মানুষ
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ (১৯২৫) মানবিক সাম্যের সবচেয়ে দৃপ্ত ঘোষণাগুলোর একটি। ‘সাম্যবাদী’…”
কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ (১৯২৫) বাংলা কবিতায় নারীমুক্তির সবচেয়ে দৃপ্ত ঘোষণা। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় কবি ঘোষণা করেন—জগতের সব মহান সৃষ্টির অর্ধেক নারীর, অর্ধেক পুরুষের; কোনো যুগে নারীকে অবরুদ্ধ করে সভ্যতা এগোতে পারে না। একশো বছর পরেও এই কবিতা নারীর সমানাধিকারের লড়াইয়ে উচ্চারিত হয়।
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।— কাজী নজরুল ইসলাম, ‘নারী’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতার মূল বক্তব্য সরল ও অকাট্য—জগতের যা-কিছু মহান ও কল্যাণকর সৃষ্টি, তার অর্ধেক নারীর হাতে, অর্ধেক পুরুষের হাতে। নারীকে দয়ার পাত্রী নয়, স্রষ্টা ও ইতিহাসের সমান অংশীদার হিসেবে দেখেন কবি। তিনি ইতিহাস, পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থ থেকে নারীর মহিমার দৃষ্টান্ত তোলেন এবং ঘোষণা করেন—নারীকে অবরুদ্ধ, অশিক্ষিত ও পর্দানশীন রেখে কোনো জাতি বড়ো হতে পারে না। সংক্ষেপে, এটি লিঙ্গ-সাম্যের কাব্যিক ঘোষণাপত্র—যে সমাজ তার অর্ধেক শক্তিকে বন্দী রাখে, সে সমাজ পঙ্গু।
'নারী' কবিতাটি নজরুল লিখেছিলেন ১৯২৫ সালে, 'সাম্যবাদী' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত করে। সময়টা লক্ষণীয়—বিশ শতকের বিশের দশক, যখন বাংলার নারীরা সবে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে স্কুল-কলেজে পা রাখছেন, যখন নারীশিক্ষা ও নারী-স্বাধীনতা নিয়ে সমাজে তুমুল বিতর্ক। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নজরুল যে ঘোষণা দিলেন—'বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর'—তা ছিল বৈপ্লবিক। তিনি নারীকে দয়ার পাত্রী হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন স্রষ্টা হিসেবে, ইতিহাসের সমান অংশীদার হিসেবে। কবিতার যুক্তি-কাঠামো লক্ষণীয়। নজরুল প্রথমে ইতিহাসের দিকে তাকান—কোনো বড়ো সৃষ্টি, কোনো মহৎ কর্ম কি একা পুরুষের হাতে হয়েছে? তারপর তিনি ধর্মগ্রন্থ ও পুরাণের দিকে তাকান—সেখানেও নারীর মহিমা। এইভাবে 'অর্ধেক' শব্দটি কবিতায় একটি গাণিতিক সত্যের মতো প্রতিষ্ঠা পায়—এটি কোনো ভিক্ষা নয়, এটি হিসাব। নারীর অবদানকে 'অনুগ্রহ' বলে চালিয়ে দেওয়ার যে পুরুষতান্ত্রিক কৌশল, নজরুল তাকে ভেঙে দেন এই সরল অথচ অকাট্য যুক্তিতে। কবিতার ভাষা আবেগপ্রবণ কিন্তু যুক্তিনিষ্ঠ। নজরুল নারীকে 'মা', 'ভগিনী', 'প্রিয়া'—এই চিরায়ত সম্বোধনে ডাকেন, কিন্তু সেই সম্বোধনের ভেতরে রাখেন সমতার দাবি। তিনি বলেন, নারীকে অবরুদ্ধ রেখে, অশিক্ষিত রেখে, পর্দার আড়ালে রেখে কোনো জাতি বড়ো হতে পারে না; যে সমাজ তার অর্ধেক শক্তিকে বন্দী করে রাখে, সে সমাজ পঙ্গু। এই বক্তব্য আজ, একশো বছর পরেও, সমান প্রাসঙ্গিক—কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতিতে, পরিবারে নারীর সমানাধিকারের লড়াই এখনো চলছে। 'সাম্যবাদী' কাব্যগ্রন্থের মূল সুর সাম্য—ধনী-দরিদ্রের, হিন্দু-মুসলমানের, এবং নারী-পুরুষের। 