মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা সম্পর্কে

কাজী নজরুল ইসলামের ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ বাংলা শিশুতোষ কবিতার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনাগুলোর একটি। ১৯২৬ সালে ‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত এই কবিতায় একটি ছোট্ট মেয়ে খুকির সঙ্গে কাঠবেড়ালির মিষ্টি ঝগড়া ও ভাবের গল্প বলা হয়েছে শিশুর নিজের ভাষায়।

কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি-নেবু? লাউ?

— কাজী নজরুল ইসলাম, ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

একটি ছোট্ট মেয়ে খুকি তার বাগানের পেয়ারা গাছে বসে থাকা কাঠবেড়ালির ওপর ভীষণ রেগে আছে — কারণ কাঠবেড়ালি একাই সব পাকা পেয়ারা খেয়ে ফেলছে। খুকি তাকে ডেকে একের পর এক খাবারের নাম করে জিজ্ঞেস করে, আবার গালও দেয় — 'ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক', 'ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার!' রাগের মাথায় সে হুমকি দেয়, মারবে বলে, রাঙাদাকে ডাকবে বলে। কিন্তু ধীরে ধীরে রাগ গলে যায়; শেষে খুকি কাঠবেড়ালিকে নিজের ছোড়দি-বৌদি বানাতে চায়, শুধু একটি পেয়ারার বিনিময়ে। শিশুর রাগ ও ভালোবাসার এই দ্রুত বদলই কবিতাটির প্রাণ।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

নজরুলকে আমরা চিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে, কিন্তু শিশুদের জন্য তিনি যে কত স্নেহশীল কবি ছিলেন, 'খুকি ও কাঠবেড়ালি' তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। এই কবিতার আসল বক্তা খুকি — একটি ছোট্ট মেয়ে, যে তার বাগানের পেয়ারা গাছে বসা কাঠবেড়ালির ওপর ভীষণ রেগে আছে। কবিতা পুরোটাই খুকির একটানা বকবকানি: কাঠবেড়ালিকে সে গাল দেয়, হুমকি দেয়, আবার শেষে তার সঙ্গেই ভাব করতে চায়। এই সরল কাঠামোর ভেতরেই কবিতাটির জাদু। শিশুমনের সবচেয়ে সত্য বৈশিষ্ট্য হলো এর আবেগের অস্থিরতা — রাগ, অভিমান, হিংসা, ভালোবাসা সব একসঙ্গে থাকে; নজরুল সেই মনকে কোনো সাজানো-গোছানো বয়ান ছাড়াই ধরেছেন। 'কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?' — এই প্রশ্ন আসলে প্রশ্ন নয়, অভিযোগ; তারপর একের পর এক খাবারের নাম — গুড়-মুড়ি, দুধ-ভাত, বাতাবি-নেবু, লাউ, এমনকি বিড়াল-বাচ্চা আর কুকুর-ছানাও! শিশুর কল্পনা যেমন সীমাহীন, তার রাগও তেমনি অসীম — এই অতিরঞ্জনই কবিতার হাস্যরসের উৎস। কবিতার মাঝামাঝি খুকির রাগ চরমে ওঠে: 'ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক', 'ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!' — শিশুদের ঝগড়ার ভাষা হুবহু ধরা পড়েছে এখানে। কিন্তু শেষের দিকে মোড় ঘোরে: খুকি বুঝতে পারে, একা একা পেয়ারা খাওয়ার চেয়ে ভাগ করে খাওয়াই আনন্দের। 'আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও!' — এই আকুতিতে রাগ গলে যায়, আর শেষে 'কাঠবেড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি' হবে? বৌদি হবে?' — শত্রু মুহূর্তে পরিণত হয় আত্মীয়ে। শিশুর জগতে শত্রুতা ও বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো দেয়াল নেই — নজরুল এই সত্যটিই ধরেছেন। ছন্দের দিক থেকে কবিতাটি ছড়ার ঢঙে, দ্রুত তালের; ধ্বন্যাত্মক শব্দ — গাপুস গুপুস, হাপুস হুপুস, পুটুস পাটুস — পাঠকের মুখে আনন্দ আনে। প্রায় একশো বছর পেরিয়ে গেলেও এই কবিতা শিশুদের মুখে মুখে ফেরে; কারণ খুকির এই অভিমান প্রতিটি শিশুরই অভিমান। এই কবিতার আরেকটি গভীর দিক হলো এর পেছনের ব্যক্তিগত বেদনা। 'ঝিঙে ফুল' রচনার সময় নজরুল পুত্র বুলবুলকে হারিয়েছিলেন; শিশুদের প্রতি তার এই অসীম মমতার পেছনে ছিল সেই শূন্যতা। খুকির চরিত্রে তিনি যেন হারানো শৈশবকেই ফিরে পেতে চেয়েছেন। লক্ষণীয়, কবিতায় মা-বাবা কেউ নেই — খুকি একাই বাগানে, একাই তার জগতের নায়িকা; শিশুর স্বাধীন জগতকে নজরুল পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছেন। প্রকৃতির সঙ্গে শিশুর এই নিবিড় সম্পর্ক — গাছ, পেয়ারা, পশুপাখি — নজরুলের শিশুসাহিত্যের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। কবিতাটি আবৃত্তির জন্য অসাধারণ উপযোগী; শিশুরা এটি পড়তে পড়তে নিজেরাই খুকি হয়ে ওঠে — আর এখানেই কবিতাটির চিরন্তন সাফল্য: এটি শিশুদের জন্য লেখা হলেও, শিশুদের মতো করে লেখা।

প্রধান ভাব ও বার্তা

শিশুমন, অভিমান ও বন্ধুত্ব, প্রকৃতি, হাস্যরস

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি সম্পূর্ণ কথোপকথনধর্মী — খুকির একটানা সংলাপে গড়া, যা পাঠককে সরাসরি ঘটনার মধ্যে টেনে নেয়। ছড়ার দ্রুত তাল ও ধ্বন্যাত্মক শব্দের (গাপুস গুপুস, হাপুস হুপুস, পুটুস পাটুস) ব্যবহারে মুখে মুখে বলার আনন্দ তৈরি হয়েছে। শিশুভাষার হুবহু অনুকরণ — 'ছোঁচা তুমি!', 'তুমি মর! তুমি কচু খাও!' — কবিতাটিকে করেছে অসাধারণভাবে প্রামাণিক। আবেগের দ্রুত বদল (রাগ থেকে ভাব) কবিতাটিকে দিয়েছে নাটকীয় গতি। পুনরাবৃত্তিমূলক সম্বোধন ('কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি!') ছড়াটিকে স্মরণীয় করে তুলেছে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯২৬ সালে 'ঝিঙে ফুল' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সময় নজরুল ছিলেন তরুণ কবি, 'বিদ্রোহী' (১৯২২) ও 'অগ্নিবীণা'র সাফল্যের পর তিনি শিশুসাহিত্যের দিকেও মন দেন। এই সময়ে বাংলা শিশুসাহিত্যে সুকুমার রায়ের 'আবোল তাবোল' (১৯২৩) নতুন মাত্রা এনেছিল; নজরুল সেই ধারায় নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ যোগ করেন — যেখানে শিশুর রাগ-অভিমানকে তিনি কখনো তুচ্ছ করেননি, বরং তাকে দিয়েছেন পূর্ণ মর্যাদা। 'খুকি ও কাঠবেড়ালি' আজও স্কুলের পাঠ্যবই ও আবৃত্তির মঞ্চে সমান জনপ্রিয়।

সম্পর্কিত কবিতা

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।