ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ (১৯২৫) বাংলা কবিতার ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী শোকগাথাগুলোর একটি। ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কবিতাটি পাঠকমহলে আলোড়ন তোলে এবং কবিকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়।
এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।— জসীমউদ্দীন, ‘কবর’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
কবিতাটির কথক একজন নাতি, যে তার দাদীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণা করছে। দাদীর জীবনের পরিশ্রম, স্নেহ, সংসারের জন্য ত্যাগ—সবই তার মনে পড়ে; ডালিম-গাছের তলায় শায়িত দাদীর কবর তিরিশ বছর ধরে তার চোখের জলে ভিজেছে। কবিতা এগোতে থাকে কবরের চারপাশের অন্যান্য স্বজনের স্মৃতি নিয়ে—যারা একে একে চলে গেছে। শেষে কথক শপথ নেয়, এই মাটি, এই গ্রাম, এই স্বজনদের স্মৃতিকে সে কখনো ভুলবে না। সংক্ষেপে, এটি মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের প্রতি ভালোবাসার ঘোষণা; শোকের ভেতর দিয়ে জীবনের মূল্য উপলব্ধির কবিতা। কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত সরল ও সুরেলা, যেন গ্রামের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ গল্প বলছেন—এই সরলতাই এর শক্তি।
‘কবর’ কবিতার প্রথম বিস্ময় এর বয়স—জসীমউদ্দীন তখন মাত্র বাইশ বছরের তরুণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অথচ এই বয়সেই তিনি মৃত্যু ও শোকের এমন পরিণত রূপ দিলেন, যা পড়ে প্রখ্যাত পণ্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন মন্তব্য করেছিলেন, কবিতাটি পড়ে তিনি কেঁদেছেন। এই কবিতার শৈল্পিক সিদ্ধি হলো শোককে ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে সার্বজনীন অনুভূতিতে উন্নীত করা। দাদীর কবর একটি নির্দিষ্ট কবর, কিন্তু পাঠক প্রত্যেকেই সেখানে নিজের হারানো স্বজনকে দেখতে পান। কবিতার চিত্রকল্পগুলো গ্রামবাংলার অতি পরিচিত জগৎ থেকে নেওয়া—ডালিম-গাছ, ধানক্ষেত, পুকুরঘাট, সন্ধ্যার আজান—ফলে শোকের এই গাথা কোনো দূরবর্তী ভাবজগতের নয়, পাঠকের নিজের উঠোনের গল্প হয়ে ওঠে। ছন্দের দিক থেকে কবিতাটি পয়ারে (অক্ষরবৃত্তে) রচিত; দীর্ঘ পংক্তির ধীর, শোকাতুর গতি শোকের ভার বহনে পুরোপুরি উপযুক্ত। পংক্তিগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়, কেউ ধীরে ধীরে কবরের পাশ দিয়ে হাঁটছেন আর কথা বলছেন—ছন্দ এখানে শুধু কৌশল নয়, ভাবেরই বাহন। কবিতাটির আরেকটি গভীর দিক এর মৃত্যুদর্শন। গ্রামীণ মুসলিম জীবনবোধে মৃত্যু শেষ নয়; কবরস্থান ভয়ের জায়গা নয়, বরং স্বজনদের সঙ্গে মিলনের স্থান। দাদীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নাতির মনে ভয় নেই, আছে স্নেহ ও কৃতজ্ঞতা। এই দৃষ্টিভঙ্গি কবিতাটিকে শুধু শোকগাথা থেকে উন্নীত করে জীবনদর্শনের কবিতায় পরিণত করেছে। উল্লেখ্য, এই কবিতা প্রকাশের আগেই—কবি যখন একাদশ শ্রেণির ছাত্র—তখনই এটি প্রবেশিকা পরীক্ষার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। একজন জীবিত তরুণ কবির রচনা পাঠ্যবইয়ে স্থান পাওয়া প্রমাণ করে, কবিতাটি কত