ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।
থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,
শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,
ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল
গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।
হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় –
বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।
কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,
চারি দিকে তার বাঁধন কেন!
ভাঙ্ রে হৃদয়, ভাঙ্ রে বাঁধন,
সাধ্ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পরে আঘাত কর্।
মাতিয়া যখন উঠেছে পরান
কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠেছে বাসনা
জগতে তখন কিসের ডর!
আমি ঢালিব করুণাধারা,
আমি ভাঙিব পাষাণকারা,
আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগল-পারা।
কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,
রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া দিব রে পরান ঢালি।
শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,
ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব,
হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি।
এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর,
এত সুখ আছে, এত সাধ আছে – প্রাণ হয়ে আছে ভোর।।
কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ –
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
ওরে, চারি দিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর –
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্।
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।
এক প্রভাতে সূর্যের আলো কবির প্রাণের গভীরে প্রবেশ করে; ঘুমন্ত প্রাণ জেগে ওঠে, বুকের ভেতর যেন ঝর্ণার জল উথলে ওঠে। কবি বিস্ময়ে ভাবেন—এতদিন পরে কেন জাগল এই প্রাণ? তিনি অনুভব করেন, দীর্ঘদিন তিনি গুহার অন্ধকারে বন্দী ছিলেন, আজ প্রভাতপাখির গান তার কানে পৌঁছেছে। এখন তার বাসনা—বিশ্বের সব রূপ, সব আলো, সব সৌন্দর্য পান করে নেওয়া; চারদিকের এই ঘোর কারাগার ভেঙে ফেলা। কবিতাটি শেষ হয় উদ্দাম আহ্বানে—ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্। অর্থাৎ এটি আত্মার মুক্তি ও যৌবনের উচ্ছ্বাসের কবিতা; অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিত্ব থেকে মুক্তিতে উত্তরণের গান। কবিতার শেষাংশে কবি আর শুধু নিজের মুক্তি চান না—তিনি চান চারদিকের সব কারাগার ভেঙে ফেলতে, যেন প্রতিটি বন্দী প্রাণ মুক্তির স্বাদ পায়।
রবীন্দ্রনাথ নিজে ‘জীবনস্মৃতি’তে এই কবিতার জন্মকথা বলেছেন—একদিন সকালে জোড়াসাঁকোর বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে হঠাৎ তার মনে হয়েছিল, জগতের ওপর থেকে যেন একটা পর্দা সরে গেল; সবকিছু আলোয় ভরে উঠল। এই আকস্মিক আত্ম-উদ্বোধনেরই কাব্যরূপ ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। কবিতার শুরুতেই প্রশ্ন—‘কেমনে পশিল প্রাণের পর’—এই বিস্ময়ই কবিতার প্রাণ। ঝর্ণার রূপকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: পাহাড়ের গুহায় বন্দী জল যেমন একদিন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে, তেমনি কবির অন্তরের সৃজনশক্তিও দীর্ঘ অবরোধের পর মুক্তি পেয়েছে। ‘স্বপ্নভঙ্গ’ শব্দটি এখানে নেতিবাচক নয়—ভেঙেছে সেই স্বপ্ন, যা ছিল জড়তা ও মোহের; জেগেছে সত্যিকারের প্রাণ। কবিতার ভাষায় উচ্ছ্বাসের বান ডেকেছে—‘ওরে উথলি উঠেছে বারি’, ‘ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি’—এই ‘ওরে’ সম্বোধনে যৌবনের উদ্দামতা ফুটে উঠেছে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের দ্রুতলয় এই উদ্দামতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে। দার্শনিক দিক থেকে কবিতাটি উপনিষদীয় ভাবনার প্রতিধ্বনি বহন করে—অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়ার প্রার্থনা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একে দিয়েছেন একান্ত ব্যক্তিগত ও যৌবনোচিত রূপ। এই কবিতার পরেই বাংলা কবিতায় ‘রবীন্দ্রযুগের’ সূচনা বলে ধরা হয়; কবি নিজে বলেছিলেন, এই সময় থেকেই তিনি নিজের কণ্ঠ খুঁজে পান। আজও যখন কোনো তরুণ প্রথমবার নিজের ভেতরের শক্তি আবিষ্কার করে, তখন এই কবিতার পংক্তি তার মুখে আসে—এটাই এর চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা। কবিতাটির আরেকটি গভীর দিক হলো এর ‘প্রাণ’-দর্শন। