মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

আমরা সিঁড়ি,
তোমরা আমাদের মাড়িয়ে
প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,
তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে;
তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক
পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন।
তোমরাও তা জানো,
তাই কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত
ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে
আর চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে
তোমাদের গর্বোদ্ধত, অত্যাচারী পদধ্বনি।

তবুও আমরা জানি,
চিরকাল আর পৃথিবীর কাছে
চাপা থাকবে না।
আমাদের দেহে তোমাদের এই পদাঘাত।
আর সম্রাট হুমায়ুনের মতো
একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন।।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবিতার বক্তা সিঁড়ি নিজে। সে বলছে—তোমরা (সুবিধাভোগী, শোষক শ্রেণি) প্রতিদিন আমাদের মাড়িয়ে অনেক উঁচুতে উঠে যাও, আর ওপরে উঠে পেছনের দিকে ফিরেও তাকাও না। তোমাদের পদধূলিতে ধন্য আমাদের বুক প্রতিদিন পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়। তোমরা তা জানো বলেই কার্পেট দিয়ে আমাদের বুকের ক্ষত ঢেকে রাখতে চাও—ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্ন, চেপে রাখতে চাও তোমাদের গর্বোদ্ধত পদধ্বনি। কিন্তু সিঁড়ি জানে, এই পদাঘাত চিরকাল চাপা থাকবে না। শেষে সতর্কবাণী—সম্রাট হুমায়ুনের মতো একদিন তোমাদেরও পদস্খলন হতে পারে। অর্থাৎ শোষিতের ধৈর্যের সীমা আছে; ইতিহাসের চাকা ঘুরলে শোষকের পতন অনিবার্য।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘সিঁড়ি’ কবিতার প্রথম বিস্ময় এর বক্তা-নির্বাচনে। কথা বলছে একটি জড়বস্তু—সিঁড়ি—প্রথম পুরুষ বহুবচনে, ‘আমরা সিঁড়ি’। এই ‘আমরা’ই কবিতার রাজনীতি: সিঁড়ি একা নয়, সে কোটি কোটি শোষিত মানুষের প্রতিনিধি, যাদের পিঠে পা রেখে সমাজের উঁচুতলার মানুষ প্রতিদিন ওপরে ওঠে। সুকান্তের মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি এখানে কোনো তত্ত্বকথায় নয়, একটি ঘরোয়া বস্তুর রূপকে জীবন্ত—এটাই তার কবিত্বের বিশেষত্ব। ‘তোমরা আমাদের মাড়িয়ে প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও’—‘মাড়িয়ে’ ক্রিয়াপদটি শারীরিক, প্রায় হিংস্র; শোষণ এখানে বিমূর্ত অন্যায় নয়, পায়ের চাপে পিষ্ট হওয়ার যন্ত্রণা। আর ‘তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে’—এই এক পংক্তিতে শোষকের নৈতিক অন্ধত্ব ও অকৃতজ্ঞতার পূর্ণ চিত্র। কবিতার মাঝামাঝি অংশে ‘কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত’—এই চিত্রকল্পটি অসাধারণ। কার্পেট বিলাসের প্রতীক; শোষক শ্রেণি নিজেদের বিলাস দিয়েই শোষণের ক্ষত ঢাকতে চায়—দান-খয়রাত, সংস্কার, মিথ্যা সহানুভূতির কার্পেট। ‘ঢেকে রাখতে চাও’ ক্রিয়ার তিনবার পুনরাবৃত্তি (‘বুকের ক্ষত’, ‘অত্যাচারের চিহ্ন’, ‘গর্বোদ্ধত পদধ্বনি’) শোষকের সচেতন অপরাধবোধকেই প্রমাণ করে—তারা জানে তারা কী করছে, ‘তোমরাও তা জানো’। শেষ স্তবকের ভঙ্গি বদলে যায়—বেদনা থেকে সতর্কবাণীতে। ‘সম্রাট হুমায়ুনের মতো’—ইতিহাসের এই উল্লেখ কাকতালীয় নয়; হুমায়ুন পতন হয়েছিলেন সিঁড়ি থেকে পড়ে, নিজের গ্রন্থাগারের সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে। যে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিল ক্ষমতার চূড়ায়, সেই সিঁড়িই হলো পতনের কারণ—এর চেয়ে নিখুঁত ঐতিহাসিক রূপক আর কী হতে পারে! ‘একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন’—এখানে ‘পদস্খলন’ শব্দের দ্ব্যর্থতা লক্ষণীয়: আক্ষরিক পা-পিছলে যাওয়া এবং রূপকার্থে নৈতিক-রাজনৈতিক পতন। কবিতাটি মুক্তছন্দে, গদ্যের কাছাকাছি ভাষায় রচিত; কোনো অলংকারের আড়ম্বর নেই, আছে সরাসরি আঘাত। ১৯৪৩-৪৭ সালে, মৃত্যুর ঠিক আগে রোগশয্যায় বসে একুশ বছরের এই কবি যে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি দেখিয়েছিলেন, তা বিস্ময়কর। ‘ছাড়পত্র’ কাব্যের অন্যান্য কবিতার মতো এটিও প্রমাণ করে—সুকান্তের কবিতা শুধু আবেগের নয়, ইতিহাস-সচেতন বিশ্লেষণেরও ফসল। আজ, প্রায় আশি বছর পরেও, শ্রমিক-কৃষকের মিছিলে, ছাত্র আন্দোলনে এই কবিতা পাঠ হয়—কারণ সিঁড়ি এখনো আছে, আর সিঁড়ি বেয়ে ওঠার লোকও আছে। কবিতাটির আরেকটি দিক হলো এর সর্বজনীনতা। সিঁড়ি শুধু ধনী-গরিবের রূপক নয়—অফিসের নিচুতলার কর্মচারী, বাসার গৃহকর্মী, কারখানার শ্রমিক—সবাই কোনো না কোনোভাবে ‘সিঁড়ি’। প্রতিদিন তাদের মাড়িয়ে কেউ না কেউ ওপরে ওঠে। তাই এই কবিতা শুধু ১৯৪৭ সালের নয়, প্রতিটি যুগের। আবৃত্তিশিল্পীদের কণ্ঠে ‘তবুও আমরা জানি’ পংক্তিটি যখন ধ্বনিত হয়, শ্রোতারা নিজেদের মধ্যেই সেই ‘আমরা’কে খুঁজে পান। ‘ছাড়পত্র’ কাব্যের অন্যান্য কবিতা—‘রানার’, ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘হে মহাজীবন’—যেমন সরাসরি সংগ্রামের ডাক দেয়, ‘সিঁড়ি’ তেমনি নীরব সহ্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা বিস্ফোরণের কথা বলে। দুটি ধারা মিলেই সুকান্তের বিপ্লবী কবিত্ব সম্পূর্ণ হয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

