ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্বোধ অতি ঘোর।
যা-কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, “কেষ্টা বেটাই চোর।’
উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত, শুনেও শোনে না কানে।
যত পায় বেত না পায় বেতন, তবু না চেতন মানে।
বড়ো প্রয়োজন, ডাকি প্রাণপণ, চীৎকার করি “কেষ্টা’–
যত করি তাড়া, নাহি পাই সাড়া, খুঁজে ফিরি সারা দেশটা
তিনখানা দিলে একখানা রাখে, বাকি কোথা নাহি জানে–
একখানা দিলে নিমেষ ফেলিতে তিনখানা ক’রে আনে।
যেখানে সেখানে দিবসে দুপুরে নিদ্রাটি আছে সাধা–
মহাকলরবে গালি দেই যবে “পাজি হতভাগা গাধা’–
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাসে, দেখে জ্বলে যায় পিত্ত!
তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার– বড়ো পুরাতন ভৃত্য।
ঘরের কর্ত্রী রুক্ষমূর্তি বলে,”আর পারি নাকো!
রহিল তোমার এ ঘর দুয়ার, কেষ্টারে লয়ে থাকো।
না মানে শাসন; বসন বাসন অশন আসন যত
কোথায় কী গেল! শুধু টাকাগুলো যেতেছে জলের মতো।
গেলে সে বাজার সারা দিনে আর দেখা পাওয়া তার ভার–
করিলে চেষ্টা কেষ্টা ছাড়া কি ভৃত্য মেলে না আর!
শুনে মহা রেগে ছুটে যাই বেগে, আনি তার টিকি ধরে;
বলি তারে, “পাজি, বেরো তুই আজই, দূর করে দিনু তোরে!’
ধীরে চলে যায়, ভাবি গেল দায়; পরদিনে উঠে দেখি
হুঁকাটি বাড়ায়ে রয়েছে দাঁড়ায়ে বেটা বুদ্ধির ঢেঁকি।
প্রসন্নমুখ, নাহি কোনো দুখ, অতি-অকাতর চিত্ত!
ছাড়ালে না ছাড়ে, কী করিব তারে মোর পুরাতন ভৃত্য।
সে বছরে ফাঁকা পেনু কিছু টাকা করিয়া দালালগিরি।
করিলাম মন শ্রীবৃন্দাবন বারেক আসিব ফিরি।
পরিবার তায় সাথে যেতে চায়, বুঝায়ে বলিনু তারে
পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য, নহিলে খরচ বাড়ে।
লয়ে রশারশি করি কষাকষি পোঁটলাপুঁটলি বাঁধি
বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে গৃহিণী কহিল কাঁদি,
“পরদেশে গিয়ে কেষ্টারে নিয়ে কষ্ট অনেক পাবে।’
আমি কহিলাম “আরে রাম রাম! নিবারণ সাথে যাবে।’
রেলগাড়ি ধায়; হেরিলাম হায় নামিয়া বর্ধমানে
কৃষ্ঞকান্ত অতি প্রশান্ত তামাক সাজিয়া আনে।
স্পর্ধা তাহার হেনমতে আর কত বা সহিব নিত্য!
যত তারে দুষি তবু হনু খুশি হেরি পুরাতন ভৃত্য।
নামিনু শ্রীধামে, দক্ষিণে বামে পিছনে সমুখে যত
লাগিল পান্ডা, নিমেষে প্রাণটা করিল কণ্ঠাগত।
জন ছয় সাতে মিলি একসাথে পরমবন্ধুভাবে
করিলাম বাসা, মনে হল আশা আরামে দিবস যাবে।
কোথা ব্রজবালা! কোথা বনমালা! কোথা বনমালী হরি!
