ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
ছান্দোগ্যোপনিষৎ । ৪ প্রপাঠক । ৪ অধ্যায়
অন্ধকারে বনচ্ছায়ে সরস্বতীতীরে
অস্ত গেছে সন্ধ্যাসূর্য; আসিয়াছে ফিরে
নিস্তব্ধ আশ্রম-মাঝে ঋষিপুত্রগণ
মস্তকে সমিধ্ভার করি আহরণ
বনান্তর হতে; ফিরায়ে এনেছে ডাকি
তপোবনগোষ্ঠগৃহে স্নিগ্ধশান্ত-আঁখি
শ্রান্ত হোমধেনুগণে; করি সমাপন
সন্ধ্যাস্নান সবি মিলি লয়েছে আসন
গুরু গৌতমেরে ঘিরি কুটিরপ্রাঙ্গণে
হোমাগ্নি-আলোকে। শূন্য অনন্ত গগনে
ধ্যানমগ্ন মহাশান্তি; নক্ষত্রমণ্ডলী
সারি সারি বসিয়াছে শুষ্ক কুতূহলী
নিঃশব্দ শিষ্যের মতো। নিভৃত আশ্রম
উঠিল চকিত হয়ে; মহর্ষি গৌতম
কহিলেন, “বৎসগণ, ব্রহ্মবিদ্যা কহি,
করো অবধান।’
হেনকালে অর্ঘ্য বহি
করপুট ভরি’ পশিলা প্রাঙ্গণতলে
তরুণ বালক; বন্দী ফলফুলদলে
ঋষির চরণপদ্ম, নমি ভক্তিভরে
কহিলা কোকিলকণ্ঠে সুধাস্নিগ্ধস্বরে,, “ভগবন্, ব্রহ্মবিদ্যাশিক্ষা-অভিলাষী, আসিয়াছে দীক্ষাতরে কুশক্ষেত্রবাসী,, সত্যকাম নাম মোর।’, শুনি স্মিতহাসে
ব্রহ্মর্ষি কহিলা তারে স্নেহশান্ত ভাষে,
“কুশল হউক সৌম্য। গোত্র কী তোমার?
বৎস, শুধু ব্রাহ্মণের কাছে অধিকার
ব্রহ্মবিদ্যালাভে।’
বালক কহিলা ধীরে,
“ভগবন্, গোত্র নাহি জানি। জননীরে
শুধায়ে আসিব কল্য, করো অনুমতি।’
এত কহি ঋষিপদে করিয়া প্রণতি
গেল চলি সত্যকাম ঘন-অন্ধকার
বনবীথি দিয়া, পদব্রজে হয়ে পার
ক্ষীন স্বচ্ছ শান্ত সরস্বতী; বালুতীরে
সুপ্তিমৌন গ্রামপ্রান্তে জননীকুটিরে
করিলা প্রবেশ।
ঘরে সন্ধ্যাদীপ জ্বালা;
দাঁড়ায়ে দুয়ার ধরি জননী জবালা
পুত্রপথ চাহি; হেরি তারে বক্ষে টানি
আঘ্রাণ করিয়া শির কহিলেন বাণী
কল্যাণকুশল। শুধাইলা সত্যকাম,
“কহো গো জননী, মোর পিতার কী নাম,
কী বংশে জনম। গিয়াছিনু দীক্ষাতরে
গৌতমের কাছে, গুরু কহিলেন মোরে–
বৎস, শুধু ব্রাহ্মণের কাছে অধিকার
ব্রহ্মবিদ্যালাভে। মাতঃ, কী গোত্র আমার?’
শুনি কথা, মৃদুকণ্ঠে অবনতমুখে
কহিলা জননী, “যৌবনে দারিদ্র৻দুখে
বহুপরিচর্যা করি পেয়েছিনু তোরে,
জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে,
গোত্র তব নাহি জানি তাত।’
পরদিন
তপোবনতরুশিরে প্রসন্ন নবীন
জাগিল প্রভাত। যত তাপসবালক
শিশিরসুস্নিগ্ধ যেন তরুণ আলোক,
ভক্ত-অশ্রু-ধৌত যেন নব পুণ্যচ্ছটা,
প্রাতঃস্নাত স্নিগ্ধচ্ছবি আর্দ্রসিক্তজটা,
শুচিশোভা সৌম্যমূর্তি সমুজ্জ্বলকায়ে
বসেছে বেষ্টন করি বৃদ্ধ বটচ্ছায়ে
গুরু গৌতমেরে। বিহঙ্গকাকলিগান,
মধুপগুঞ্জনগীতি, জলকলতান,
তারি সাথে উঠিতেছে গম্ভীর মধুর
বিচিত্র তরুণ কণ্ঠে সম্মিলিত সুর
শান্ত সামগীতি।
হেনকালে সত্যকাম
কাছে আসি ঋষিপদে করিলা প্রণাম–
মেলিয়া উদার আঁখি রহিলা নীরবে।
আচার্য আশিষ করি শুধাইলা তবে,
“কী গোত্র তোমার সৌম্য, প্রিয়দরশন?’
