ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
কালিদাস রায়ের ‘ছাত্রধারা’ — বিদ্যামঠের ছাত্রদের আসা-যাওয়ার চিরন্তন ধারার স্মৃতিমেদুর কবিতা। বর্ষে বর্ষে দলে দলে ছাত্র আসে, কলরবে চলে যায় — শিক্ষকের চোখে দেখা এই প্রবহমানতার গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠ্যপুস্তকে পড়া হয়েছে।
বর্ষে বর্ষে দলে দলে আসে বিদ্যামঠতলে,
চলে যায় তারা কলরবে,— কালিদাস রায়, ‘ছাত্রধারা’ থেকে উদ্ধৃত
স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।
'ছাত্রধারা' কবিতায় কবি বিদ্যামঠের একটি চিরন্তন দৃশ্য আঁকেন — বর্ষে বর্ষে দলে দলে ছাত্ররা আসে বিদ্যামঠতলে, আবার কলরবে চলে যায়। আসা-যাওয়ার এই ধারা কখনো থামে না; প্রতিটি প্রজন্ম আসে, শেখে, বড়ো হয়, চলে যায় — আর বিদ্যামঠ দাঁড়িয়ে থাকে সাক্ষী হয়ে। কবিতাটি শিক্ষা-জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও স্মৃতির মাধুর্যের গান — শিক্ষকের দৃষ্টিতে ছাত্রদের এই প্রবাহ একই সঙ্গে আনন্দের ও বিষাদের। পাঠ্যপুস্তকে সংকলিত হয়ে কবিতাটি প্রজন্মের পর প্রজন্মের ছাত্র-শিক্ষকের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে আছে।
কালিদাস রায় রবীন্দ্র-সমসাময়িক কবি ও শিক্ষাবিদ — দীর্ঘ শিক্ষক-জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে 'ছাত্রধারা'র জন্ম। কবিতার কেন্দ্রীয় প্রতীক 'ধারা' — প্রবহমানতা। নদীর ধারার মতো ছাত্রদের এই আসা-যাওয়া; কবি এখানে হেরাক্লিটাসের দর্শনের কাছাকাছি পৌঁছান — একই নদীতে দুবার নামা যায় না, একই বিদ্যামঠে দুবার একই ছাত্রদল ফেরে না। 'বর্ষে বর্ষে দলে দলে আসে বিদ্যামঠতলে, চলে যায় তারা কলরবে' — পংক্তিটির ছন্দেই ধারার তাল; 'কলরবে' শব্দে যৌবনের উচ্ছ্বাস, আর সেই উচ্ছ্বাসের ক্ষণস্থায়িত্বের বিষাদ একসঙ্গে। কবিতাটির সার্বজনীন আবেদনের রহস্য এখানেই — প্রতিটি শিক্ষক এই দৃশ্য দেখেছেন, প্রতিটি ছাত্র এই ধারার অংশ হয়েছেন। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের জীবনচক্রের এই সত্য কোনো তত্ত্বে নয়, একটি চিত্রে ধরা পড়েছে। কালিদাস রায়ের ভাষা সরল, অলঙ্কার-বর্জিত — কিন্তু ভাব গভীর; এই সরলতাই কবিতাটিকে পাঠ্যপুস্তকের উপযোগী করেছে, আর পাঠ্যপুস্তকই কবিতাটিকে অমর করেছে। লক্ষণীয়, কবি ছাত্রদের চলে যাওয়ায় শোক করেন না; 'ধারা' শব্দেই স্বীকৃতি — যাওয়া-আসাই নিয়ম, আর এই নিয়মেই জীবনের সৌন্দর্য। স্মৃতিমেদুরতা এখানে নিষ্ক্রিয় নস্টালজিয়া নয়; বর্তমানকে মমতায় দেখার দৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজস্ব স্বর খোঁজা কবিদের মধ্যে কালিদাস রায়ের এই কবিতা দেখায় — সরলতম বিষয়েও গভীরতম কবিতা সম্ভব, যদি দৃষ্টিতে মমতা থাকে। স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে দেওয়া হয়নি; উদ্ধৃত পংক্তিদ্বয় কবিতার সারসংক্ষেপের মতো। কালিদাস রায়ের কাব্যজীবনে 'ছাত্রধারা' একটি মাইলফলক — রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যখন নিজস্ব স্বর খুঁজছিলেন, এই কবিতায় তা পূর্ণতা পায়। তাঁর অন্যান্য কবিতা — 'সন্ধ্যা', 'বর্ষা' — প্রকৃতি-বিষয়ক হলেও 'ছাত্রধারা'র মতো সর্বজনীনতা পায়নি; কারণ 'ছাত্রধারা'র বিষয় প্রত্যেকের জীবনের অংশ। শিক্ষক-কবির ঐতিহ্য বাংলায় দীর্ঘ — ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে অনেক কবিই শিক্ষক ছিলেন; কিন্তু শিক্ষকতাকেই কবিতার বিষয় করা বিরল। কালিদাস রায় সেই বিরল কাজটি করেছেন — শ্রেণীকক্ষের জানালা দিয়ে দেখা জীবনকে কবিতায় ধরেছেন। 'ধারা' দর্শনের আরও একটি মাত্রা: বৌদ্ধ-দর্শনের 'অনিত্য'বাদ — সবকিছু প্রবহমান; কবি এই দর্শনকে শোক নয়, মমতায় গ্রহণ করেন। ছাত্ররা চলে যায় — এটাই স্বাভাবিক, এটাই সুন্দর। এই গ্রহণযোগ্যতাই 'ছাত্রধারা'কে শুধু স্মৃতিমেদুর নয়, প্রজ্ঞাময় করে তোলে। বর্ষে বর্ষে ধারা বইবে — আর কবিতাটি সেই ধারার তীরে দাঁড়িয়ে থাকবে।
শিক্ষা, সময় ও প্রবাহ, স্মৃতি
'ধারা' — প্রবহমানতার কেন্দ্রীয় প্রতীক। 'বর্ষে বর্ষে দলে দলে' — পুনরাবৃত্তিতে চক্রাকার সময়ের অনুভূতি। সরল, অলঙ্কার-বর্জিত ভাষায় গভীর দার্শনিক ভাব। শিক্ষকের দৃষ্টিকোণ — বিরল কাব্যিক অবস্থান।
কালিদাস রায় (১৮৮৯–১৯৭৫) — রবীন্দ্র-সমসাময়িক কবি ও শিক্ষাবিদ। 'ছাত্রধারা' পাঠ্যপুস্তকে সংকলিত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠকের কাছে পৌঁছায়। সুনির্দিষ্ট প্রকাশসাল অজ্ঞাত।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”