কেউ কথা রাখেনি
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
বঙ্গ আমার! জননী আমার! ধাত্রী আমার আমার দেশ
কেন গো মা তোর শুকনো নয়ন, কেন গো মা তোর রুক্ষ কেশ?
কেন গো মা তোর ধুলায় আসন, কেন গো মা তোর মলিন বেশ?
ত্রিংশ কোটি সন্তান যার ডাকে উচ্চে–‘আমার দেশ’
উদিল যেখানে বুদ্ধ-আত্মা মুক্ত করিতে মোক্ষ দ্বার,
আজিও জুড়িয়া অর্ধ-জগৎ ভক্তি প্রণত চরণে যাঁর;
অশোক যাঁহার কীর্তি ছাইল গান্ধার হইতে জলধি শেষ,
তুই কি না মাগো তাঁদের জননী তুই কি না মাগো তাঁদের দেশ।
একদা যাহার বিজয় সেনানী হেলায় লঙ্কা করিল জয়,
একদা যাহার অর্ণব পোত ভ্রমিল ভারত সাগরময়;
সন্তান যার তিব্বত-চীন-জাপানে গঠিল উপনিবেশ,
তার কিনা এই ধুলায় আসন,
তার কিনা এই ছিন্ন বেশ!
উঠিল যেখানে মুখে মন্ত্র নিমাই কণ্ঠে মধুর তান,
ন্যায়ের বিধান দিল রঘুমণি, চণ্ডীদাস যেথা গাহিল গান।
যুদ্ধ করিল প্রতাপাদিত্য, তুই তো মা সেই ধন্য দেশ!
ধন্য আমরা যদি এ শিরায় থাকে তাঁদের রক্তলেশ।
যদিও মা তোর দিব্য আলোকে ঘিরে আছে আজ আঁধার ঘোর,
কেটে যাবে মেঘ, নবীন গরিমা ভাতিবে আবার ললাটে তোর,
আমরা ঘোচাবো মা তোর দৈন্য; মানুষ আমরা; নহি তো মেষ!
দেবী আমার! সাধনা আমার! স্বর্গ আমার! আমার দেশ!
কিসের দুঃখ, কিসের দৈন্য, কিসের লজ্জা, কিসের ক্লেশ।
ত্রিংশ কোটি মিলিত-কণ্ঠে ডাকে যখন–‘আমার দেশ’।
কবি বঙ্গকে সম্বোধন করে বলছেন—বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ! কিন্তু কেন গো মা তোর শুকনো নয়ন, কেন রুক্ষ কেশ? কেন ধুলায় আসন, কেন মলিন বেশ? ত্রিংশ কোটি সন্তান যার, সে ডাকে উচ্চে ‘আমার দেশ’। যেখানে উদিল বুদ্ধ-আত্মা মোক্ষদ্বার মুক্ত করতে, আজিও অর্ধজগৎ যাঁর চরণে ভক্তিপ্রণত; অশোক যাঁহার কীর্তি ছাইল গান্ধার থেকে জলধি পর্যন্ত—তুই কি না মাগো তাঁদের জননী, তাঁদের দেশ! একদা যাহার বিজয় সেনানী হেলায় লঙ্কা জয় করিল, যাহার অর্ণবপোত ভারতসাগরময় ভ্রমিল; সন্তান যার তিব্বত-চীন-জাপানে উপনিবেশ গঠিল—তার কিনা এই ধুলায় আসন, এই ছিন্ন বেশ! যেখানে নিমাইয়ের কণ্ঠে উঠিল মধুর তান, রঘুমণি দিল ন্যায়ের বিধান, চণ্ডীদাস গাহিল গান; যুদ্ধ করিল প্রতাপাদিত্য—তুই তো মা সেই ধন্য দেশ! ধন্য আমরা, যদি এ শিরায় থাকে তাঁদের রক্তলেশ। যদিও মা তোর দিব্য আলোকে আজ আঁধার ঘোর ঘিরে আছে, মেঘ কেটে যাবে, নবীন গরিমা আবার ভাতিবে তোর ললাটে। আমরা ঘোচাব মা তোর দৈন্য; মানুষ আমরা, মেষ নহি! দেবী আমার, সাধনা আমার, স্বর্গ আমার, আমার দেশ! কিসের দুঃখ, কিসের দৈন্য, কিসের লজ্জা, কিসের ক্লেশ—ত্রিংশ কোটি মিলিত কণ্ঠে ডাকে যখন ‘আমার দেশ’!
‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ গানটির জন্মকথাই এর মর্ম বহন করে। দেবকুমার রায়চৌধুরীর স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ১৯০৮ সালে বঙ্গভঙ্গ-রোধ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু দ্বিজেন্দ্রলালকে অনুরোধ করেন—এমন একটি গান লিখুন যাতে বাঙালির বিষয় ও ঘটনা থাকে। আধঘণ্টার মধ্যে রচিত হয় এই গান; রচনা শেষে কবি ঘরময় নেচে নেচে গাইতে থাকেন ধুয়ো—‘কিসের দুঃখ কিসের দৈন্য কিসের লজ্জা কিসের ক্লেশ?’ এই উন্মাদনা থেকেই বোঝা যায়, গানটি হিসেব করে লেখা নয়—হৃদয়ের বিস্ফোরণ। গানটির গঠন একটি সুসংহত যুক্তি-পরম্পরা: প্রথমে বর্তমানের বেদনা, তারপর অতীতের গৌরব, তারপর বৈপরীত্যের আঘাত, অবশেষে ভবিষ্যতের শপথ। প্রথম স্তবকের চারটি ‘কেন’—শুকনো নয়ন, রুক্ষ কেশ, ধুলায় আসন, মলিন বেশ—মায়ের এই দুরবস্থা দেখে সন্তানের আর্তি; ‘জননী’ ও ‘ধাত্রী’—দুটি সম্বোধনেই মাতৃত্বের পূর্ণতা (জন্মদাত্রী ও লালনপালনকারিণী)। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে ইতিহাসের রোল-কল: বুদ্ধ (মোক্ষদ্বার), অশোক (গান্ধার থেকে জলধি), বিজয় সেনানীর লঙ্কা-জয়, অর্ণবপোতের সাগর-ভ্রমণ, তিব্বত-চীন-জাপানে উপনিবেশ (অতীশ দীপঙ্করের মতো বাঙালি পণ্ডিতদের কীর্তির ইঙ্গিত)। এই তালিকা শুধু গৌরব-প্রদর্শন নয়—এটি একটি যুক্তি: যে জাতির এমন অতীত, তার এমন বর্তমান হতে পারে না। তৃতীয় স্তবকের শেষ দুই পংক্তি—‘তার কিনা এই ধুলায় আসন, তার কিনা এই ছিন্ন বেশ!’—বিস্ময় ও বেদনার চূড়া; ‘কিনা’ অব্যয়ে অবিশ্বাস্য বৈপরীত্য। চতুর্থ স্তবকে সাংস্কৃতিক গৌরব: নিমাই (চৈতন্য), রঘুমণি (নব্যন্যায়ের রঘুনাথ শিরোমণি), চণ্ডীদাস, প্রতাপাদিত্য—ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, বীরত্ব—চার ক্ষেত্রের প্রতিনিধি। ‘ধন্য আমরা যদি এ শিরায় থাকে তাঁদের রক্তলেশ’—এখানে রক্তের উত্তরাধিকারের দাবি; গৌরব শুধু স্মৃতি নয়, দায়িত্ব। পঞ্চম স্তবকে মোড়: ‘যদিও মা তোর দিব্য আলোকে ঘিরে আছে আজ আঁধার ঘোর’—স্বীকারোক্তির পর আশা—‘কেটে যাবে মেঘ, নবীন গরিমা ভাতিবে আবার ললাটে তোর’। ‘আমরা ঘোচাবো মা তোর দৈন্য; মানুষ আমরা; নহি তো মেষ!’—এই পংক্তিটি গানটির রাজনৈতিক শপথ; ‘মেষ’ (ভেড়া) বলে ঔপনিবেশিক ‘ভীরু বাঙালি’ তকমার জবাব। ‘দেবী আমার! সাধনা আমার! স্বর্গ আমার! আমার দেশ!’—চারটি সম্বোধনে ভক্তি, সংকল্প ও পরম আশ্রয়ের একীভবন। শেষ ধুয়ো—‘কিসের দুঃখ, কিসের দৈন্য, কিসের লজ্জা, কিসের ক্লেশ’—প্রশ্ন নয়, এ হলো দুঃখকে অস্বীকারের ঘোষণা; ত্রিংশ কোটি কণ্ঠ এক হলে কোনো দুঃখই দুঃখ নয়। বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম্’-এর পর বাংলা দেশাত্মবোধক গানের ধারায় এই গান একটি মাইলফলক—এখানে দেশ শুধু মা নয়, সে অসুস্থ মা, যাকে সারিয়ে তোলার দায় সন্তানের। এই ‘সেবার’ ভাবনাই গানটিকে শুধু আবেগ থেকে কর্মে উন্নীত করেছে।
দেশপ্রেম, ইতিহাস-চেতনা, দেশমাতৃকা, স্বদেশী আন্দোলন
গীতিকবিতা—ছয়টি স্তবক, ধুয়ো-সহ (‘কিসের দুঃখ…’) সমবেত গায়নের উপযোগী। যুক্তি-পরম্পরামূলক গঠন: বর্তমানের বেদনা → অতীতের গৌরব → বৈপরীত্য → ভবিষ্যতের শপথ। ইতিহাস-তালিকা (catalogue): বুদ্ধ, অশোক, বিজয় সেনানী, নিমাই, রঘুমণি, চণ্ডীদাস, প্রতাপাদিত্য—ধর্ম-দর্শন-সাহিত্য-বীরত্বের প্রতিনিধিত্ব। পুনরাবৃত্তিমূলক প্রশ্ন (‘কেন গো মা…’, ‘তুই কি না মাগো…’) আর্তি ও বিস্ময়কে তীব্র করে। ‘মেষ’ রূপকে ঔপনিবেশিক ‘ভীরু বাঙালি’ ধারণার খণ্ডন। ভাষা ওজস্বী, ছন্দ দৃঢ়—শপথ-ঘোষণার উপযোগী।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পর সারা বাংলা স্বদেশী আন্দোলনে উত্তাল হয়। এই পটভূমিতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘প্রতাপসিংহ’ (১৯০৫), ‘দুর্গাদাস’ (১৯০৬), ‘নূরজাহান’ ও ‘মেবারপতন’ (১৯০৮)—একাধিক জাতীয়তাবাদী নাটক রচনা করেন। দেবকুমার রায়চৌধুরীর স্মৃতিকথা অনুযায়ী, জগদীশচন্দ্র বসুর অনুরোধে ১৯০৮ সালের দিকে মাত্র আধঘণ্টায় তিনি ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ রচনা করেন। গানটি দ্রুত জনপ্রিয় হয় এবং স্কুলপাঠ্য হয়; প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি শিশু এই গানে দেশপ্রেমের প্রথম পাঠ নিয়েছে।
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'বাতাসে লাশের গন্ধ' মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতা-পরবর্তী মোহভঙ্গের সবচেয়ে…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”