মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে দয়াহীন সংসারে—
তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালোবাসো— অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।
বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।

আমি যে দেখেছি, গোপন হিংসা কপট রাত্রি-ছায়ে হেনেছে নিঃসহায়ে।
আমি যে দেখেছি, প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমি যে দেখি, তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।

কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা, অমাবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে; তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে—
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

পৌষ ১৩৩৮

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবি বলেন — ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠিয়েছ দয়াহীন সংসারে; তারা বলে গেল 'ক্ষমা করো সবে', বলে গেল 'ভালোবাসো — অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো'। তারা বরণীয়, স্মরণীয় — তবু আজ দুর্দিনে তাদের ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিতে হয়। কারণ কবি নিজে দেখেছেন: গোপন হিংসা কপট রাত্রি-ছায়ে নিঃসহায়কে হেনেছে; প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে; তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে কী যন্ত্রণায় পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে মরেছে। তাই আজ কবির কণ্ঠ রুদ্ধ, বাঁশি সংগীতহারা; অমাবস্যার কারা দুঃস্বপনের তলে লুপ্ত করেছে তাঁর ভুবন। এই অন্ধকার থেকে অশ্রুজলে কবির প্রশ্ন — যারা তোমার বায়ু বিষিয়েছে, তোমার আলো নিভিয়েছে, তুমি কি তাদের ক্ষমা করেছ, তুমি কি তাদের ভালোবেসেছ? পৌষ ১৩৩৮।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

'প্রশ্ন' কবিতার শক্তি এর সরলতায় — তিনটি স্তবক, একটি মাত্র প্রশ্ন, কিন্তু তার ভেতরে ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা: সর্বশক্তিমান ও করুণাময় ঈশ্বরের জগতে অন্যায় কেন? রবীন্দ্রনাথ এই সমস্যাকে দার্শনিক তর্কে না নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যে দাঁড় করান — 'আমি যে দেখেছি'র তিনবার পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে এজলাসের সাক্ষ্যবাণীতে রূপ দেয়। লক্ষণীয়, কবি ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন না; তিনি ঈশ্বরের ন্যায়বিচার দাবি করছেন। 'তারা বলে গেল ক্ষমা করো সবে' — দূতদের বাণীকে কবি অসম্মান করছেন না, কিন্তু 'ব্যর্থ নমস্কারে' ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে আছে যুগের বাস্তবতার স্বীকৃতি: উপদেশে যখন বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে, তখন নমস্কার ব্যর্থ হতে বাধ্য। দ্বিতীয় স্তবকের তিনটি দৃশ্য — গোপন হিংসায় নিঃসহায়ের হত্যা, শক্তের অপরাধে বিচারের নীরব কান্না, তরুণ বালকের পাথরে মাথা কুটে মরা — প্রতিটি দৃশ্যেই অন্যায়ের শিকার নিরপরাধ, আর অন্যায়কারী অপ্রতিহত। এই নির্বাচন কবির প্রশ্নকে নৈতিকভাবে অকাট্য করে। শেষ প্রশ্নটি দ্বিমুখী — 'তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ' — ক্ষমা যদি করেই থাকো, তবে সে ক্ষমা কি দুর্বলতা নয়? আর 'তুমি কি বেসেছ ভালো' — ভালোবাসা যদি অন্যায়কারীকেও জড়ায়, তবে ন্যায়ের অর্থ কী? কবি উত্তর দেন না; 'অশ্রুজলে' প্রশ্ন রেখে কবিতা শেষ হয়। এই অনুত্তরই কবিতার উত্তর — পাঠককে নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড় করানো। 'পরিশেষ' পর্বের (১৯৩২) রবীন্দ্রনাথ — জীবনসায়াহ্নের কবি — এখানে ভক্তির ভরসা ছেড়ে প্রশ্নের সাহস ধরেছেন। গদ্যছন্দের সংযত চালে, পৌষ ১৩৩৮ তারিখাঙ্কনে, কবিতাটি হয়ে উঠেছে যুগের বিবেকের দলিল। 'পরিশেষ' কাব্যে এই প্রশ্ন একা নয় — 'শেষের কবিতা' নয়, এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ বারবার ফিরেছেন মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও ঈশ্বরের প্রশ্নে; 'প্রশ্ন' সেই ধারার সবচেয়ে তীক্ষ্ম প্রকাশ। লক্ষণীয়, কবি এখানে ভক্ত নন, বাদী — ঈশ্বরের দরবারে তিনি ফরিয়াদি। বাংলা ভক্তি-সাহিত্যে ঈশ্বরের কাছে অভিমান নতুন নয় (বৈষ্ণব পদে আছে), কিন্তু এমন নৈতিক কৈফিয়ত-তলব অভূতপূর্ব। কবিতাটির আবৃত্তি-জনপ্রিয়তাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে — প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি এই কবিতা আবৃত্তি করে, কারণ প্রতিটি যুগেই অন্যায় দেখে মানুষের মনে এই প্রশ্ন জাগে। 'যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু' — পরিবেশ-দূষণের যুগে এই পংক্তি আক্ষরিক অর্থও পেয়েছে। কবিতার শেষে কোনো সান্ত্বনা নেই, কোনো উত্তর নেই — শুধু অশ্রুজল। এই অসমাপ্তিই 'প্রশ্ন'কে সমাপ্ত কবিতা করে তোলে; পাঠক নিজের ভেতরে উত্তর খুঁজতে বাধ্য হয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

ঈশ্বর ও ন্যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ, মানবিক প্রশ্ন

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

তিন স্তবকের সংহত গঠন; 'আমি যে দেখেছি'র পুনরাবৃত্তিতে সাক্ষ্য-ভঙ্গি। প্রশ্নবোধক সমাপ্তি — অনুত্তরেই কবিতার শক্তি। গদ্যছন্দের সংযত, গম্ভীর চাল। বিমূর্ত দর্শনকে তিনটি মর্মস্পর্শী দৃশ্যে রূপায়ণ। শেষে তারিখাঙ্কন (পৌষ ১৩৩৮)।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

১৯৩২ সালে 'পরিশেষ' কাব্যে প্রকাশিত। তিরিশের দশকের বিশ্ব — অর্থনৈতিক মন্দা, ফ্যাসিবাদের উত্থান, ঔপনিবেশিক দমন — এই পটভূমিতে রচিত কবিতাটি কবির জীবনসায়াহ্নের নৈতিক উদ্বেগের প্রকাশ। 'পরিশেষ' পর্বে রবীন্দ্রনাথ বারবার ঈশ্বর, মৃত্যু ও ন্যায়ের প্রশ্নে ফিরেছেন।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।