহের ধারা বয়; ‘ডাকে তোরে চিত-লোল উতরোল সিন্ধু’—সমুদ্রও তাকে ডাকে, অর্থাৎ ক্ষুদ্র ঝর্ণা মহাসিন্ধুরই অংশ। তৃতীয় স্তবকে কবি ঝর্ণাকে আহ্বান জানান ‘তৃষার দেশে’ আসতে—এখানে কবিতা নিছক বর্ণনা থেকে প্রার্থনায় উত্তীর্ণ হয়। ‘ধূসরের ঊষরের কর তুমি অন্ত, শ্যামলিয়া ও পরশে কর গো শ্রীমন্ত’—ঝর্ণা এখানে জীবনদাত্রী, ঊষর মরুকে শ্যামল করার শক্তি। চতুর্থ স্তবকের ‘হরিচরণ-চ্যুতা গঙ্গার প্রায় গো, স্বর্গের সুধা আনো মর্ত্যে’—পৌরাণিক উপমায় ঝর্ণা গঙ্গার সমতুল্য; স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অমৃত আনার এই কল্পনা কবিতাকে আধ্যাত্মিক উচ্চতা দেয়। শেষ স্তবকে ধ্বনিচিত্রের চূড়া: ‘মঞ্জুল ও-হাসির বেলোয়ারি আওয়াজে’—বেলোয়ারি কাচের ঝংকারের মতো ঝর্ণার হাসি; ‘মেখলায়, মরি মরি, রামধনু ঝলকে’—কোমরের মেখলায় রামধনু! এই অলংকার-প্রাচুর্য কাউকে কাউকে অতিরঞ্জন মনে হতে পারে, কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য বাস্তবতা নয়—সৌন্দর্যের উৎসব। উল্লেখ্য, এই ‘ঝর্ণা’ তার বিখ্যাত ‘ঝরনার গান’ (বিদায়-আরতি) থেকে আলাদা কবিতা; সেখানে ঝর্ণা প্রথম পুরুষে নিজের কথা বলে (‘চপল পায় কেবল ধাই’), এখানে কবি তাকে সম্বোধন করেন। দুটি কবিতা মিলে সত্যেন্দ্রনাথের প্রকৃতি-কবিতার দুই মেরু—আত্মকথন ও বন্দনা। সংস্কৃত-ঘেঁষা তৎসম শব্দ (‘তনুগত্রী’, ‘সুপর্ণা’, ‘বিদ্যুত্পর্ণা’) কবিতাকে শাস্ত্রীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়েছে। আজকের পাঠকের কাছে এই কবিতা শেখায়—প্রকৃতিকে দেখতে হয় শুধু চোখে নয়, কানেও; আর কবিতা শুধু অর্থের নয়, ধ্বনিরও শিল্প। সত্যেন্দ্রনাথের অনুবাদ-সাহিত্যের অভিজ্ঞতা এই কবিতায় কাজ করেছে। আরবি-ফার্সি-ফরাসি কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি শিখেছিলেন—ধ্বনিই কবিতার প্রাণ; অর্থ পরে। ‘ঝর্ণা’তে সেই শিক্ষার প্রয়োগ দেখা যায়: ‘মঞ্জুল ও-হাসির বেলোয়ারি আওয়াজে’—এখানে অর্থের চেয়ে ধ্বনির ঝংকারই মুখ্য। শিক্ষার্থীদের জন্য এই কবিতা একটি আদর্শ পাঠ—এতে তারা শেখে, কবিতা শুধু বোঝার জিনিস নয়, শোনারও জিনিস। প্রকৃতি-বন্দনার এই ধারা রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ থেকে আলাদা; সেখানে ঝর্ণা আত্ম-উদ্বোধনের রূপক, এখানে ঝর্ণা নিজেই সৌন্দর্যের দেবী। দুটি দৃষ্টিভঙ্গি মিলে বাংলা প্রকৃতি-কবিতার পূর্ণতা।

প্রধান ভাব ও বার্তা

প্রকৃতির সৌন্দর্য, নারীরূপে প্রকৃতি, জীবনদায়িনী শক্তি, ধ্বনি ও ছন্দ

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

‘ছন্দের যাদুকর’-এর ছন্দ-নৈপুণ্য—পংক্তির ধ্বনিপ্রবাহ জলধারার গতিকে অনুকরণ করে। মানবীকরণ (personification) প্রধান অলংকার: ঝর্ণা সুন্দরী যুবতী, তাপসী, প্রেমদাত্রী। চিত্রকল্পের ঘনত্ব অসাধারণ—‘তরলিত চন্দ্রিকা’, ‘গৈরিকে স্বর্ণে’, ‘রামধনু ঝলকে’—রং ও আলোর উৎসব। পৌরাণিক অনুষঙ্গ (অপর্ণা, হরিচরণ-চ্যুতা গঙ্গা) প্রকৃতিকে দেবী-মর্যাদা দিয়েছে। ধ্বন্যাত্মক শব্দ (‘কলহাস্যে’, ‘বেলোয়ারি আওয়াজে’) শ্রুতিমধুরতা বাড়িয়েছে। সম্বোধনধর্মী গঠন—কবি সরাসরি ঝর্ণার সঙ্গে কথা বলেন, শেষে আহ্বানে পরিণত হয়। তৎসম-প্রধান ভাষা কবিতাকে শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্য দিয়েছে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২–১৯২২) মাত্র চল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত জীবনে ‘সবিতা’, ‘সন্ধিক্ষণ’, ‘বেণু ও বীণা’, ‘কুহু ও কেকা’, ‘অভ্র-আবীর’, ‘বিদায়-আরতি’সহ বহু কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। আরবি-ফার্সি-চীনা-জাপানি-ফরাসি কবিতার অনুবাদও করেন তিনি। ছন্দ নিয়ে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাংলা কবিতায় নতুন দিগন্ত খুলে দেয়—এজন্যই তিনি ‘ছন্দের যাদুকর’। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক হয়েও তিনি নিজস্ব কাব্যভাষা গড়েছিলেন, যেখানে ধ্বনি ও চিত্রই প্রধান। ‘ঝর্ণা’ সেই ধ্বনি-সাধনারই উজ্জ্বল ফসল।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।