ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
কিনু গোয়ালার গলি।
দোতলা বাড়ির
লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর
পথের ধারেই।
লোনা-ধরা দেওয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,
মাঝে মাঝে স্যাঁতা-পড়া দাগ।
মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি
সিদ্ধিদাতা গণেশের
দরজার ‘পরে আঁটা।
আমি ছাড়া ঘরে থাকে আরেকটা জীব
এক ভাড়াতেই,
সেটা টিকটিকি।
তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,
নেই তার অন্নের অভাব।
বেতন পঁচিশ টাকা,
সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।
খেতে পাই দত্তদের বাড়ি
ছেলেকে পড়িয়ে।
শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,
সন্ধেটা কাটিয়ে আসি,
আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।
এঞ্জিনের ধস্ ধস্,
বাঁশির আওয়াজ,
যাত্রীর ব্যস্ততা,
কুলি-হাঁকাহাঁকি।
সাড়ে দশ বেজে যায়,
তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার।
ধলেশ্বরীনদীতীরে পিসিদের গ্রাম।
তাঁর দেওরের মেয়ে,
অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।
লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল–
সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।
মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,
আমি তথৈবচ।
ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসাযাওয়া–
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।
বর্ষা ঘন ঘোর।
ট্রামের খরচা বাড়ে,
মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।
গলিটার কোণে কোণে
জমে ওঠে পচে ওঠে
আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,
মাছের কান্কা,
মরা বেড়ালের ছানা,
ছাইপাঁশ আরো কত কী যে!
ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া
মাইনের মতো,
বহু ছিদ্র তার।
আপিসের সাজ
গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,
সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।
বাদলের কালো ছায়া
স্যাঁৎসেঁতে ঘরটাতে ঢুকে
কলে-পড়া জন্তুর মতন
মূর্ছায় অসাড়।
দিন রাত মনে হয়, কোন্ আধমরা
জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।
গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু,
যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,
বড়ো বড়ো চোখ,
শৌখিন মেজাজ।
কর্নেট বাজানো তার শখ।
মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে
এ গলির বীভৎস বাতাসে–
কখনো গভীর রাতে,
ভোরবেলা আধো অন্ধকারে,
কখনো বৈকালে, ঝিকিমিকি আলোয় ছায়ায়।
হঠাৎ সন্ধ্যায়, সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,
সমস্ত আকাশে বাজে, অনাদি কালের বিরহবেদনা।
তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে
এ গলিটা ঘোর মিছে,
দুর্বিষহ, মাতালের প্রলাপের মতো।
হঠাৎ খবর পাই মনে
আকবর বাদশার সঙ্গে
হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।
বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে
ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে
এক বৈকুণ্ঠের দিকে।
এ গান যেখানে সত্য
অনন্ত গোধূলিলগ্নে
সেইখানে
বহি চলে ধলেশ্বরী;
তীরে তমালের ঘন ছায়া;
আঙিনাতে
যে আছে অপেক্ষা ক’রে, তার
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।
কিনু গোয়ালার গলি — দোতলা বাড়ির লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর, পথের ধারেই। লোনা-ধরা দেওয়াল, স্যাঁতা-পড়া দাগ; দরজার ওপরে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি। ঘরে থাকে কবি আর একটা টিকটিকি — 'তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু, নেই তার অন্নের অভাব।' বেতন পঁচিশ টাকা — সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি; দত্তদের বাড়ি ছেলে পড়িয়ে খাওয়া; সন্ধ্যায় শেয়ালদা ইস্টিশনে গিয়ে আলো জ্বালাবার দায় বাঁচানো। ধলেশ্বরীনদীতীরে পিসিদের গ্রামে তার বিবাহ ঠিক ছিল — 'লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল — সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।' মেয়েটি ঘরে এল না, কিন্তু মনে তার নিত্য আসাযাওয়া — 'পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।' গলির মোড়ে থাকে কান্তবাবু — কর্নেট বাজানো তার শখ। মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে এ গলির বীভৎস বাতাসে; হঠাৎ সন্ধ্যায় সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান — 'সমস্ত আকাশে বাজে, অনাদি কালের বিরহবেদনা।' তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে এ গলিটা ঘোর মিছে, দুর্বিষহ; হঠাৎ খবর পাই মনে — 'আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।' বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে ছেঁড়াছাতা আর রাজছত্র মিলে চলে গেছে এক বৈকুণ্ঠের দিকে — এ গান যেখানে সত্য, অনন্ত গোধূলিলগ্নে সেইখানে বয়ে চলে ধলেশ্বরী; তীরে তমালের ঘন ছায়া; আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা করে, তার পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।