'নারী' কবিতা এই সাম্যবাদেরই একটি স্তম্ভ। নজরুল বুঝেছিলেন, শ্রেণী-বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের মতো লিঙ্গ-বৈষম্যও মানবমুক্তির পথে বাধা। তাই তাঁর বিদ্রোহ শুধু ব্রিটিশের বিরুদ্ধে নয়—সমাজের ভেতরের সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই সর্বাত্মক বিদ্রোহই নজরুলকে তাঁর যুগের চেয়ে বড়ো করে তোলে। কবিতাটির সবচেয়ে বড়ো শক্তি এর স্মরণীয়তা। 'অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর'—এই পংক্তি বাংলার ঘরে ঘরে, সভা-সমিতিতে, পাঠ্যপুস্তকে উচ্চারিত হয়। একটি পংক্তি যখন প্রবাদে পরিণত হয়, তখন বোঝা যায় কবি শুধু কবিতা লেখেননি—ভাষাকে একটি অস্ত্র দিয়েছেন। 'নারী' কবিতা সেই অস্ত্র, যা আজও নারীর মর্যাদার লড়াইয়ে ব্যবহৃত হয়। 'সাম্যবাদী' কাব্যের অন্য কবিতাগুলোর সঙ্গে 'নারী'র সম্পর্কও লক্ষণীয়। 'মানুষ' কবিতায় নজরুল লিখেছিলেন—'গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই'; 'কুলি-মজুর' কবিতায় শ্রমজীবীর মর্যাদা; 'নারী' কবিতায় লিঙ্গ-সাম্য। তিনটি কবিতা মিলে সাম্যবাদের ত্রিস্তম্ভ—শ্রেণী, সম্প্রদায়, লিঙ্গ। এই পরিকল্পিত কাঠামো প্রমাণ করে, নজরুলের বিদ্রোহ ছিল সুচিন্তিত দর্শন, নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়।
নারীমুক্তি, সাম্য, মানবতা
ঘোষণাধর্মী কবিতা; 'অর্ধেক' শব্দের পুনরাবৃত্তিতে যুক্তি গাণিতিক সত্যের রূপ নেয়। ইতিহাস, পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থ থেকে দৃষ্টান্ত আহরণ—প্রমাণ-ভিত্তিক কাব্যিক যুক্তি। ভাষা আবেগপ্রবণ কিন্তু যুক্তিনিষ্ঠ; চিরায়ত সম্বোধনের ('মা', 'ভগিনী', 'প্রিয়া') ভেতরে সমতার দাবি। মাত্রাবৃত্তের দৃপ্ত তালে রচিত—আবৃত্তি-উপযোগী।
১৯২৫ সালে 'সাম্যবাদী' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত। বিশের দশকের বাংলায় নারীশিক্ষা ও নারী-স্বাধীনতা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছিল; নারীরা সবে ঘরের বাইরে পা রাখছেন। এই পটভূমিতে নজরুলের এই ঘোষণা ছিল বৈপ্লবিক। 'সাম্যবাদী'র মূল সুর সাম্য—শ্রেণী, সম্প্রদায় ও লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে। এই কবিতা পরবর্তীকালে নারী আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে; 'অর্ধেক তার করিয়াছে নারী' পংক্তিটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ (১৯২৫) মানবিক সাম্যের সবচেয়ে দৃপ্ত ঘোষণাগুলোর একটি। ‘সাম্যবাদী’…”
“কবিতা ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্বোধ অতি ঘোর। যা-কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, "কেষ্টা বেটাই…”
“কবিতা গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে মৈত্র মহাশয় যাবে সাগরসঙ্গমে তীর্থস্নান লাগি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান' ('হিন্দু-মুসলমান' কবিতা) বাংলা…”
“কবিতা সম্পর্কে জসীমউদ্দীনের 'আসমানী' (১৯৪৯) বাংলা কবিতায় গ্রামবাংলার দারিদ্র্যের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রতিকৃতিগুলোর একটি। 'এক…”