কোথা হা হন্ত, চিরবসন্ত! আমি বসন্তে মরি।
বন্ধু যে যত স্বপ্নের মতো বাসা ছেড়ে দিল ভঙ্গ–
আমি একা ঘরে ব্যাধি-খরশরে ভরিল সকল অঙ্গ।
ডাকি নিশিদিন সকরুণ ক্ষীণ, “কেষ্ট, আয় রে কাছে।
এত দিনে শেষে আসিয়া বিদেষে প্রাণ বুঝি নাহি বাঁচে।’
হেরি তার মুখ ভরে ওঠে বুক, সে যেন পরম বিত্ত।
নিশিদিন ধরে দাঁড়ায়ে শিয়রে মোর পুরাতন ভৃত্য।
মুখে দেয় জল, শুধায় কুশল, শিরে দেয় মোর হাত;
দাঁড়ায়ে নিঝুম, চোখে নাই ঘুম, মুখে নাই তার ভাত।
বলে বার বার, “কর্তা, তোমার কোনো ভয় নাই, শুন,
যাবে দেশে ফিরে মাঠাকুরানীরে দেখিতে পাইবে পুন।’
লভিয়া আরাম আমি উঠিলাম; তাহারে ধরিল জ্বরে–
নিল সে আমার কালব্যাধিভার আপনার দেহ-‘পরে।
হয়ে জ্ঞানহীন কাটিল দু দিন, বন্ধ হইল নাড়ী–
এতবার তারে গেনু ছাড়াবারে, এতদিনে গেল ছাড়ি।
বহুদিন পরে আপনার ঘরে ফিরিনু সারিয়া তীর্থ–
আজ সাথে নেই চিরসাথী সেই মোর পুরাতন ভৃত্য।
১২ ফাল্গুন, ১৩০১।
কবিতার শুরুতেই ভৃত্য কেষ্টার চিত্র—ভূতের মতন চেহারা, নির্বোধ অতি ঘোর; যা-কিছু হারায় গিন্নি বলেন ‘কেষ্টা বেটাই চোর’। ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না, তিনখানা দিলে একখানা রাখে। গিন্নির অভিযোগে প্রভু তাকে তাড়িয়ে দেন, কিন্তু পরদিন দেখেন সে হুঁকা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে—‘ছাড়ালে না ছাড়ে’। একবার দালালগিরি করে কিছু টাকা পেয়ে প্রভু বৃন্দাবন যান; স্ত্রী বলেন কেষ্টাকে নিয়ে যেও না, কষ্ট পাবে। কিন্তু বর্ধমানে নেমে দেখেন, কেষ্টা লুকিয়ে এসেছে—তামাক সাজিয়ে আনে! বৃন্দাবনে পাণ্ডাদের উৎপাতে প্রভুর প্রাণ কণ্ঠাগত; বন্ধুরা একে একে চলে যায়। একা ঘরে প্রভু কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হন; তখন সেই কেষ্টাই দিনরাত শিয়রে দাঁড়িয়ে সেবা করে—মুখে জল দেয়, শিরে হাত বুলায়, অভয় দেয়: ‘যাবে দেশে ফিরে, মা-ঠাকুরাণীরে দেখিতে পাইবে পুন।’ প্রভু সেরে ওঠেন, কিন্তু ব্যাধি ধরে কেষ্টাকে; সে মারা যায়। শেষে প্রভু একা ঘরে ফেরেন—‘আজ সাথে নেই চিরসাথী সেই মোর পুরাতন ভৃত্য।’ হাসির কবিতা শেষ হয় চোখের জলে।
‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতার শিল্পকৌশল এর স্বর-বৈপরীত্যে—শুরুটা প্রহসন, শেষটা শোকগাথা। প্রথম তিনটি স্তবকে কেষ্টা এক হাস্যরসাত্মক চরিত্র: নির্বোধ, অলস, চোর-বদনামি—পাঠক হাসেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে এই হাসির ভেতর দিয়ে স্নেহের স্রোত বইয়ে দেন। ‘তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার—বড়ো পুরাতন ভৃত্য’—এই পংক্তিটি কবিতার মোড় ঘোরায়; বিরক্তির নিচে লুকিয়ে থাকা মমতা প্রকাশ পায়। বৃন্দাবন-পর্বে কবিতা ভ্রমণ-কাহিনির রূপ নেয়—পাণ্ডাদের উৎপাত, বন্ধুদের পলায়ন—এই সবের মধ্যে কেষ্টার নীরব উপস্থিতি (‘তামাক সাজিয়া আনে’) ক্রমে মূল্যবান হয়ে ওঠে। তারপর ব্যাধির রাত্রি: ‘ডাকি নিশিদিন সকরুণ ক্ষীণ, কেষ্ট, আয় রে কাছে’—প্রভুর এই আর্তি সম্পর্কের পালাবদল ঘটায়; এতদিন যে ছিল তুচ্ছ ভৃত্য, সে-ই এখন একমাত্র আশ্রয়। সেবার বর্ণনা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী—‘মুখে দেয় জল, শুধায় কুশল, শিরে দেয় মোর হাত; দাঁড়ায়ে নিঝুম, চোখে নাই ঘুম, মুখে নাই তার ভাত’—এই সরল পংক্তিগুলোতে নিঃস্বার্থ সেবার যে চিত্র, তা বাংলা কবিতায় বিরল। কেষ্টার মৃত্যু বর্ণিত হয়েছে সংযত ভাষায়—‘নিল সে আমার কাল-ব্যাধিভার আপনার দেহ পরে’—যেন সে প্রভুর রোগ নিজের দেহে নিয়ে মুক্তি দিল। শেষ দুটি পংক্তি বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেদনাময় সমাপ্তিগুলোর একটি: ‘বহুদিন পরে আপনার ঘরে ফিরিনু সারিয়া তীর্থ—আজ সাথে নেই চিরসাথী সেই মোর পুরাতন ভৃত্য।’ ‘তীর্থ সারিয়া’ ফেরা প্রভুর কাছে তীর্থের ফল শূন্য—কারণ চিরসাথীই নেই। দার্শনিক স্তরে কবিতাটি শ্রেণি-ব্যবধানের ঊর্ধ্বে মানবিক সম্পর্কের জয়গান—প্রভু-ভৃত্যের কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে দুটি মানুষের আত্মীয়তা। ছন্দ পয়ার-মিশ্র, ভাষা সহজ ও মুখর; সংলাপ (‘আরে রাম রাম! নিবারণ সাথে যাবে’) কবিতায় প্রাণ সঞ্চার করেছে। কবিতাটির হাস্যরসের উৎস লক্ষণীয়—কেষ্টার নির্বুদ্ধিতা বর্ণিত হয়েছে এমন স্নেহময় ভঙ্গিতে যে পাঠক হাসেন, কিন্তু তাচ্ছিল্য করেন না। ‘তিনখানা দিলে একখানা রাখে, বাকি কোথা নাহি জানে’—এই পংক্তিতে কৌতুক আছে, কিন্তু নিষ্ঠুরতা নেই। রবীন্দ্রনাথের মানবিকতাই এখানে—তিনি দুর্বল চরিত্রকেও ভালোবাসার চোখে দেখেন। কবিতার মধ্যভাগে ভ্রমণ-বর্ণনা—বর্ধমান স্টেশন, বৃন্দাবনের পাণ্ডা—বাঙালি পাঠকের চেনা জগৎ; এই পরিচিতিই কবিতাকে জনপ্রিয় করেছে। ‘কোথা ব্রজবালা! কোথা বনমালা! কোথা বনমালী হরি!’—তীর্থস্থানে এসে ধর্মের বদলে প্রভুর মনে জাগে শূন্যতা; এই বৈপরীত্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ—বাইরের তীর্থ ব্যর্থ, ভেতরের তীর্থ (মানবিক সম্পর্ক) সার্থক। কেষ্টার মৃত্যুর পর প্রভুর উপলব্ধি—যাকে তিনি বারবার তাড়িয়েছেন, সেই ছিল তার প্রকৃত সাথী। এই ‘দেরিতে বোঝা’ মানব-জীবনের চিরায়ত ট্র্যাজেডি। কবিতাটি শেখায়, যারা আমাদের জীবনে নীরবে সেবা করে যায়, তাদের মূল্য আমরা বুঝি তখন, যখন তারা থাকে না। এই শিক্ষাই কবিতাটিকে শুধু হাসির কবিতা থেকে জীবন-দর্শনের কবিতায় উন্নীত করেছে।
মানবিক সম্পর্ক, স্নেহ ও কৃতজ্ঞতা, প্রভু-ভৃত্য, সেবা, বিচ্ছেদ-বেদনা
কবিতাটি পয়ার-ছন্দে রচিত দীর্ঘ আখ্যানকবিতা; হাস্যরস থেকে করুণরসে উত্তরণ এর প্রধান শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। চরিত্র-চিত্রণে রবীন্দ্রনাথের দক্ষতা—কেষ্টা প্রথমে কার্টুন-চরিত্র, শেষে মহৎ আত্মা। সংলাপের প্রাণবন্ত ব্যবহার (‘কেষ্টা বেটাই চোর’, ‘আরে রাম রাম!’) কবিতাকে নাটকীয় করেছে। পুনরাবৃত্তিমূলক ধ্রুবপদ (‘মোর পুরাতন ভৃত্য’) প্রতি স্তবকের শেষে ভাবগভীরতা বাড়ায়। ভাষা সহজ, চলিত-ঘেঁষা; বর্ণনা চিত্রধর্মী—পাঠক যেন চোখের সামনে দেখতে পান। শেষ স্তবকের সংযত শোক কবিতাটিকে অমরত্ব দিয়েছে।
১৯০০ সালে ‘কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত; রচনাকাল ১২ ফাল্গুন ১৩০১ (১৮৯৫)। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ-পর্বে জমিদারি দেখাশোনা করছেন; গ্রামের সাধারণ মানুষ—চাকর, মাঝি, কৃষক—তাদের জীবন তিনি কাছ থেকে দেখছেন। ‘পুরাতন ভৃত্য’-র কেষ্টা সেই অভিজ্ঞতারই ফসল। উনিশ শতকের শেষে ভৃত্য-শ্রেণির প্রতি উচ্চবিত্তের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তুচ্ছতাচ্ছিল্যের; রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন—দেখিয়েছেন, তথাকথিত ‘নির্বোধ’ ভৃত্যের মধ্যেও কত বড়ো মানবিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে। কবিতাটি প্রকাশের পরপরই পাঠকপ্রিয় হয় এবং আজও আবৃত্তি-মঞ্চের অন্যতম প্রিয় কবিতা।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”