মূল কন্টেন্টে যান

ধনধান্যে পুষ্পে ভরা

কবিতা

ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক–সকল দেশের সেরা;–
ও সে, স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে-দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা;
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে–আমার জন্মভূমি।

চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা, কোথায় উজল এমন ধারা।
কোথায় এমন খেলে তড়িৎ এমন কালো মেঘে!
তার পাখির ডাকে ঘুমিয়ে উঠি, পাখির ডাকে জেগে;
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে–আমার জন্মভূমি।

এত স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়!
কোথায় এমন হরিৎক্ষেত্র আকাশতলে মিশে!
এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে!
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে–আমার জন্মভূমি।

পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখী; কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখি;
গুঞ্জরিয়া আসে অলি পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে–
তারা, ফুলের উপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে;
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে–আমার জন্মভূমি।

ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ!–
ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি,
আমার এই দেশেতে জন্ম–যেন এই দেশেতে মরি–
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
ও সে সকল দেশের রানি সে যে–আমার জন্মভূমি।

কবিতার সারসংক্ষেপ

গানের বক্তা বলছেন—ধনধান্য-পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা; তার মাঝে আছে এক দেশ, সকল দেশের সেরা—স্বপ্ন দিয়ে তৈরি, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা সেই দেশ। এমন দেশ কোথাও খুঁজে পাবে না তুমি; সকল দেশের রানি সে যে—আমার জন্মভূমি। কোথায় চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা এমন উজ্জ্বল ধারায়? কোথায় কালো মেঘে এমন তড়িৎ খেলে? তার পাখির ডাকে ঘুমিয়ে উঠি, পাখির ডাকে জাগি। এত স্নিগ্ধ নদী কাহার? কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়? কোথায় এমন হরিৎক্ষেত্র আকাশতলে মেশে? এমন ধানের ওপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে! পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখী, কুঞ্জে কুঞ্জে পাখি গায়; গুঞ্জরিয়ে অলি আসে পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে, ফুলের মধু খেয়ে ফুলের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে। ভাইয়ের-মায়ের এত স্নেহ কোথায় পাবে? ও মা, তোমার চরণ দুটি বক্ষে ধরি; আমার এই দেশেই জন্ম, যেন এই দেশেই মরি। প্রতিটি স্তবক শেষ হয় ধুয়োয়—‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, ও সে সকল দেশের রানি সে যে—আমার জন্মভূমি’।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানের প্রথম বিস্ময় এর জন্ম-ইতিহাসে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মূলত নাট্যকার—‘শাহজাহান’ (১৯০৯) মুঘল সম্রাট শাহজাহানকে নিয়ে ঐতিহাসিক নাটক। সেই নাটকের ভেতরে তিনি বসিয়ে দিলেন একটি খাঁটি বাঙালি দেশাত্মবোধক গান! এই আপাত-অসংগতিই গানটির শক্তি: মুঘল দরবারের গল্প বলতে বলতে কবি আসলে বলছেন স্বদেশের কথা—ইতিহাসের আড়ালে বর্তমানের ডাক। স্বদেশী আন্দোলনের (১৯০৫) উত্তাপে রচিত এই গান নাটকের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পায়। গানটির গঠন অত্যন্ত সুচিন্তিত—পাঁচটি স্তবক, প্রতিটি স্তবক একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যপট: প্রথমে ভূমিকা (বসুন্ধরা ও শ্রেষ্ঠ দেশের ঘোষণা), তারপর আকাশ (চন্দ্র-সূর্য-তারা, মেঘ-তড়িৎ), তারপর ভূমি (নদী, পাহাড়, হরিৎক্ষেত্র, ধানের ঢেউ), তারপর উদ্ভিদ-প্রাণীজগৎ (পুষ্প, পাখি, অলি), আর শেষে মানবিক-আবেগিক শিখর (ভাইয়ের-মায়ের স্নেহ, মায়ের চরণে আত্মনিবেদন)। এই আরোহী কাঠামো—প্রকৃতি থেকে মানুষে, বর্ণনা থেকে ভক্তিতে—শ্রোতাকে ধীরে ধীরে আবেগের চূড়ায় নিয়ে যায়। প্রতিটি স্তবকের শেষে ধুয়োর পুনরাবৃত্তি (‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, ও সে সকল দেশের রানি সে যে—আমার জন্মভূমি’) গানটিকে সমবেত কণ্ঠের উপযোগী করেছে; মিছিলে-সভায় হাজার কণ্ঠে এই ধুয়ো গাওয়া যায়। ‘ও সে, স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে-দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা’—এই পংক্তিটি গভীর: দেশ শুধু মাটি নয়, দেশ হলো স্বপ্ন ও স্মৃতির নির্মাণ—জাতীয়তাবাদের আধুনিক তত্ত্বেরই কাব্যরূপ। ‘তার পাখির ডাকে ঘুমিয়ে উঠি, পাখির ডাকে জেগে’—দৈনন্দিন জীবনের এই চিত্র দেশপ্রেমকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনে। শেষ স্তবকের ‘ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি, আমার এই দেশেতে জন্ম—যেন এই দেশেতে মরি’—এখানে দেশ ‘মা’ হয়ে উঠেছে; বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম্’-এর ধারাবাহিকতায় দেশমাতৃকার বন্দনা। এই আত্মনিবেদনই গানটিকে শুধু বর্ণনামূলক থেকে শপথমূলক করে তুলেছে। উল্লেখ্য, গানের কথা নিয়ে কিছু পাঠভেদ আছে (‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ বনাম ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’, ‘তার পাখির ডাকে’ বনাম ‘তারা পাখির ডাকে’)—কবির মূল রচনা ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ বলেই গবেষকরা মনে করেন। এই পাঠভেদই প্রমাণ করে গানটি কতটা জনপ্রিয়—মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু প্রাণ অটুট আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে, পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতা দিবসে—দুই বাংলাতেই এই গান আজও বাজে; একটি গান যখন দুটি রাষ্ট্রের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তখন বোঝা যায় ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধন রাজনীতির চেয়ে গভীর। গানটির জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রমাণ এর চলচ্চিত্র-জীবন। ‘অগ্নীশ্বর’ ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এই গান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়; সারেগামার রেকর্ডে তা আজও শোনা হয়। গানের কথা নিয়ে পাঠভেদ (‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ বনাম ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’) গবেষকদের আলোচনার বিষয় হলেও সাধারণ শ্রোতার কাছে দুটি রূপই গ্রহণযোগ্য—এটাই লোকপ্রিয় গানের লক্ষণ। বাংলাদেশে এই গান জাতীয় অনুষ্ঠানে, স্কুলের প্রার্থনায় গাওয়া হয়; পশ্চিমবঙ্গেও স্বাধীনতা দিবসে বাজে। একটি গান যখন সীমান্তের দুই পারের মানুষের হৃদয় একসঙ্গে স্পর্শ করে, তখন তা আর শুধু গান থাকে না—তা হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক সেতু।

