মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ নাচে—
খবরদার এসো না কেউ আস্তাবলের কাছে ;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে ;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে হট্টমূলার গাছে ।

(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ কাঁদে—
খবরদার ! খবরদার ! বসবে না কেউ ছাদে ;
উপুড় হয়ে মাচায় শুয়ে লেপ কম্বল কাঁধে,
বেহাগ সুরে গাইবে খালি ‘রাধে কৃষ্ণ রাধে !’

(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ হাসে—
থাকবে খাড়া একটি ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে ;
ঝাপসা গলায় ফার্সি কবে নিশ্বাসে ফিস্‌ফাসে ;
তিনটি বেলা উপোস করে থাকবে শুয়ে ঘাসে !

(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ ছোটে—
সবাই যেন তড়বড়িয়ে জানালা বেয়ে ওঠে ;
হুঁকোর জলে আলতা গুলে লাগায় গালে ঠোঁটে ;
ভুলেও যেন আকাশ পানে তাকায় না কেউ মোটে !

(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ ডাকে—
সবাই যেন শ্যামলা এঁটে গামলা চড়ে থাকে ;
ছেঁচকি শাকের ঘন্ট বেটে মাথায় মলম মাখে ;
শক্ত ইঁটের তপ্ত ঝামা ঘষতে থাকে নাকে ।

তুচ্ছ ভেবে এ–সব কথা করছ যারা হেলা,
কুম্‌ড়োপটাশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা ।
দেখবে তখন কোন্ কথাটি কেমন করে ফলে,
আমায় তখন দোষ দিও না, আগেই রাখি বলে ।

কবিতার সারসংক্ষেপ

ছড়াটি পাঁচটি 'যদি' দিয়ে গাঁথা। যদি কুম্‌ড়োপটাশ নাচে—তবে আস্তাবলের কাছে যাওয়া নিষেধ, চার পা তুলে হট্টমূলার গাছে ঝুলে থাকতে হবে! যদি কাঁদে—তবে ছাদে বসা নিষেধ, লেপ-কম্বল গায়ে বেহাগ সুরে 'রাধে কৃষ্ণ রাধে' গাইতে হবে! যদি হাসে—তবে এক ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে ফার্সি বলতে হবে! যদি ছোটে বা ডাকে—তবে আরও অদ্ভুত সব নিয়ম। শেষ স্তবকে কবির ভান-গম্ভীর উপসংহার: এসব কথা তুচ্ছ ভেবে হেলা কোরো না, কুম্‌ড়োপটাশ জানতে পেলে 'বুঝবে তখন ঠেলা'!

