মূল কন্টেন্টে যান

মোদের গরব মোদের আশা

কবিতা

মোদের গরব, মোদের আশা,
আ মরি বাংলা ভাষা!
(মাগো) তোমার কোলে তোমার বোলে
কতই শান্তি ভালোবাসা।

কি জাদু বাংলা গানে–
গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে।
গেয়ে গান নাচে বাউল,
গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।

এই ভাষাতেই নিতাই গোরা
আনল দেশে ভক্তিধারা–
আছে কই এমন ভাষা,
এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা?

বিদ্যাপতি চণ্ডী গোবিন
হেম মধু বঙ্কিম নবীন–
ওই ফুলেরি মধুর রসে
বাঁধল সুখে মধুর বাসা।

বাজিয়ে রবি তোমার বীণে
আনল মালা জগৎ জিনে!–
তোমার চরণ-তীর্থে আজি
জগৎ করে যাওয়া-আসা।

ওই ভাষাতেই প্রথম বোলে
ডাকনু মায়ে ‘মা’ ‘মা’ ব’লে;
ওই ভাষাতেই বলব ‘হরি’
সাঙ্গ হলে কাঁদা হাসা।

কবিতার সারসংক্ষেপ

গানের বক্তা বলছেন—মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! মাগো, তোমার কোলে, তোমার বোলে কতই শান্তি-ভালোবাসা। কী জাদু বাংলা গানে—গান গেয়ে দাঁড় টানে মাঝি, গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা। এই ভাষাতেই নিতাই-গোরা দেশে আনল ভক্তিধারা; আছে কি এমন ভাষা, এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা? বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, হেমচন্দ্র, মধুসূদন, বঙ্কিম, নবীনচন্দ্র—ওই ফুলেরই মধুর রসে বাঁধল সুখে মধুর বাসা। বাজিয়ে রবি তোমার বীণে আনল মালা জগৎ জিনে; তোমার চরণ-তীর্থে আজি জগৎ করে যাওয়া-আসা। ওই ভাষাতেই প্রথম বোলে ডাকনু মায়ে ‘মা’ ‘মা’ বলে; ওই ভাষাতেই বলব ‘হরি’, সাঙ্গ হলে কাঁদা-হাসা। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু—গোটা জীবন এই ভাষার কোলে; তাই এই ভাষাই বাঙালির গরব ও আশা।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘মোদের গরব মোদের আশা’ গানের প্রথম পংক্তিতেই কবির কৌশল ধরা পড়ে—ভাষাকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘মাগো’ বলে। ভাষা এখানে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, সে জননী; তার ‘কোলে’ শান্তি, তার ‘বোলে’ ভালোবাসা। মাতৃভাষা শব্দটির আক্ষরিক অর্থকেই কবি কাব্যে পরিণত করেছেন—ভাষা সত্যিই মা, কারণ মায়ের কোলেই আমরা প্রথম এই ভাষা শিখি। এই মাতৃ-রূপক গোটা গানটিকে আবেগের এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যা যুক্তির বাইরে—মাকে ভালোবাসার জন্য যুক্তি লাগে না। দ্বিতীয় স্তবকে কবি ভাষার জাদু দেখান শ্রমজীবী মানুষের জীবনে: ‘গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে’, ‘গেয়ে গান নাচে বাউল’, ‘গান গেয়ে ধান কাটে চাষা’। লক্ষণীয়, এখানে কোনো পণ্ডিত-কবির নাম নেই—আছে মাঝি, বাউল, চাষা। অর্থাৎ বাংলা ভাষার প্রাণ ভদ্রলোকের বৈঠকখানায় নয়, খেটে খাওয়া মানুষের কণ্ঠে। এই গণমুখী দৃষ্টি অতুলপ্রসাদের গানের বিশেষত্ব। তৃতীয় স্তবকে ভক্তি-ঐতিহ্য: ‘এই ভাষাতেই নিতাই গোরা আনল দেশে ভক্তিধারা’—চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দের বৈষ্ণব আন্দোলন বাংলায় যে প্রাণের জোয়ার এনেছিল, তার বাহন ছিল এই ভাষা। ‘আছে কই এমন ভাষা, এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা?’—এই প্রশ্নে আত্মগরিমা নয়, কৃতজ্ঞতা। চতুর্থ স্তবকটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সংক্ষিপ্তসার: ‘বিদ্যাপতি চণ্ডী গোবিন হেম মধু বঙ্কিম নবীন’—বিদ্যাপতি থেকে নবীনচন্দ্র সেন পর্যন্ত আট শতকের কবি-সাহিত্যিক এক পংক্তিতে! ‘ওই ফুলেরি মধুর রসে বাঁধল সুখে মধুর বাসা’—ভাষা হলো ফুল, কবিরা মৌমাছি; এই উপমায় সাহিত্য-সৃষ্টিকে প্রাকৃতিক ও আনন্দময় করা হয়েছে। পঞ্চম স্তবকে রবীন্দ্রনাথ: ‘বাজিয়ে রবি তোমার বীণে আনল মালা জগৎ জিনে’—১৯১৩-র নোবেল পুরস্কারের ইঙ্গিত; বাংলা ভাষা বিশ্বের দরবারে মালা পেয়েছে। ‘তোমার চরণ-তীর্থে আজি জগৎ করে যাওয়া-আসা’—ভাষার চরণ তীর্থস্থান; বিশ্বসাহিত্য আজ বাংলার দুয়ারে। শেষ স্তবকটি গানটির দার্শনিক শিখর: ‘ওই ভাষাতেই প্রথম বোলে ডাকনু মায়ে মা মা বলে; ওই ভাষাতেই বলব হরি, সাঙ্গ হলে কাঁদা হাসা’। জীবনের প্রথম শব্দ ‘মা’, শেষ শব্দ ‘হরি’ (ঈশ্বরের নাম)—দুটোই এই ভাষায়। জন্ম থেকে মৃত্যু, কান্না থেকে হাসি—সব এই ভাষার ভেতর। এর চেয়ে পূর্ণতর মাতৃভাষা-বন্দনা আর কী হতে পারে! অতুলপ্রসাদ (১৮৭১–১৯৩৪) বাংলা গানে ঠুংরি ধারার প্রবর্তক, প্রথম বাংলা গজল-রচয়িতা; তার ২০৮টি গান ‘দেবতা’, ‘প্রকৃতি’, ‘স্বদেশ’, ‘মানব’, ‘বিবিধ’—পাঁচ পর্যায়ে বিভক্ত। এই গানটি ‘স্বদেশ’ পর্যায়ের মুকুটমণি। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এই গান মিছিলে-শিবিরে গাওয়া হয়েছে—প্রমাণ, সত্যিকারের গান কখনো পুরনো হয় না, সংকটের দিনে সে-ই আশ্রয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