প্রধান ভাব ও বার্তা

দেশপ্রেম, প্রকৃতির সৌন্দর্য, দেশমাতৃকা, জাতীয়তাবোধ

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

গীতিকবিতার ধারা—পাঁচটি স্তবক, প্রতি স্তবকের শেষে ধুয়োর পুনরাবৃত্তি (‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…’) সমবেত গায়নের উপযোগী। আরোহী কাঠামো: আকাশ → ভূমি → উদ্ভিদ-প্রাণী → মানবিক আবেগ—বর্ণনা থেকে ভক্তিতে উত্তরণ। প্রশ্নমালার ব্যবহার (‘কোথায় এমন…?’, ‘এত স্নিগ্ধ নদী কাহার?’) প্রকৃতির অতুলনীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করে। চিত্রকল্প ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য: ‘ধানের উপর ঢেউ’, ‘পাখির ডাকে ঘুমিয়ে ওঠা’। শেষ স্তবকে দেশ ‘মা’-রূপে মানবীকৃত—‘বন্দে মাতরম্’ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। ভাষা সহজ, ছন্দ গেয়, সুরের সঙ্গে মিলে স্মরণীয়।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে রবীন্দ্রনাথ (‘বাংলার মাটি বাংলার জল’), রজনীকান্ত (‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’), অতুলপ্রসাদ (‘বলো বলো বলো সবে’) ও দ্বিজেন্দ্রলাল—সবাই দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন। দ্বিজেন্দ্রলালের প্রায় সব গানই নাটকের প্রয়োজনে রচিত; ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ প্রথমে স্বদেশী যুগে রচিত হয়ে পরে ‘শাহজাহান’ নাটকে (১৯০৯) অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে খ্যাত এই নাটকের ভেতর দিয়ে গানটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এই গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।