ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ বাংলাদেশের সবচেয়ে উদ্ধৃত রাজনৈতিক কবিতাগুলোর একটি। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের ভঙ্গ-আশা ও প্রতারিত প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছে—‘কথা ছিলো’ ধ্বনির পুনরাবৃত্তিতে একে একে তুলে ধরা হয়েছে স্বাধীনতার সেই সব প্রতিশ্রুতি, যা রক্ষা হয়নি।
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
ভুলে যাবো যুদ্ধের কথা— হেলাল হাফিজ, ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতাটি ‘কথা ছিলো’—এই ধ্বনির পুনরাবৃত্তিতে গঠিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—একটি পতাকা পেলে যুদ্ধের কথা ভুলে যাওয়া যাবে, স্বাধীনতার মানে হবে শুধুই স্বাধীনতা, শোষণ-বৈষম্যের অবসান হবে—সেই সব ‘কথা’ একে একে স্মরণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, পতাকা পেলেও যুদ্ধের ক্ষত শুকোয়নি, স্বাধীনতার অর্থ বদলে গেছে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। কবিতাটি তাই একটি ‘সম্পাদকীয়’—সমকালের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর মতামত; আর তা ‘নিষিদ্ধ’—কারণ এই সত্য উচ্চারণের অনুমতি ক্ষমতাবানরা দেয় না। সংক্ষেপে, এটি ভঙ্গ-প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে একটি প্রজন্মের নৈতিক জবাবদিহি দাবি।
‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার শিরোনামেই এর সমস্ত রাজনীতি। সম্পাদকীয় মানে সংবাদপত্রের মতামত-নিবন্ধ—জনমত গঠনের সবচেয়ে সরাসরি মাধ্যম; আর ‘নিষিদ্ধ’ মানে যা ছাপা যায় না। অর্থাৎ কবি বলছেন—এই দেশে সত্য কথা বলার জায়গা নেই, তাই সত্যকে কবিতার আশ্রয় নিতে হয়েছে। হেলাল হাফিজের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে তরুণ বয়সে; তাদের চোখের সামনে লাখো মানুষ ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নে প্রাণ দিয়েছে। স্বাধীনতার পর যখন দেখা গেল—ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু শোষণের কাঠামো বদলায়নি; পতাকা উড়ছে, কিন্তু পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভাগ্য বদলায়নি—তখন জন্ম নিল এই কবিতার ক্ষোভ। কবিতার গঠন-কৌশল অত্যন্ত সচেতন: ‘কথা ছিলো’—এই দুটি শব্দের পুনরাবৃত্তি (anaphora) একটি শপথ-ভঙ্গের তালিকা তৈরি করে। প্রতিটি ‘কথা ছিলো’ একটি প্রতিশ্রুতির স্মৃতি জাগায়, আর পাঠকের মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাগে পরের প্রশ্ন—‘কিন্তু কী হলো?’ কবি সেই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দেন না; পুনরাবৃত্তির ফাঁকে ফাঁকেই উত্তর লুকিয়ে থাকে—কিছুই হয়নি, অথবা উল্টোটা হয়েছে। এই অনুক্তিই কবিতার শক্তি; পাঠক নিজেই বিচারক হয়ে ওঠে। ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে সরল, প্রায় গদ্যের কাছাকাছি—কারণ এটি সম্পাদকীয়, অলংকারের কবিতা নয়। কিন্তু এই সরলতার ভেতরেই আছে প্রচণ্ড আবেগের চাপ; যেন কবি দাঁত চেপে কথা বলছেন। ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি আরেকটি মাত্রা যোগ করে—এই কবিতা শুধু অতীতের সমালোচনা নয়, বর্তমানের সেন্সরশিপেরও প্রতিবাদ। যে সমাজে সম্পাদকীয় নিষিদ্ধ হয়, সেখানে কবিতাই শেষ মুক্তমঞ্চ। হেলাল হাফিজের কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম ‘যে জলে আগুন জ্বলে’—এই বৈপরীত্যও লক্ষণীয়: জলে আগুন জ্বলা অসম্ভব, কিন্তু এই কবির হাতে অসম্ভবই সম্ভব হয়—নিরাশার জলেও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের প্রতিটি পর্বে—স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম—এই কবিতা নতুন করে পাঠ হয়েছে, মিছিলে-স্লোগানে ধ্বনিত হয়েছে। একটি কবিতা যখন চার দশক ধরে প্রাসঙ্গিক থাকে, তখন বোঝা যায়—সমস্যার সমাধান হয়নি, তাই কবিতারও মৃত্যু হয়নি। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ প্রমাণ করে, কবিতা শুধু সৌন্দর্যের নয়—কবিতা জবাবদিহিরও মাধ্যম; আর সত্যিকারের দেশপ্রেম মানে অন্ধ স্তুতি নয়, প্রিয় দেশের ভুলের নির্মম সমালোচনা। হেলাল হাফিজের কবিত্বের আরেকটি দিক হলো প্রেম ও দ্রোহের মিলন। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যে প্রেমের কবিতাও আছে, দ্রোহের কবিতাও আছে; কিন্তু ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’তে দুটোই এক—দেশের প্রতি প্রেমই দ্রোহে পরিণত হয়েছে। যাকে ভালোবাসা যায়, তার ভুল দেখলে ক্ষোভও তীব্র হয়; এই দ্বন্দ্বই কবিতার আবেগ-শক্তি। কবিতাটি কখনো মঞ্চে, কখনো মিছিলে, কখনো সামাজিক মাধ্যমে—প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটে নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে। এর সরল ভাষা একে অনুবাদ-যোগ্য করেছে; ভিনভাষী পাঠকও এর বেদনা বুঝতে পারেন। ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি আজও প্রাসঙ্গিক—যতদিন সত্য কথা বলা কঠিন থাকবে, ততদিন এই সম্পাদকীয় নিষিদ্ধই থেকে যাবে, আর ততদিন কবিতাই তার আশ্রয়।
রাজনৈতিক প্রতিবাদ, ভঙ্গ-প্রতিশ্রুতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
‘কথা ছিলো’ ধ্বনির পুনরাবৃত্তি (anaphora)—প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের তালিকা গঠন করে, পাঠককে স্বতঃস্ফূর্ত বিচারকে পরিণত করে। শিরোনামেই রূপক: ‘সম্পাদকীয়’ = সরাসরি রাজনৈতিক মতামত, ‘নিষিদ্ধ’ = সেন্সরশিপের প্রতিবাদ। ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে সরল ও গদ্যঘেঁষা—অলংকারহীনতাই আবেগের তীব্রতা বাড়িয়েছে। অনুক্তি (irony of omission): ‘কিন্তু কী হলো’ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাঠকের ওপর ছেড়ে দেওয়া। মুক্তছন্দ, সংক্ষিপ্ত পংক্তি—স্লোগানের মতো স্মরণীয় ও উচ্চারণযোগ্য।
হেলাল হাফিজ (১৯৪৮–২০২৪) বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কবি; তার প্রথম ও প্রধান কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন স্বাধীনতার স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছিল, তখন তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ও হতাশার ভাষা হয়ে ওঠে তার কবিতা। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ সেই পর্বের সবচেয়ে উদ্ধৃত কবিতা—স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এটি পাঠ হয়েছে। কবির মৃত্যুর (২০২৪) পরও কবিতাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”