মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে’ আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হ’ল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খর-পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

একখানি ছোট ক্ষেত আমি একেলা,
চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাত বেলা।
এ পারেতে ছোট ক্ষেত আমি একেলা।

গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোন দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙ্গে দু’ধারে,
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে!

ওগো তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে!
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে!
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুসি তারে দাও
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে!

যত চাও তত লও তরণী পরে।
আর আছে?—আর নাই, দিয়েছি ভরে’।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে’
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে
এখন আমারে লহ করুণা করে’!

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছােট সে তরী
আমারি সােনার ধানে গিয়েছে ভরি’।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি’,
যাহা ছিল নিয়ে গেল সােনার তরী।

ফাল্গুন, ১২৯৮।

কবিতার সারসংক্ষেপ

বর্ষার দিনে ভরা নদীর কূলে একা বসে আছেন কবি-কৃষক; চারদিকে ঘন মেঘ, কূলে কূলে বাঁকা জল। পাকা ধান কাটা সারা হয়ে গেছে—রাশি রাশি ভারা জমেছে ছোটো ক্ষেতে। এমন সময় গান গেয়ে একটি ছোটো তরী বেয়ে আসে মাঝি। কবি তাকে ডেকে বলেন, যেখানে খুশি যাও, যাকে খুশি দাও—শুধু আমার সোনার ধানটুকু নিয়ে যাও। মাঝি যত পারে তত ধান তরণীতে তোলে; একসময় তরী ধানে ভরে যায়। কিন্তু সেই ছোটো তরীতে কবির নিজের ওঠার আর ঠাঁই থাকে না। শেষে কবি একা পড়ে থাকেন শূন্য নদীতীরে, আর সোনার তরী ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার সারা জীবনের ফসল। এই কবিতার মূল বক্তব্য: মানুষের কর্ম ও সৃষ্টি থেকে যায়, কিন্তু মানুষ নিজে চলে যায়; মহাকাল কেবল সৃষ্টিকর্মকেই বহন করে নিয়ে যায়, স্রষ্টাকে নয়।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

‘সোনার তরী’ কবিতার প্রথম আকর্ষণ এর চিত্রময়তা—গগনে গরজে মেঘ, ভরা নদী ক্ষুরধারা, বাঁকা জলে ঘেরা ছোটো ক্ষেত—পাঠক যেন চোখের সামনে শিলাইদহের বর্ষার পদ্মা দেখতে পান। কিন্তু এই প্রাকৃতিক পটভূমি কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়; এটি কবিতার দার্শনিক বক্তব্যেরই বাহন। ভরা নদী এখানে মহাকালের স্রোতের প্রতীক, আর ছোটো তরীটি সেই স্রোতে ভাসমান ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিমা। সোনার ধান হলো মানুষের সারা জীবনের কর্মফল—কবির ক্ষেত্রে তার সৃষ্টি, কাব্য, সাধনা। মাঝি যেন মহাকালেরই দূত, যে এসে ফসল তুলে নিয়ে যায় কিন্তু ফসল-উৎপাদককে নেয় না। কবিতার শেষ স্তবকে ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’—এই আর্তি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী পংক্তিগুলোর একটি; এখানে ব্যক্তিগত বেদনা সার্বজনীন সত্যে রূপ নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজে এই কবিতার ব্যাখ্যা নিয়ে কখনো একমত হননি সমালোচকদের সঙ্গে—কেউ দেখেছেন এতে কর্মফলের অমরত্ব, কেউ মৃত্যুচেতনা, কেউ বা ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ। এই বহুমাত্রিকতাই কবিতাটির চিরস্থায়িত্বের রহস্য। ১২৯৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে, অর্থাৎ ১৮৯২ সালের দিকে রচিত এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের পরিণত প্রতিভার প্রথম পূর্ণ বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের দোলায়, সহজ অথচ গভীর ভাষায় কবি যে প্রশ্ন তুলেছেন—আমার সৃষ্টি থাকবে তো, আমি থাকব কি—তা প্রতিটি সৃজনশীল মানুষেরই প্রশ্ন। তাই আজও, একশো তিরিশ বছর পরেও, পরীক্ষার খাতা থেকে আবৃত্তির মঞ্চ—সর্বত্র ‘সোনার তরী’ সমান প্রাসঙ্গিক। কবিতাটি শেখায়, অমরত্ব পাওয়া যায় না দেহে, পাওয়া যায় কর্মে; মহাকালের তরীতে ঠাঁই মেলে কেবল সোনার ফসলের, ফসল-ফলানোর মানুষের নয়। কবিতার মাঝামাঝি অংশে কবি ও মাঝির সংলাপ বিশেষভাবে লক্ষণীয়—‘যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুসি তারে দাও, শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে আমার সোনার ধান’—এই অনুনয়ে একদিকে আছে সৃষ্টিকর্ম বাঁচিয়ে রাখার আকুলতা, অন্যদিকে ‘ক্ষণিক হেসে’ শব্দবন্ধে আছে মহাকালের নির্মম উদাসীনতার ইঙ্গিত। মাঝি কোনো উত্তর দেয় না, কোনো আশ্বাস দেয় না; সে শুধু ধান তুলে নিয়ে চলে যায়। এই নীরবতাই কবিতার দার্শনিক গভীরতাকে বাড়িয়ে দেয়—মহাকাল কারো অনুনয় শোনে না, সে শুধু তার কাজ করে যায়। সমালোচকদের মধ্যে এই কবিতার অর্থ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে—কেউ বলেছেন এটি কবির আত্মজীবনীমূলক উক্তি, কেউ বলেছেন এটি সার্বজনীন মানব-নিয়তির রূপক। রবীন্দ্রনাথ নিজে এই বিতর্কে জড়াতে চাননি; তিনি মনে করতেন, কবিতার অর্থ পাঠকের অনুভূতিতেই সম্পূর্ণ হয়। এই খোলামেলা অর্থবহতাই কবিতাটিকে প্রতিটি যুগের পাঠকের কাছে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার—সর্বত্র ‘সোনার তরী’ পড়ানো হয়, আবৃত্তি শিল্পীদের কণ্ঠে এর পংক্তি আজও দর্শককে অভিভূত করে। কবিতাটি প্রমাণ করে, সত্যিকারের মহৎ কবিতা কখনো পুরনো হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থের ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

