ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।
রানার! রানার!
জানা অজানার
বোঝা আজ তার কাঁধে,
বোঝাই জাহাজ রানার চ’লেছে চিঠি আর সংবাদে;
রানার চ’লেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,
আরো জোরে, আরো জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।
তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে সরে যায় বন,
আরো পথ, আরো পথ—বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ।
অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিটমিট ক’রে চায়
কেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায়।
কত গ্রাম, কত পথ যায় স’রে স’রে—
শহরে রানার যাবেই পৌছে ভোরে;
হাতে লণ্ঠন করে ঠঠন, জোনাকিরা দেয় আলো
মাভৈঃ, রানার, এখনো রাতের কালো।
এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছে ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌছে দিয়েছে ‘মেলে’
ক্লান্তশ্বাস ছুয়েছে আকাশ মাটী ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায় অভিমানে অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।
রানার! রানার!
এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?
রাত শেষ হ’য়ে সূর্য উঠবে কবে?
ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া,
পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,
রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,
দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে
কত চিঠি লেখে লোকে—
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কতো দুঃখে ও শোকে
এর দুঃখের চিঠি প’ড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে।
দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি,
এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি—
রানার! রানার! কি হবে এ বোঝা ব’য়ে?
কি হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে?
রানার! রানার! ভোর তো হ’য়েছে—আকাশ হ’য়েছে লাল,
আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?
রানার। গ্রামের রানার!
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ
ভীরুতা পিছনে ফেলে—
পৌঁছে দাও এ নতুন খবর
অগ্রগতির ‘মেলে’,
দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি,
নেই, দেরী নেই আর,
ছুটে চলল, ছুটে চলল, আরো বেগে
দুর্দম হে রানার।
রাতের বেলা ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজিয়ে ছুটে চলেছে রানার—খবরের বোঝা হাতে। রাত্রির পথে পথে সে চলে, কোনো নিষেধ মানে না; দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে, কারণ সে নিয়েছে নতুন খবর আনার কাজ। কবি বলেন, এই রানারের জীবনের দুঃখ-বেদনা কেউ জানে না; তার ঘামে ভেজা শরীর, তার ক্লান্ত পা—সবই অজ্ঞাত থেকে যায়। সে জানে না, তার বোঝায় করে আনা খবরের মধ্যে লুকিয়ে আছে নতুন দিনের বার্তা। কবিতার শেষে কবির ঘোষণা: এই রানারের হাতেই আসছে অগ্রগতির ‘মেল’, দেখা দেবে প্রভাত—দেরি নেই আর। অর্থাৎ অজ্ঞাত শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরেই আসবে নতুন যুগ; রানার এখানে শুধু ডাকপিয়ন নয়—সে বিপ্লবের দূত, ভবিষ্যতের বার্তাবাহক। রানার নিজে জানে না তার বোঝার মূল্য—এই অজ্ঞানতাই তাকে আরও মহান করে; ফলের আশা না করে শুধু কর্তব্য করে যাওয়াই তার ধর্ম।
‘রানার’ কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন সাধারণ ডাক-পিয়ন—যে রাতভর গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে চিঠি পৌঁছে দেয়। কিন্তু সুকান্ত এই সাধারণ মানুষটিকে রূপান্তরিত করেছেন মহাকাব্যিক প্রতীকে। ‘রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে’—শুরুর এই পংক্তিতেই ধ্বনি ও গতির মিলনে পাঠক যেন রানারের পায়ের শব্দ শুনতে পান। রাত এখানে শুধু সময় নয়—তা অন্ধকার যুগের প্রতীক; আর রানারের ছুটে চলা হলো সেই অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে যাত্রা। কবিতার মর্মস্পর্শী দিক হলো রানারের অজ্ঞাতত্ব: ‘কেউ জানে না তার জীবনের দুঃখ, কেউ জানে না তার বেদনা’—সমাজ যাদের শ্রমে চলে, তাদেরই কথা কেউ জানে না। এই বৈপরীত্য—মহান কাজ বনাম অজ্ঞাত জীবন—কবিতার মূল ট্র্যাজেডি ও মহিমা একসঙ্গে। কিন্তু কবি এই ট্র্যাজেডিতে থেমে থাকেননি; তিনি রানারকে দিয়েছেন ঐতিহাসিক মর্যাদা। রানার ‘জানে না’ যে সে নতুন খবর আনছে—এই অজ্ঞানতাই তাকে আরও মহৎ করে; সে ফলের আশা না করে শুধু কর্তব্য করে