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ‘প্রাণ’ একটি কেন্দ্রীয় প্রত্যয়—যা শুধু জৈবিক জীবন নয়, বরং সৃজনশীল চেতনার উৎস। এই কবিতায় প্রাণ যেন একটি সত্তা, যার নিজস্ব বাসনা ও আবেগ আছে (‘প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি’)। এই প্রাণবাদ পরবর্তীকালে রবীন্দ্রদর্শনের মূলভিত্তি হয়ে ওঠে—‘প্রাণ’ কবিতা, ‘বলাকা’ কাব্যের গতিতত্ত্ব—সবকিছুর বীজ এখানেই নিহিত। কবিতার গঠনও লক্ষণীয়: শুরুতে বিস্ময় ও প্রশ্ন, মাঝে স্মৃতিচারণা (গুহার অন্ধকারে বন্দীদশা), আর শেষে উদ্দাম সংকল্প—এই ত্রিস্তরীয় অগ্রগতি পাঠককে কবির মানসযাত্রার সঙ্গী করে। ‘কারাগার’ প্রতীকটি দ্ব্যর্থক—একদিকে তা অন্তরের জড়তা, অন্যদিকে সমাজ ও সংস্কারের বাধা; কবি দুটোকেই ভাঙতে চান। এই বহুমাত্রিকতাই কবিতাটিকে শুধু আত্মজীবনীমূলক রচনা থেকে উন্নীত করে সার্বজনীন মুক্তির গানে পরিণত করেছে। প্রভাতের সূর্য এখানে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়—তা জ্ঞান ও চেতনার আলোর প্রতীক; আর গুহার অন্ধকার হলো অজ্ঞানতা ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক। এই রূপকের জোরেই কবিতাটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছাড়িয়ে দার্শনিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।
আত্মজাগরণ, যৌবনের উচ্ছ্বাস, মুক্তি, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা, আলো বনাম অন্ধকার
কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত, দ্রুত ও উদ্দাম লয়ে—যা প্রাণের জাগরণের ভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ঝর্ণা, গুহা, কারাগার, প্রভাতপাখি—প্রকৃতি থেকে নেওয়া রূপকগুলো অন্তর্জগতের অবস্থাকে বাইরের চিত্রে প্রকাশ করেছে। ‘ওরে’ সম্বোধনের বারবার ব্যবহারে এক ধরনের উদ্দীপনামূলক নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে শুরু (‘কেমনে পশিল’) পাঠককে কবির বিস্ময়ের অংশীদার করে। শেষাংশে ‘ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্’—এই ধ্বন্যাত্মক পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে প্রায় রণসংগীতের মর্যাদা দিয়েছে। ভাষা সহজ কিন্তু আবেগঘন; অলংকারের চেয়ে অনুভূতির সততাই এর শক্তি। কবিতার ধ্বনিগত দিকটিও উল্লেখযোগ্য—‘উথলি’, ‘ভাঙ্ ভাঙ্’, ‘ঝর্ঝর’ ধরনের ধ্বন্যাত্মক শব্দ কবিতায় জলের স্রোতের অনুভূতি জাগায়। পংক্তির দৈর্ঘ্যের ওঠানামা—কোথাও দীর্ঘ বর্ণনা, কোথাও ছোটো উদ্দীপক বাক্য—পাঠকের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। এই ছন্দোবৈচিত্র্য কবিতাটিকে আবৃত্তির জন্য অত্যন্ত উপযোগী করে তুলেছে; মঞ্চে এই কবিতা পাঠ করলে শ্রোতারা যেন নিজেরাই সেই জাগরণের অংশ হয়ে যান।
১৮৮৩ সালে ‘প্রভাতসংগীত’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র বাইশ। এর আগে ‘সন্ধ্যাসংগীত’ পর্বে তার কবিতায় ছিল বিষণ্ণতা ও নৈরাশ্যের সুর। কিন্তু এই কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি সেই অন্ধকার পর্ব অতিক্রম করেন—সাহিত্য-ইতিহাসে একে বলা হয় রবীন্দ্রনাথের ‘আত্ম-উদ্বোধন’। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের পটভূমিতে, যখন বাঙালি যুবসমাজ নতুন শিক্ষা ও চিন্তায় জেগে উঠছিল, তখন এই কবিতা সেই জাগরণেরই কাব্যিক প্রতীক হয়ে ওঠে। কবি নিজে পরবর্তীকালে বলেছিলেন, এই কবিতা লেখার পর তিনি বুঝেছিলেন তার কবিজীবনের সত্যিকারের শুরু এখানেই। ‘সন্ধ্যাসংগীত’-এর বিষণ্ণ কবি থেকে ‘প্রভাতসংগীত’-এর উদ্দীপ্ত কবি—এই রূপান্তর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই পর্বেই রবীন্দ্রনাথ বিহারীলাল চক্রবর্তীর প্রভাব কাটিয়ে নিজস্ব কাব্যভাষা গড়ে তোলেন। সমকালীন পাঠক এই কবিতায় নিজেদের যৌবনেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পান; তাই প্রকাশের অল্পদিনের মধ্যেই এটি তরুণ পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”