মহাকাল, মৃত্যুচেতনা, কর্মফলের অমরত্ব, সৃষ্টি ও স্রষ্টা, বর্ষা-প্রকৃতি

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত; প্রতি স্তবকে সাতটি পংক্তি, যার মধ্যে প্রথম দুটি ও শেষ পংক্তিটি দীর্ঘ এবং মাঝের চারটি হ্রস্ব—এই গঠন কবিতায় এক ধরনের সংগীতময় দোলা এনেছে। ভাষা সহজ ও চিত্রধর্মী: ‘রাশি রাশি ভারা ভারা’, ‘ভরা নদী ক্ষুরধারা’—এমন চিত্রকল্প পাঠকের মনে সরাসরি দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে। রূপকের ব্যবহার অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর—তরী, মাঝি, সোনার ধান, ভরা নদী প্রতিটি প্রতীক একাধিক অর্থ বহন করে। সংলাপধর্মী কাঠামো (কবির সঙ্গে মাঝির কথোপকথন) কবিতাটিকে নাটকীয় গতি দিয়েছে। শেষ স্তবকের পুনরাবৃত্তিমূলক ‘ঠাঁই নাই’ ধ্বনি কবিতার ভাবগভীরতাকে চরমে পৌঁছে দেয়। ছন্দের দিক থেকে লক্ষণীয়, দীর্ঘ পংক্তিগুলোতে বর্ণনার বিস্তার এবং হ্রস্ব পংক্তিগুলোতে চিত্রের ঘনত্ব—এই বৈপরীত্যই কবিতার সংগীতময়তা তৈরি করেছে। ‘শ্রাবণ গগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে’—এমন পংক্তিতে ধ্বনি ও অর্থের অপূর্ব মিলন ঘটেছে। কবিতার শেষে ‘ফাল্গুন, ১২৯৮’—রচনাকালের এই উল্লেখ কবিতাটিকে ব্যক্তিগত দিনলিপির মর্যাদা দেয়, যেন কবি নিজের জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্তকে চিরস্থায়ী করে রাখতে চেয়েছেন।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

কবিতাটি রচিত হয় ১২৯৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে (১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের দিকে), যখন রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার কাজে শিলাইদহে থাকতেন এবং পদ্মার বুকে বোটে বোটে ঘুরে বেড়াতেন। এই পর্বটি তার কাব্যজীবনের ‘সোনার তরী’-পর্ব নামে পরিচিত—প্রকৃতির সঙ্গে গভীর একাত্মতা ও দার্শনিক পরিণতির সময়। ১৮৯৪ সালে ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে বাংলা কবিতায় এক নতুন যুগের সূচনা হয় বলে সমালোচকরা মনে করেন। উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা সাহিত্য যখন মধ্যযুগীয় ভাবধারা থেকে আধুনিক চেতনায় উত্তরণ ঘটাচ্ছিল, তখন এই কবিতা ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সার্বজনীন দর্শনের যে সমন্বয় ঘটায়, তা ছিল অভূতপূর্ব। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’—একাধিক কাব্যগ্রন্থে বাংলা কবিতার ভাষা ও ভাবকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। শিলাইদহের জমিদারি-জীবন তাকে গ্রামবাংলার কৃষক, মাঝি, নদী ও বর্ষার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত করে; ‘সোনার তরী’ কবিতার কৃষক-চরিত্র ও নদী-চিত্র সেই অভিজ্ঞতারই ফসল। উল্লেখ্য, এই কবিতা প্রকাশের পর পাঠকমহলে তাৎক্ষণিক সাড়া জাগে এবং অল্পদিনেই এটি রবীন্দ্রনাথের সর্বাধিক পঠিত কবিতাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।