চল চল চল
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
আঠারাে বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তােলবার ঝুঁকি,
আঠারাে বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারাে বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নােয়াবার নয়
আঠারাে বছয় বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে ষ্টীমারের মতাে চলে,
প্রাণ, দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারাে বছর বয়স ভয়ঙ্কর
তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর
এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারাে বছর বয়স যে দুর্বার
পথে প্রান্তরে ছােটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতাে রাখা ভার
ক্ষত বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারাে বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্রান্ত; একে একে হয় জড়াে,
এ বয়স কালাে লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরােথরাে।
তবু আঠাবাের শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তাে করে।
এ বয়স জেনাে ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোন সংশয়—
এ দেশের বুকে আঠারাে আসুক নেমে॥
কবিতাটি আঠারো বছর বয়সের দ্বৈত রূপ তুলে ধরে। একদিকে এই বয়স দুঃসহ, ভয়ংকর, দুর্বার—স্পর্ধায় মাথা তোলার ঝুঁকি নেয়, পদাঘাতে পাথরের বাধা ভাঙতে চায়, রক্তদানের পুণ্য জানে, বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো ছোটে। অন্যদিকে এই বয়সেই আসে অসহ্য যন্ত্রণা, কানে আসে কুমন্ত্রণা, দুর্যোগে হাল ধরে রাখা কঠিন হয়, আঘাত আসে অবিশ্রান্ত। কিন্তু কবি শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছান—তবু আঠারোর জয়ধ্বনি শোনা গেছে; এ বয়স বিপদের মুখে অগ্রণী, এ বয়স নতুন কিছু করে। তাই কবির আহ্বান: এ বয়স ভীরু বা কাপুরুষ নয়, এ বয়স থামে না—এ দেশের বুকে আঠারো নেমে আসুক। সংক্ষেপে, এটি যৌবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও জাতির প্রতি আহ্বানের কবিতা; ব্যক্তিগত বয়সকে জাতীয় সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার কাব্য।
‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতার সবচেয়ে বড় শৈল্পিক গুণ এর সততা। সুকান্ত যৌবনকে শুধু গোলাপি চশমায় দেখেননি; তিনি দেখিয়েছেন এর দুটি মুখ—একদিকে অদম্য শক্তি ও দুঃসাহস, অন্যদিকে যন্ত্রণা, বিভ্রান্তি ও ভাঙনের ঝুঁকি। ‘আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর / তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা’—এই পংক্তিদ্বয়ে কবি স্বীকার করছেন, যৌবন শুধু উৎসব নয়; এতে আছে তীব্র বেদনা, আছে ভুল পথে যাওয়ার আশঙ্কা (‘এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা’)। এই দ্বিমুখী দৃষ্টিই কবিতাটিকে শুধু উদ্দীপনামূলক শ্লোগান থেকে বাঁচিয়ে গভীর মানবিক রচনায় পরিণত করেছে। কবিতার গঠন লক্ষণীয়: আটটি স্তবক, প্রতিটিতে চারটি পংক্তি; মাত্রাবৃত্ত ছন্দের দ্রুত, দৃঢ় লয়। পুনরাবৃত্তি কবিতাটির প্রাণ—‘আঠারো বছর বয়স’ শব্দবন্ধটি বারবার ফিরে আসে, যেন ঢাকের বাদ্য; প্রতিবার নতুন বিশেষণে (দুঃসহ, ভয়ংকর, দুর্বার) বয়সটির নতুন দিক উন্মোচিত হয়। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে আবৃত্তির জন্য অত্যন্ত উপযোগী করেছে—প্রজন্মের পর প্রজন্ম তরুণরা এটি মুখস্থ করেছে, মঞ্চে পাঠ করেছে। দার্শনিক দিক থেকে কবিতাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: যৌবনের শক্তি কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল্যাণকর? সুকান্তের উত্তর—না; শক্তিকে সঠিক দিকে চালিত করতে হয়। ‘দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার’—এই পংক্তিতে কবি স্বীকার করছেন, শক্তি থাকলেই হয় না, দরকার দিশা। আর সেই দিশা তিনি দেন শেষ স্তবকে: এই শক্তি দেশের কাজে লাগুক—‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। ব্যক্তিগত বয়স এখানে