যায়, গীতার নিষ্কাম কর্মের মতো। শেষ স্তবকে ‘অগ্রগতির মেল’ ও ‘প্রভাত’-এর ঘোষণা কবিতাটিকে শুধু শ্রমিক-বন্দনা থেকে উন্নীত করে বিপ্লবের আগমনী-সংগীতে পরিণত করেছে। এখানে ‘মেল’ শব্দটি দ্ব্যর্থক—একদিকে ডাকের মেল (ডাকব্যাগ), অন্যদিকে মিলন—মানুষের মিলন, নতুন যুগের সঙ্গে পুরনো যুগের মিলন। ছন্দের দিক থেকে কবিতাটি মাত্রাবৃত্তে রচিত, দ্রুতলয়ে—যা দৌড়ের গতির সঙ্গে মিলে গেছে। পুনরাবৃত্তি (‘ছুটে চলল, ছুটে চলল’) গতির অনুভূতি বাড়ায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে গান হিসেবে এই কবিতা যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তা বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিরল—কবিতা ও গানের এই মিলন প্রমাণ করে, সত্যিকারের কবিতা সব মাধ্যমেই বাঁচে। মে দিবসের মিছিলে, শ্রমিক সমাবেশে আজও ‘রানার’ পাঠ করা হয়; কারণ প্রতিটি যুগেই আছেন অজ্ঞাত রানাররা—যাদের কাঁধে ভর করে এগিয়ে চলে সভ্যতা। রানার চরিত্রের বাস্তব ভিত্তিটিও মনে রাখা দরকার—ব্রিটিশ আমলে ডাক বিভাগে ‘রানার’ নামে এক শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন, যারা পায়ে হেঁটে বা দৌড়ে দূর-দূরান্তে ডাক পৌঁছে দিতেন; তাদের জীবন ছিল কঠোর ও অবহেলিত। সুকান্ত এই বাস্তব চরিত্রকেই কাব্যিক মর্যাদা দিয়েছেন—যা তার ‘জনগণের কবি’ পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ‘ঘণ্টা’র ধ্বনি কবিতায় একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে—তা শুধু রানারের আগমন ঘোষণা করে না; তা যেন নতুন যুগের আগমনী-ঘণ্টা। কবিতাটি যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গান হলো, তখন এর আবেদন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়—সুরের মাধ্যমে ‘রানার’ পৌঁছে যায় সেইসব মানুষের কাছে, যারা হয়তো কবিতা পড়েন না। এই রূপান্তর প্রমাণ করে, মহৎ কবিতা মাধ্যমের সীমানা মানে না। আজও শ্রমিক-দিবসের অনুষ্ঠানে, ছাত্র-আন্দোলনের মিছিলে ‘রানার’ পাঠ করা হয়—কারণ প্রতিটি সংগ্রামের পেছনেই থাকেন অজ্ঞাত রানাররা, যাদের নাম ইতিহাসে লেখা হয় না।
শ্রমের মর্যাদা, অজ্ঞাত শ্রমজীবী, আশাবাদ, নতুন যুগের আগমন, কর্তব্যনিষ্ঠা
কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত, দ্রুত ও ছন্দোময় লয়ে—যা রানারের দৌড়ের গতিকে ধ্বনিতে রূপ দিয়েছে। ‘ঝুম ঝুম্ ঘণ্টা’, ‘ছুটে চলল, ছুটে চলল’—এই ধ্বন্যাত্মক পুনরাবৃত্তি পাঠকের কানে রাতের পথের শব্দ এনে দেয়। রাত বনাম প্রভাত, অন্ধকার বনাম আলো—এই বৈপরীত্য কবিতার প্রতীকী কাঠামো তৈরি করেছে। রানার চরিত্রটি একই সঙ্গে বাস্তব (ডাকপিয়ন) ও প্রতীকী (বিপ্লবের দূত)—এই দ্বৈততাই কবিতার শৈল্পিক সাফল্য। ‘অগ্রগতির মেল’—এমন শ্লেষাত্মক শব্দপ্রয়োগে কবির ভাষাদক্ষতা ফুটে উঠেছে। কবিতার গঠন একটি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা অনুসরণ করে: শুরুতে দৃশ্য, মাঝে রানারের জীবন, শেষে ভবিষ্যৎ-ঘোষণা। ধ্বনির দিক থেকে ‘ঝুম ঝুম্’, ‘দিগন্ত থেকে দিগন্তে’—এই শব্দগুলোতে গতির অনুভূতি এতটাই প্রবল যে পাঠক চোখ বন্ধ করলেও রানারের দৌড় শুনতে পান। এই শ্রবণ-চিত্র কবিতাটির অনন্য সম্পদ।
১৯৪৭ সালে ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত এই কবিতা রচিত হয় এমন এক সময়ে, যখন ভারত স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে—কিন্তু দেশভাগের ছায়া ঘনিয়ে আসছে। সুকান্তের মনে ছিল নতুন যুগের স্বপ্ন; তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরেই আসবে সত্যিকারের মুক্তি। রানার—ডাক বিভাগের এই নিম্নপদস্থ কর্মচারী—ছিলেন সেই সাধারণ মানুষেরই প্রতিনিধি। উল্লেখ্য, এই কবিতা পরবর্তীকালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর ও কণ্ঠে গান হিসেবে অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে; সিনেমা ও মঞ্চে এর ব্যবহার কবিতাটিকে সাহিত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে গণসংস্কৃতির অংশ করে তোলে। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘রানার’ একটি প্রেরণার উৎস হিসেবে আজও পঠিত হয়। গান-রূপে এর বিস্তার কবিতাটিকে সাহিত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাঙালির গণসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে। প্রতিটি প্রজন্মের সংগ্রামেই নতুন নতুন রানারের আবির্ভাব ঘটে—তাই কবিতাটি কখনো পুরনো হয় না।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে প্রিয় ও বহুপঠিত কবিতাগুলোর একটি। ১৯৭১…”