তুলি শির কহিলা বালক, “ভগবন্,
নাহি জানি কী গোত্র আমার। পুছিলাম
জননীরে, কহিলেন তিনি, সত্যকাম,
বহুপরিচর্যা করি পেয়েছিনু তোরে,
জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে–
গোত্র তব নাহি জানি।’
শুনি সে বারতা
ছাত্রগণ মৃদুস্বরে আরম্ভিলা কথা
মধুচক্রে লোষ্ট্রপাতে বিক্ষিপ্ত চঞ্চল
পতঙ্গের মতো–সবে বিস্ময়বিকল,
কেহ বা হাসিল কেহ করিল ধিক্কার
লজ্জাহীন অনার্যের হেরি অহংকার।
উঠিলা গৌতম ঋষি ছাড়িয়া আসন,
বাহু মেলি বালকেরে করিয়া আলিঙ্গন
কহিলেন, “অব্রাহ্মণ নহ তুমি তাত।
তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত।’
সন্ধ্যাবেলায় সরস্বতী নদীর তীরে গৌতম ঋষির আশ্রমে শিষ্যরা সমবেত; মহর্ষি ব্রহ্মবিদ্যা শোনাবেন বলে ঘোষণা করেন। এমন সময় অর্ঘ্য হাতে এক তরুণ বালক আসে—সত্যকাম, কুশক্ষেত্রবাসী; সে ব্রহ্মবিদ্যা শিখতে চায়। গৌতম স্নেহে জিজ্ঞেস করেন, ‘গোত্র কী তোমার? বৎস, শুধু ব্রাহ্মণের কাছে অধিকার ব্রহ্মবিদ্যালাভে।’ বালক সত্যকথা বলে—গোত্র সে জানে না; জননীকে জিজ্ঞেস করে আসবে। রাত্রে সে মা জবালার কাছে যায়; মা মৃদুকণ্ঠে বলেন, যৌবনে দারিদ্র্য-দুখে বহুপরিচর্যা করে তিনি তাকে পেয়েছেন; ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে তার জন্ম—গোত্র তিনি জানেন না। পরদিন প্রভাতে সত্যকাম আবার গুরুর কাছে এসে নির্ভয়ে সত্য কথা বলে। শুনে ছাত্ররা হাসে, ধিক্কার দেয়—‘লজ্জাহীন অনার্যের হেরি অহংকার’। তখন গৌতম ঋষি আসন ছেড়ে উঠে বালককে আলিঙ্গন করে বলেন: ‘অব্রাহ্মণ নহ তুমি তাত। তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত।’ অর্থাৎ সত্য বলার সাহসই তাকে ব্রাহ্মণ করেছে—জন্ম নয়, সত্যই ব্রাহ্মণত্বের পরিচয়।
‘ব্রাহ্মণ’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের ‘কথা’ পর্বের শ্রেষ্ঠ আখ্যানকবিতাগুলোর একটি—এখানে পুরাণ-ইতিহাসের কাহিনিকে তিনি সমকালীন সামাজিক বক্তব্যের বাহন করেছেন। কবিতার শুরুতেই আশ্রমের যে চিত্র—সন্ধ্যাসূর্য, হোমধেনু, নক্ষত্রমণ্ডলী ‘নিঃশব্দ শিষ্যের মতো’—তা পাঠককে বৈদিক যুগে নিয়ে যায়; কিন্তু কবির লক্ষ্য অতীত-বন্দনা নয়, বর্তমানের প্রশ্ন। গৌতমের প্রশ্ন ‘গোত্র কী তোমার?’ আজকের পাঠকের কাছেও চেনা—জাতি-বর্ণের প্রশ্নে ভারতীয় সমাজ আজও বিদীর্ণ। সত্যকামের উত্তরে কোনো ছলনা নেই—‘গোত্র নাহি জানি’—এই সরল সত্যভাষণই কবিতার নৈতিক কেন্দ্র। জবালার চরিত্রটি অত্যন্ত মানবিক: তিনি লজ্জায় মাথা নত করেন না, পুত্রকে মিথ্যা গোত্র শেখান না; দারিদ্র্য ও ভর্তৃহীনতার কথা তিনি মৃদুকণ্ঠে কিন্তু নির্ভয়ে বলেন। এই সততাই পুত্রের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের দৃশ্যে ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া—হাসি ও ধিক্কার—সমাজের রক্ষণশীলতার প্রতীক; আর গৌতমের আলিঙ্গন প্রগতিশীল চেতনার জয়। ‘তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত’—এই ঘোষণায় রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের মূল বাণীকেই নতুন করে উচ্চারণ করেছেন: ব্রাহ্মণত্ব জন্মগত অধিকার নয়, গুণগত অর্জন। কবিতাটি পয়ার-প্রধান অক্ষরবৃত্তে রচিত; দীর্ঘ পংক্তির ধীর গতি বৈদিক আবহের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সংলাপের ব্যবহার (‘কুশল হউক