জাতীয় রূপকে পরিণত হয়; আঠারো আর শুধু একটি সংখ্যা থাকে না, হয়ে ওঠে নবজাগরণের প্রতীক। ঐতিহাসিক পটভূমিও গুরুত্বপূর্ণ। কবিতাটি রচিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ছায়ায়—যখন বাংলা বিপর্যস্ত, তরুণরা দিশেহারা। এই অন্ধকারে সুকান্ত তরুণদের মধ্যেই আলো দেখলেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস হয়; ‘এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য’—এই পংক্তি যেন তাদেরই কথা বলে। মাত্র একুশ বছর বয়সে মারা যাওয়া কবির কলমে যৌবনের এমন পরিণত বিশ্লেষণ বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়—তিনি নিজে আঠারো পেরিয়ে যাননি, অথচ আঠারোকে চিনেছিলেন সবচেয়ে ভালো। কবিতাটির ভাষা-কৌশলের আরেকটি দিক হলো এর শারীরিক চিত্রকল্প। ‘পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা’, ‘বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে’—এই উপমাগুলো যন্ত্রযুগের; কবি যৌবনকে দেখেছেন একটি ইঞ্জিনের মতো—শক্তিশালী, গতিময়, কিন্তু দিশা না পেলে বিধ্বংসী। এই যান্ত্রিক উপমা কবিতাটিকে রোমান্টিক যৌবন-বন্দনা থেকে আলাদা করে; এখানে যৌবন কোনো স্বপ্নিল অবস্থা নয়, একটি বাস্তব শক্তি—যাকে কাজে লাগাতে হয়। ‘প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য’—এই পংক্তিতে ত্যাগের দর্শন; যৌবন শুধু নেয় না, দেয়ও। এই দেওয়ার মানসিকতাই কবিতাটিকে স্বার্থপর যৌবন-উল্লাস থেকে মুক্ত করে। আজকের তরুণ পাঠকের কাছেও কবিতাটি সমান প্রাসঙ্গিক—কারণ প্রতিটি প্রজন্মের আঠারোই একই দ্বন্দ্বে ভোগে: উচ্ছ্বাস বনাম দিশাহীনতা। সুকান্তের উত্তর আজও কার্যকর—শক্তিকে দেশ ও মানুষের কাজে লাগাও; তবেই আঠারো সার্থক।
যৌবন, বিদ্রোহ ও সাহস, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত; প্রতি স্তবকে চারটি পংক্তি, মোট আটটি স্তবক। ‘আঠারো বছর বয়স’ শব্দবন্ধের বারবার পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে ঢাকের বাদ্যের মতো ছন্দময় ও আবৃত্তিযোগ্য করেছে। বৈপরীত্যের শিল্প: একই বয়স একসঙ্গে ‘দুঃসহ’ ও ‘জয়ধ্বনি’, ‘ভয়ংকর’ ও ‘অগ্রণী’—এই দ্বৈততাই কবিতার দার্শনিক গভীরতা। চিত্রকল্প সরল কিন্তু শক্তিশালী: ‘পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা’, ‘বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে’—শিল্প-যুগের উপমায় যৌবনের গতি। ভাষা সহজ, সরাসরি, শ্লোগানধর্মী; অলংকারের বাহুল্য নেই। শেষ স্তবকে ব্যক্তিগত বয়স থেকে জাতীয় আহ্বানে উত্তরণ কবিতাটিকে শুধু বয়সের কবিতা থেকে মুক্তির কবিতায় রূপ দেয়।
‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে, কবির মৃত্যুর (১৯৪৭) পর। কবিতাটি রচিত হয় চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের ভয়াবহ মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও স্বাধীনতা-আন্দোলনের উত্তাল সময়ে। সুকান্ত নিজে ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ কর্মী; ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ পত্রিকার কিশোরসভা বিভাগের সম্পাদক। এই রাজনৈতিক চেতনা কবিতাটিতে স্পষ্ট—যৌবনের শক্তিকে তিনি দেখেছেন সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে। উল্লেখ্য, কবি নিজে আঠারো বছর বয়সেই এই কবিতা রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়—অর্থাৎ এটি আত্মজীবনীমূলকও বটে। প্রকাশের পর কবিতাটি দ্রুত পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণ-আন্দোলনে তরুণদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। আজও ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’—এই পংক্তি যেকোনো যুব-আন্দোলনের শ্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”
“কবিতা সম্পর্কে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' (১৯৭৯) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী…”
“কবিতা সম্পর্কে ফররুখ আহমদের 'সাত সাগরের মাঝি' (১৯৪৪) বাংলা কবিতায় জাগরণের ডাকের সবচেয়ে কাব্যময়…”