মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা সম্পর্কে

কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ বাংলা গানের ইতিহাসে সবচেয়ে জ্বলন্ত রণসংগীতগুলোর একটি। পরাধীন ভারতের কারাগারের লৌহকপাট ভেঙে ফেলার এই আহ্বান স্বাধীনতা-সংগ্রামের যুগে যুবকদের প্রাণে আগুন জ্বেলেছিল; ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতাভোটে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় এটি স্থান পায়। আজও প্রতিবাদী মিছিলে এই গান গাওয়া হয়।

কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট

— কাজী নজরুল ইসলাম, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

গানটির কেন্দ্রীয় রূপক কারাগার—ব্রিটিশ শাসনের বন্দীশালা, যার লৌহকপাট ভেঙে 'লোপাট' করে দিতে হবে। কবি তরুণদের ডাকেন—'ওরে ও তরুণ ঈশান', বাজাতে বলেন প্রলয়ের বিষাণ; ধ্বংস-নিশান উড়িয়ে প্রাচীর ভেঙে ফেলতে হবে। 'কে মালিক কে সে রাজা, কে দেয় সাজা'—প্রশ্ন তুলে কবি ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বকেই অস্বীকার করেন। শেষে 'মার হাঁক হায়দারি হাঁক'—যুদ্ধংদেহী আহ্বানে গান শেষ হয়। সংক্ষেপে, এটি পরাধীন জাতির মুক্তির ডাক—কারাগার শুধু ইট-পাথরের নয়, মানসিক দাসত্বেরও; দুটোকেই ভাঙতে হবে।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

'কারার ঐ লৌহ-কপাট' নজরুলের সেই গানগুলোর একটি, যা শুধু শোনার জন্য নয়—গাওয়ার জন্য, মিছিলে গলা মেলানোর জন্য। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গ্রেফতার হলে তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবীর অনুরোধে নজরুল এই গান রচনা করেন বলে প্রচলিত—একজন বন্দী নেতার মুক্তির দাবিতে লেখা গান, যা পরে সমগ্র পরাধীন জাতির মুক্তির গানে পরিণত হয়। গানটির কেন্দ্রীয় চিত্র কারাগার। 'কারার ঐ লৌহ-কপাট ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট'—এই আহ্বানে শুধু ইট-পাথরের জেলখানা নয়, মানসিক দাসত্বের কারাগারও ভাঙার ডাক। 'রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী'—এই পংক্তিতে শৃঙ্খলকে পূজার বেদীর সঙ্গে তুলনা করে কবি বোঝান, পরাধীনতা এমন এক ধর্মে পরিণত হয়েছে যার বেদীতে রক্ত জমাট বেঁধেছে; এই বেদী ভাঙতেই হবে। গানটির গঠন লক্ষণীয়। শুরুতে আহ্বান—লৌহকপাট ভাঙো। তারপর 'ওরে ও তরুণ ঈশান'—তরুণদের সরাসরি সম্বোধন; 'বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ'—যুদ্ধের দামামা। মাঝে প্রশ্ন—'কে মালিক কে সে রাজা, কে দেয় সাজা?'—এই প্রশ্ন ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করে। 'হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান পরবে ফাঁসি'—এই পংক্তিতে শাসকের দম্ভের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গ। শেষে 'মার হাঁক হায়দারি হাঁক'—রণহুংকারে সমাপ্তি। নজরুল নিজে এই গানের সুর করেছিলেন। কথার মতো সুরও মার্চ-ধাঁচের—দ্রুত, দৃপ্ত, সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার উপযোগী। এই কারণে গানটি শুধু শিল্পীর মঞ্চে নয়, রাজপথে বেঁচে আছে। স্বাধীনতা-সংগ্রামের যুগে, ভাষা-আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে—প্রতিটি লড়াইয়ের সময় তরুণরা এই গান গেয়েছে। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতাভোটে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় এর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে, এই গান শুধু ইতিহাস নয়—বর্তমান। 'বিদ্রোহী' কবিতার সঙ্গে এই গানের গভীর সম্পর্ক আছে। দুটোই ১৯২১-২২ পর্বের রচনা; দুটোতেই 'আমি' বা 'তরুণ'—এক বিদ্রোহী সত্তার উত্থান। কিন্তু 'বিদ্রোহী' যেখানে দার্শনিক ও পৌরাণিক, 'কারার ঐ লৌহ-কপাট' সেখানে সরাসরি রাজনৈতিক—লক্ষ্য স্পষ্ট, শত্রু স্পষ্ট, কর্মপন্থা স্পষ্ট। এই স্পষ্টতাই গানটিকে আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। গানটির সুর-কাঠামোও লক্ষণীয়। স্থায়ী অংশে ('কারার ঐ লৌহ-কপাট') আহ্বান, অন্তরাগুলোতে যুক্তি ও ব্যঙ্গ—এই গঠন গণসংগীতের চিরায়ত রূপ। নজরুল সুরকার হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ; তাঁর সুরে আরবি-ফারসি ঢঙের সঙ্গে বাংলার লোকসুরের মিলন ঘটেছে, ফলে গানটি একদিকে উদ্দীপক, অন্যদিকে গাইতে সহজ। এই সহজতাই গানটিকে মঞ্চ থেকে রাজপথে নামিয়ে এনেছে। চলচ্চিত্রেও গানটি ব্যবহৃত হয়েছে—'জীবন থেকে নেওয়া' ছবিতে এর প্রয়োগ দর্শককে আলোড়িত করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রতিটি গণআন্দোলনে এই গান ফিরে ফিরে আসে; প্রমাণ হয়, কারাগারের রূপ বদলায়, কিন্তু মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বদলায় না।

প্রধান ভাব ও বার্তা

বিদ্রোহ, স্বাধীনতা, দেশপ্রেম, কারামুক্তি

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

রণসংগীত; দ্রুত, মার্চ-ধাঁচের তালে রচিত—মিছিলে গাওয়ার উপযোগী। 'কারার ঐ লৌহ-কপাট'—ধ্বন্যাত্মক, আঘাতী শব্দচয়ন। প্রশ্নবোধক পংক্তি ('কে মালিক কে সে রাজা') পাঠককে চিন্তায় বাধ্য করে। পুনরাবৃত্তি ('আগুন-জ্বালা, আগুন জ্বালা') আবেগকে চরমে তোলে। নজরুল নিজে সুর দিয়েছিলেন—কথা ও সুরের যুগলবন্দিতে গানটি আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গ্রেফতার হলে তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবীর অনুরোধে নজরুল এই গান রচনা করেন বলে প্রচলিত। এটি তাঁর বিখ্যাত 'ভাঙার গান' পর্যায়ের রচনা। অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনে এই গান যুবসমাজের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতাভোটে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় এটি স্থান পায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ পরবর্তী প্রতিটি গণআন্দোলনেও এই গান প্রেরণা জুগিয়েছে।

সম্পর্কিত কবিতা

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।