শোষণ, শ্রেণিবৈষম্য, বিপ্লবচেতনা, মানবমর্যাদা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি মুক্তছন্দে রচিত, ভাষা গদ্যঘেঁষা ও সরাসরি। প্রধান অলংকার রূপক ও মানবীকরণ (personification)—জড় সিঁড়ি প্রথম পুরুষে কথা বলে শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। ‘ঢেকে রাখতে চাও’-এর ত্রিবার পুনরাবৃত্তি (anaphora) শোষকের সচেতন অপরাধ ঢাকার প্রয়াসকে তীব্র করে। ইতিহাস-রূপকের ব্যবহার (‘সম্রাট হুমায়ুন’) কবিতাকে সমকাল ছাড়িয়ে সার্বজনীন সত্যে উন্নীত করেছে। ‘পদস্খলন’ শব্দে শ্লেষ—আক্ষরিক ও রূপকার্থের একসঙ্গে কাজ। সংলাপধর্মী সম্বোধন (‘তোমরা’) পাঠককে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় জানা যায়, ‘সিঁড়ি’ কবিতাটি সুকান্তের রোগশয্যায় লেখা—অসুস্থ অবস্থায় নিজের ঘরের সিঁড়ি দেখে শোষক-শোষিতের প্রতীক বানিয়ে তিনি এটি রচনা করেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে লেখা এই কবিতাগুলোতে তরুণ সুকান্তের কমিউনিস্ট চেতনা ও মানবমুক্তির স্বপ্ন প্রতিফলিত। ১৯৪৭ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সে তার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ‘ছাড়পত্র’ প্রকাশিত হয়। এই কবিতা সেই যুগসন্ধিরই ফসল—যেখানে পুরনো সমাজ ভাঙছে, নতুনের জন্ম হচ্ছে।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।