'বাঁশি'র প্রথমার্ধ বাংলা কবিতায় নিম্নমধ্যবিত্ত শহুরে জীবনের সবচেয়ে নিখুঁত দলিলগুলির একটি। রবীন্দ্রনাথ এখানে রোমান্টিক কবি নন; তিনি প্রায় সমাজতাত্ত্বিকের নিরাসক্ত চোখে দেখছেন — লোনা-ধরা দেওয়াল, মাইনেকাটা বর্ষা, গলির কোণে জমে-ওঠা আমের খোসা-আঁঠি-মাছের কানকা-মরা বেড়ালের ছানা, 'জরিমানা-দেওয়া মাইনের মতো' বহুছিদ্র ছাতা। এই তালিকা শুধু বর্ণনা নয়; প্রতিটি বস্তুই দারিদ্র্যের সাক্ষ্য। টিকটিকির সঙ্গে তুলনা — 'নেই তার অন্নের অভাব' — হাস্যরসের আড়ালে তীব্র আত্ম-বিদ্রূপ; মানুষ প্রাণীজগতের সবচেয়ে অসহায় সদস্য হয়ে উঠেছে এখানে। কিন্তু কবিতার মোড় ঘোরে কান্তবাবুর কর্নেটে। সুর এখানে শুধু বিনোদন নয়; মুক্তির মাধ্যম। 'সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান, সমস্ত আকাশে বাজে, অনাদি কালের বিরহবেদনা' — ব্যক্তির দুঃখ মুহূর্তে সার্বজনীন বেদনায় রূপ নেয়। আর তারপর সেই অবিস্মরণীয় উপলব্ধি: 'আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।' সুরের জগতে সামাজিক স্তরভেদ মুছে যায় — বাদশা ও কেরানি একই বিরহের অংশীদার। এটি রবীন্দ্রনাথের গভীর গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের কাব্যিক ঘোষণা। শেষ স্তবকের স্বপ্ন-দৃশ্য — অনন্ত গোধূলিলগ্ন, ধলেশ্বরীর তীরে তমালছায়া, আঙিনায় অপেক্ষমানা নারী — 'পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর' পংক্তির পুনরাবৃত্তিতে বাস্তবের অপ্রাপ্তি স্বপ্নে পূর্ণতা পায়। লক্ষণীয়, কবি পালিয়ে-আসা বরের অপরাধবোধকে কখনো লঘু করেন না; স্বপ্ন তাই ক্ষমারও — যে মেয়েটিকে সে ফেলে এসেছে, স্বপ্নে সে-ই অপেক্ষা করে। গদ্যছন্দের মুক্ত চালে, চিত্রের পর চিত্র সাজিয়ে, 'বাঁশি' প্রমাণ করে — দারিদ্র্যের কবিতাও মহৎ হতে পারে, যদি তাতে মানুষের মর্যাদা থাকে। কান্তবাবু চরিত্রটি বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে — 'যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শৌখিন মেজাজ' — গলির বীভৎসতার মধ্যে এই শৌখিনতা অসংগত নয়; বরং প্রমাণ করে, সৌন্দর্য-তৃষ্ণা দারিদ্র্যেও মরে না। কর্নেট — পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র — বাঙালি গলিতে বেজে ওঠে, আর তাতে লাগে 'সিন্ধু-বারোয়াঁ'র তান — প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের এই সংগমেই রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক দৃষ্টি। 'পুনশ্চ' পর্বে এমন শহুরে কবিতা আরও আছে, কিন্তু 'বাঁশি'র মতো এমন পূর্ণাঙ্গ জীবন-চিত্র বিরল। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের ('দেনাপাওনা', 'পোস্টমাস্টার') দরিদ্র চরিত্রদের সঙ্গে এই কেরানির আত্মীয়তা — কিন্তু গল্পে যা বর্ণনা, কবিতায় তা উপলব্ধি। 'পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর' — এই পংক্তির দুবার আবির্ভাব কবিতার গঠন-কৌশল: প্রথমবার স্মৃতি, দ্বিতীয়বার স্বপ্ন; মাঝখানে সুরের সেতু। পাঠক বুঝতে পারে — যে মেয়েকে সে ফেলে এসেছে, তার প্রতি অপরাধবোধই এই স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে।
শহুরে দারিদ্র্য, সুর ও মুক্তি, স্বপ্ন
গদ্যকবিতায় শহুরে বাস্তবতার চিত্রমালা — বস্তুর তালিকায় দারিদ্র্যের দলিল। টিকটিকি-তুলনায় আত্ম-বিদ্রূপের হাস্যরস। কর্নেটের সুরে ভাবের মোড় — বাস্তব থেকে অধিবাস্তবে উত্তরণ। 'আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই' — সাম্যের ঘোষণা। 'পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর' পংক্তির পুনরাবৃত্তিতে স্বপ্ন-পূর্ণতা।
১৯৩২ সালে 'পুনশ্চ' কাব্যে প্রকাশিত। তিরিশের দশকের কলকাতা — অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, নিম্নমধ্যবিত্তের সংকট — এই পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথ শহুরে দরিদ্রের জীবনে কবিতার বিষয় খুঁজেছেন। 'পুনশ্চ' পর্বে তাঁর দৃষ্টি প্রাসাদ থেকে গলির দিকে নেমে এসেছে।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”