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

'কুম্‌ড়োপটাশ' নামটি শুনলেই হাসি পায়—কুমড়ো (সবজি) আর পটাশ (রাসায়নিক)—দুটি সম্পূর্ণ অসংলগ্ন জিনিসের জোড়া। এই নামকরণেই সুকুমার রায়ের কৌশল: পরিচিত শব্দের অপরিচিত মিলনে হাসির স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু ছড়ার আসল মজা নামে নয়, গঠনে। পাঁচটি স্তবকের প্রতিটি শুরু '(যদি)' দিয়ে—যদি নাচে, যদি কাঁদে, যদি হাসে, যদি ছোটে, যদি ডাকে। শর্তবাক্যের এই পুনরাবৃত্তি ছড়াটিকে দেয় মন্ত্রের মতো গতি; পাঠক প্রতিটি 'যদি'র পর উৎকণ্ঠায় থাকে—এবার কী হবে? আর যা হয়, তা যুক্তির ধার ধারে না। কুম্‌ড়োপটাশ নাচলে চার পা তুলে হট্টমূলার গাছে ঝুলে থাকতে হবে; কাঁদলে লেপ-কম্বল গায়ে বেহাগ সুরে 'রাধে কৃষ্ণ রাধে' গাইতে হবে; হাসলে এক ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে ফার্সি বলতে হবে আর তিন বেলা উপোস! প্রতিটি 'সতর্কবাণী' যত গম্ভীর ভঙ্গিতে দেওয়া, তার বিষয়বস্তু তত হাস্যকর। এই বৈপরীত্য—ভান-গাম্ভীর্য বনাম আসল-হাস্যরস—সুকুমারী হাস্যরসের মূল চাবিকাঠি। বড়োদের জগতে যেমন ভয় দেখিয়ে নিয়ম মানানো হয়, ছড়াটি সেই ভঙ্গিরই ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণ; শিশুরা হাসতে হাসতে বুঝে যায়, ভয়ের ভান কতটা ফাঁপা। শেষ স্তবকটি বিশেষভাবে চতুর। কবি সরাসরি পাঠকের দিকে তাকিয়ে বলেন—'তুচ্ছ ভেবে এ-সব কথা করছ যারা হেলা, কুম্‌ড়োপটাশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা।' অর্থাৎ, এতক্ষণ যা বললাম সবই সত্যি বলে মেনে নাও, নইলে...! যুক্তিহীন জগতের ভেতরেও কবি একটা 'যুক্তি' দাঁড় করিয়ে দেন—ভয় দেখানোর ভানকে সম্পূর্ণ করে। 'আমায় তখন দোষ দিও না, আগেই রাখি বলে'—এই শেষ পংক্তিতে কবির দুষ্টুমি পূর্ণতা পায়; তিনি যেন দায় এড়িয়ে পাঠককেই ফাঁদে ফেললেন। ভাষার দিক থেকে ছড়াটি ধ্বনির উৎসব। 'তড়বড়িয়ে', 'ফিস্‌ফাসে', 'হট্টমূলা'—এমন শব্দ পড়লেই জিভে নাচন জাগে। 'বেহাগ সুরে গাইবে খালি রাধে কৃষ্ণ রাধে'—এই পংক্তিতে উচ্চাঙ্গ সংগীতের রাগ আর লোকায়ত কীর্তনের মিলন ঘটিয়ে কবি এক পংক্তিতেই দুই জগতের হাস্যকর সন্ধি ঘটান। 'শ্যামলা এঁটে গামলা চড়ে থাকে', 'ছেঁচকি শাকের ঘন্ট বেটে মাথায় মলম মাখে'—এমন চিত্রকল্পে বাঙালি ঘর-গেরস্থালির গন্ধ, ফলে অসম্ভবও মনে হয় চেনা। 'কুম্‌ড়োপটাশ' প্রমাণ করে, শিশুসাহিত্যে 'শিক্ষা' না দিয়েও কতটা বুদ্ধির খেলা সম্ভব। কবি এখানে শিশুকে কিছু শেখান না; তিনি শিশুর সঙ্গে খেলেন—আর সেই খেলাতেই শিশু শেখে ভাষার মজা, ছন্দের মজা, আর সবচেয়ে বড়ো কথা—ভয়কে হাসিতে উড়িয়ে দেওয়ার মজা।

প্রধান ভাব ও বার্তা

ননসেন্স ছড়া, হাস্যরস, ভান-গাম্ভীর্যের ব্যঙ্গ

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

পাঁচটি চতুষ্পংক্তিক স্তবক, প্রতিটি '(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ...' দিয়ে শুরু—শর্তবাক্যের পুনরাবৃত্তিতে এক ধরনের মন্ত্রমুগ্ধ ছন্দ। প্রতিটি শর্তের পরিণাম অসংগত ও অতিরঞ্জিত—ভয়ের ভান, হাসির আসল। শেষ স্তবকে কবির সরাসরি পাঠকের উদ্দেশে ভাষণ ('আমায় তখন দোষ দিও না')—নাটকীয় সমাপ্তি। 'হট্টমূলা', 'বেহাগ', 'ফিস্‌ফাসে'—ধ্বনি ও অদ্ভুত শব্দের খেলা। বাঙালি ঘর-গেরস্থালির চিত্রকল্পে অসম্ভবও চেনা লাগে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

'সন্দেশ' পত্রিকায় 'আবোল তাবোল' শিরোনামের ধারাবাহিক ছড়ার অংশ হিসেবে প্রকাশিত (১৩২২ বঙ্গাব্দের দিকে); পরে 'আবোল তাবোল' গ্রন্থে (১৯২৩) সংকলিত। সুকুমার রায় তখন 'সন্দেশ'-এর সম্পাদক। তাঁর মৃত্যুর নয় দিন পর ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বইটি প্রকাশিত হয়। এই ছড়াগুলো লেখার সময় বাংলা শিশুসাহিত্যে নীতিকথাই ছিল প্রধান ধারা; সুকুমারের নির্মল খেয়ালরস সেই ধারাকে উল্টে দেয়—শিশুদের জন্য লেখায় 'শিক্ষা'র বদলে 'আনন্দ'কে কেন্দ্রে আনে।

সম্পর্কিত কবিতা

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।