দ্রুত ও কত গভীরভাবে বাঙালি মানসকে স্পর্শ করেছিল। আজও ‘কবর’ স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পড়ানো হয়, আবৃত্তি-প্রতিযোগিতায় এটি সবচেয়ে বেশি নির্বাচিত কবিতাগুলোর একটি। এর কারণ, কবিতাটি মৃত্যুকে যেভাবে দেখায়—ভয় নয়, স্মৃতি; শেষ নয়, স্নেহের ধারাবাহিকতা—তা প্রতিটি মানুষেরই অভিজ্ঞতা। দাদীর কবরে দাঁড়ানো নাতি আসলে প্রতিটি পাঠক; আর ডালিম-গাছের তলার সেই কবর আসলে আমাদের সবার হারানো স্বজনদের ঠিকানা। কবিতাটির ভাষা-শৈলীর আরেকটি দিক লক্ষণীয়—জসীমউদ্দীন এখানে কোনো কঠিন তৎসম শব্দের আশ্রয় নেননি; তাঁর শব্দভাণ্ডার গ্রামের মানুষের মুখের ভাষা। এই কারণে কবিতাটি পড়তে কোনো অভিধান লাগে না, অথচ এর ভাবগভীরতা কোনো দুরূহ কবিতার চেয়ে কম নয়। সরল ভাষায় গভীর ভাব—এই সমন্বয়ই জসীমউদ্দীনের স্বাক্ষর-শৈলী। কবিতাটির ছন্দোময়তা আবৃত্তি-শিল্পীদের কাছে একে অমর করেছে; ‘এইখানে তোর দাদীর কবর’ পংক্তিটি উচ্চারিত হওয়ামাত্র শ্রোতারা নীরব হয়ে যান—এমন অভিজ্ঞতা প্রজন্মের পর প্রজন্মের। শেষ বিচারে ‘কবর’ শেখায়, মৃত্যুকে জয় করা যায় না, কিন্তু স্মৃতি ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে সহনীয় করা যায়; আর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যে শপথ নেওয়া হয়, তাই জীবনের সার্থকতা।
মৃত্যু ও শোক, স্মৃতি, পারিবারিক স্নেহ, গ্রামবাংলা
পয়ার ছন্দে (অক্ষরবৃত্তে) রচিত দীর্ঘ শোকগাথা; ধীর ও শোকাতুর লয়। প্রথম-পুরুষ কথকের (নাতির) কণ্ঠে বর্ণনা, যা পাঠককে ঘটনার অংশীদার করে। চিত্রকল্প গ্রামবাংলার দৈনন্দিন জগৎ থেকে নেওয়া—ডালিম-গাছ, ধানক্ষেত, পুকুরঘাট—ফলে শোক হয় অতি পরিচিত ও স্পর্শকাতর। ভাষা সরল, সুরেলা ও গদ্যঘেঁষা; অলংকারের চেয়ে অনুভূতির সততাই প্রধান। স্মৃতিচারণামূলক কাঠামো: বর্তমানের কবর থেকে অতীতের জীবনে যাওয়া-আসা কবিতাটিকে একটি চলমান স্মৃতির নদীতে পরিণত করেছে। শেষাংশে শপথের সুর কবিতাটিকে শুধু শোক থেকে উন্নীত করে অঙ্গীকারের কবিতায় রূপ দেয়।
১৯২৫ সাল—‘কল্লোল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ঢেউ উঠছে; নগরজীবন, মনোবিশ্লেষণ, ইউরোপীয় প্রভাব তরুণ লেখকদের মুগ্ধ করছে। এই সময়ে জসীমউদ্দীন সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটলেন—তিনি তুলে ধরলেন গ্রামবাংলার মাটি, পল্লীজীবনের সুখ-দুঃখ। ‘কবর’ প্রকাশের পর ‘কল্লোল’-এর আধুনিকতার স্রোতের মধ্যেও পল্লীসাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা পায়। উল্লেখ্য, কবিতাটি যখন প্রকাশিত হয়, জসীমউদ্দীন তখনো ছাত্র; অথচ রচনার পরপরই এটি প্রবেশিকা শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে স্থান পায়—জীবিত কবির ক্ষেত্রে যা ছিল অভূতপূর্ব। ১৯২৭ সালে ‘রাখালী’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হওয়ার পর কবিতাটির খ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ে। এই কবিতাই জসীমউদ্দীনকে ‘পল্লীকবি’ উপাধির পথে এগিয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে, আধুনিকতার যুগেও গ্রামের মাটির গল্প পাঠকের হৃদয় জয় করতে পারে।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”