সৌম্য’, ‘মাতঃ, কী গোত্র আমার?’) কাহিনিকে নাটকীয় করেছে। লক্ষণীয়, কবি শিরোনামে উপনিষদের উদ্ধৃতি দিয়েছেন (‘ছান্দোগ্যোপনিষৎ। ৪ প্রপাঠক। ৪ অধ্যায়’)—এতে কবিতাটি শাস্ত্রীয় মর্যাদা পায়, আবার রক্ষণশীল পাঠকের আপত্তিরও জবাব মেলে: এই বাণী কবির নিজের নয়, উপনিষদেরই। ১৯০০ সালের বাংলায়, যখন জাতিভেদ প্রথা প্রবল, তখন এই কবিতা ছিল এক সাহসী সামাজিক বক্তব্য। আজও, জাতি-বিদ্বেষের যুগে, ‘সত্যকুলজাত’ হওয়ার এই আহ্বান সমান প্রাসঙ্গিক। কবিতাটির সামাজিক তাৎপর্য বোঝার জন্য ১৯০০ সালের বাংলার প্রেক্ষাপট মনে রাখা দরকার। তখন জাতিভেদ প্রথা হিন্দু সমাজে প্রবল; নিম্নবর্ণের মানুষের বেদপাঠ, শাস্ত্রচর্চা নিষিদ্ধ-প্রায়। এই অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের কাহিনি তুলে এনে দেখালেন—শাস্ত্র নিজেই জাতিভেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। এটি ছিল রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে তাদেরই অস্ত্র ব্যবহারের কৌশল। কবিতার নাটকীয় গঠনও প্রশংসনীয়: তিনটি দৃশ্য—আশ্রমে প্রশ্ন, গৃহে মায়ের স্বীকারোক্তি, আশ্রমে সমাধান। প্রতিটি দৃশ্যে উত্তেজনা বাড়ে; শেষে গৌতমের আলিঙ্গনে মুক্তি। জবালার চরিত্রে রবীন্দ্রনাথের নারী-দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়—তিনি ‘পতিতা’ নন, তিনি সৎ ও সাহসী মা; সমাজ তাকে হেয় করলেও কবি তাকে মর্যাদা দিয়েছেন। ‘ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে’—এই সরল স্বীকারোক্তিতে কোনো লজ্জা নেই, আছে সত্যের জোর। আর সত্যকাম—নামেই তার পরিচয়: সত্যের কামনা যার, সেই ব্রাহ্মণ। কবিতাটি আজও পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়, কারণ এর বাণী কালোত্তীর্ণ: মানুষের মর্যাদা জন্মে নয়, কর্মে ও সত্যে।
জাতিভেদ-বিরোধিতা, সত্য, উপনিষদীয় দর্শন, গুরু-শিষ্য, মানবিক মর্যাদা
কবিতাটি পয়ার-ছন্দে (অক্ষরবৃত্ত) রচিত আখ্যানকবিতা; দীর্ঘ পংক্তির মন্থর গতি বৈদিক আবহ তৈরি করেছে। শুরুতেই উপনিষদের উদ্ধৃতি—শাস্ত্রীয় প্রামাণ্য। চিত্রকল্প ঐতিহ্যবাহী ও মহিমান্বিত: সন্ধ্যাসূর্য, হোমধেনু, নক্ষত্রমণ্ডলী। সংলাপধর্মী কাঠামো কাহিনিকে নাটকীয় গতি দিয়েছে—গৌতম-সত্যকাম, সত্যকাম-জবালা, গৌতম-ছাত্র—তিনটি সংলাপ-পর্ব। শেষে গুরুর আলিঙ্গন ও ঘোষণা কবিতার চরম মুহূর্ত। ভাষা গম্ভীর ও সংস্কৃত-ঘেঁষা, বিষয়ের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
১৯০০ সালে ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়—এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় ইতিহাস-পুরাণের কাহিনি নিয়ে একের পর এক আখ্যানকবিতা লেখেন (‘দেবতার গ্রাস’, ‘পূজারিণী’, ‘সামান্য ক্ষতি’ প্রভৃতি)। এই সময়ে বাংলায় জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটছিল, আবার জাতিভেদ প্রথাও প্রবল ছিল। রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের এই কাহিনি বেছে নিয়ে দেখালেন, ভারতীয় ঐতিহ্যের মধ্যেই জাতিভেদ-বিরোধী বাণী নিহিত আছে—সংস্কারের জন্য বাইরে তাকানোর দরকার নেই। কবিতাটি প্রকাশের পর শিক্ষিত বাঙালি সমাজে ব্যাপক আলোচিত হয় এবং পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায়।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”