মাতৃভাষাপ্রেম, ভাষা ও জাতীয় পরিচয়, সাহিত্য-ঐতিহ্য, ভক্তি

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

গীতিকবিতা—ছয়টি স্তবক, সহজ ও গেয় ছন্দ। প্রধান রূপক: ভাষা = মা (‘মাগো তোমার কোলে’)—মাতৃভাষা শব্দের আক্ষরিক রূপায়ণ। তালিকামূলক কৌশল (catalogue): চতুর্থ স্তবকে আট শতকের কবিদের এক পংক্তিতে সন্নিবেশ—সাহিত্য-ইতিহাসের সংক্ষেপণ। উপমা: ভাষা = ফুল, কবি = মৌমাছি (‘ওই ফুলেরি মধুর রসে’)। জীবন-বৃত্তের গঠন: প্রথম শব্দ ‘মা’ থেকে শেষ শব্দ ‘হরি’—জন্ম-মৃত্যুর পূর্ণতা। ধুয়োর মতো পুনরাবৃত্তি (‘আ মরি বাংলা ভাষা’) আবেগকে সংহত করে। ভাষা সহজ, কিন্তু ভাব গভীর—অতুলপ্রসাদী গানের লক্ষণ।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১–১৯৩৪) ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন, লখনউয়ে বসবাস করতেন; বাংলা গানে ঠুংরি ধারার প্রবর্তক ও প্রথম বাংলা গজল-রচয়িতা হিসেবে খ্যাত। তার সমুদয় গান ‘গীতিগুঞ্জ’ গ্রন্থে (১৯৩১) সংকলিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গানের বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। ‘মোদের গরব মোদের আশা’ গানটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে গাওয়া হয়—মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে এটি প্রেরণা-সংগীতের মর্যাদা পায়।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।