ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;–
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি।
অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;–
কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল-কানন!
স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে—
“ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে!”
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে
মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে।
কবি বঙ্গকে সম্বোধন করে বলেন — তোমার ভাণ্ডারে বিবিধ রতন, অথচ অবোধ আমি তা অবহেলা করে পরধনের লোভে পরদেশে ভ্রমণ করেছি, ভিক্ষাবৃত্তি করেছি। বহুদিন সুখ ত্যাগ করে, অনিদ্রায়-নিরাহারে কায়মন সঁপে বিফল তপস্যা করেছি; শৈবালে কেলি করে কমল-কানন ভুলেছি। তারপর স্বপ্নে কুললক্ষ্মী বললেন — ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি থাকতে তোর কেন এই ভিখারি-দশা? ফিরে যা ঘরে! কবি সুখে আজ্ঞা পালন করলেন; কালে মাতৃভাষা-রূপ খনি পেলেন — পূর্ণ মণিজালে। সনেটটির দুটি অংশ স্পষ্ট — প্রথম আট পংক্তিতে ভুলের স্বীকারোক্তি, শেষ ছয় পংক্তিতে প্রত্যাবর্তনের আনন্দ। এই গঠন কবিতাটিকে নাটকীয় করে তোলে — পতন ও উত্থানের গল্প। শেষ পংক্তির 'পূর্ণ মণিজালে' চিত্রে সমাপ্তি আসে পূর্ণতার ঘোষণায় — খনি পাওয়া গেছে, আর ভিখারি-দশা নেই।
'বঙ্গভাষা' বাংলা কবিতার সবচেয়ে সৎ আত্মস্বীকারোক্তিগুলোর একটি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যৌবনে স্বপ্ন দেখেছিলেন ইংরেজি ভাষায় বড়ো কবি হওয়ার; মাদ্রাজে, পরে ইউরোপে তিনি ইংরেজিতে লেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই প্রয়াস ব্যর্থ হয় — ইংরেজি সাহিত্যের দরবারে তিনি থেকে যান অপরিচিত। এই ব্যর্থতাকে কবি এখানে রূপক দিয়ে বলেছেন — পরধনের লোভে পরদেশে ভ্রমণ, ভিক্ষাবৃত্তি। নিজের ভাষা ছেড়ে পরের ভাষায় যশ খোঁজা — কবির চোখে এটি ভিক্ষাবৃত্তি। এই নির্মম আত্ম-বিচার কবিতাটিকে মহৎ করে। 'কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি। অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ, মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি' — তপস্যার রূপকটি লক্ষণীয়। ইংরেজিতে সাধনা কবির কাছে তপস্যার মতোই কঠোর ছিল — কিন্তু 'বিফল'। আর যাকে বরণ করেছিলেন, তিনি 'অবরেণ্য' — বরণের অযোগ্য। নিজের সাধনার প্রতি এত কঠোর বিচার খুব কম কবিই করতে পারেন। 'কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল-কানন!' — কবিতাটির সবচেয়ে চমৎকার পংক্তি। শৈবাল — পানার মতো তুচ্ছ জলজ উদ্ভিদ; কমল-কানন — পদ্মবন, সৌন্দর্যের আকর। তুচ্ছের সঙ্গে খেলা করে মূল্যবানকে ভোলা — এই বৈপরীত্য এক পংক্তিতে কবির সমস্ত ভুলকে ধরে দেয়। তারপর স্বপ্নদর্শন — স্বপ্নে কুললক্ষ্মী বললেন। কুললক্ষ্মী — বংশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী — মাতৃমূর্তিতে আবির্ভূত হন। তাঁর বাণী সরল: মাতৃকোষে রতনের রাজি থাকতে ভিখারি-দশা কেন? মাতৃভাষা এখানে 'মাতৃকোষ' — মায়ের ধনভাণ্ডার। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মায়ের দেওয়া রত্ন। 'পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে মাতৃ-ভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে' — প্রত্যাবর্তনের আনন্দ। খনি-রূপকটি গুরুত্বপূর্ণ: ভাষা খনি — যত খনন করা যায়, তত রত্ন পাওয়া যায়। মধুসূদন নিজেই প্রমাণ — বাংলায় ফিরে তিনি 'মেঘনাদবধ কাব্য' রচনা করেন, বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষরের প্রবর্তন করেন। কবিতাটি সনেট — চতুর্দ্দশপদী। প্রথম আট পংক্তিতে সমস্যা — ভুল ও ব্যর্থতা; শেষ ছয় পংক্তিতে সমাধান — প্রত্যাবর্তন ও প্রাপ্তি। এই গঠন পেত্রার্কীয় সনেটের ঐতিহ্য মেনে চলে, যা মধুসূদন বাংলায় প্রথম সার্থকভাবে প্রয়োগ করেন। কবিতাটি কেন টিকে আছে? কারণ মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্ন চিরন্তন। ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজির মোহ, আজকের যুগে অন্য ভাষার মোহ — প্রতিটি যুগেই এই কবিতা প্রাসঙ্গিক। ভাষা-আন্দোলনের বাংলাদেশে এই কবিতা বিশেষ অর্থ বহন করে — মাতৃভাষা যে রত্নখনি, তা মধুসূদন দেড়শো বছর আগেই বলে গেছেন।
মাতৃভাষা, ভাষা-চেতনা, প্রত্যাবর্তন, আত্মস্বীকার
চতুর্দ্দশপদী সনেট — বাংলায় এই ধারার প্রবর্তক মধুসূদন। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে (৮+৬ মাত্রা) রচিত; অষ্টক-ষষ্টকের বিভাজনে সমস্যা-সমাধানের গঠন। প্রধান শৈল্পিক শক্তি রূপকের ঐশ্বর্য: ভাষা হলো রত্নখনি ও মাতৃকোষ, বিদেশি ভাষার সাধনা হলো ভিক্ষাবৃত্তি ও বিফল তপ, আর শৈবাল বনাম কমল-কাননের বৈপরীত্য। সংস্কৃত-ঘেঁষা শব্দচয়ন কবিতাটিকে গাম্ভীর্য দেয়। স্বপ্নদর্শনের কৌশলে পৌরাণিক মহিমা; ধ্বনিমাধুর্যে প্রতিটি পংক্তি স্মরণীয়। ধ্বনির দিক থেকে সনেটটি অত্যন্ত সুরেলা — অন্ত্যমিলের শৃঙ্খলা প্রতিটি পংক্তিকে বেঁধে রাখে। মধুসূদনের ভাষায় সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্য থাকলেও বাক্য-গঠন স্বচ্ছ ও প্রবহমান। এই স্বচ্ছতাই তাঁর শৈলীর বৈশিষ্ট্য — কঠিন শব্দ, সহজ বাক্য। সনেটের চৌদ্দ পংক্তির কঠোর কাঠামোর মধ্যে এত ভাব ধরা — এটি বাংলা কবিতায় নতুন দক্ষতার পরিচয়।
'চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী' ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪–১৮৭৩) যৌবনে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে 'মাইকেল' নাম নেন এবং ইংরেজিতে কবি হওয়ার স্বপ্নে মাদ্রাজ ও ইউরোপে যান। ইংরেজি রচনায় সাফল্য না পেয়ে তিনি বাংলায় ফিরে আসেন এবং 'মেঘনাদবধ কাব্য' (১৮৬১) সহ অমর সৃষ্টি রচনা করেন। 'বঙ্গভাষা' সনেটে এই প্রত্যাবর্তনের আত্মকথা বলা হয়েছে। বাংলা সনেটের জনক হিসেবে মধুসূদন বাংলা কবিতায় নতুন যুগের সূচনা করেন। মধুসূদনের প্রত্যাবর্তনের পেছনে ছিলেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা, যাঁরা তাঁকে বাংলায় লিখতে উৎসাহ দেন। বাংলায় ফিরে তিনি একে একে রচনা করেন 'শর্মিষ্ঠা', 'পদ্মাবতী', 'মেঘনাদবধ কাব্য', 'বীরাঙ্গনা' — বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। 'বঙ্গভাষা' এই নবজন্মের ইশতেহার। বাংলা ভাষা-আন্দোলনের যুগে এই সনেট নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল' (১৯২৯) বাংলা ভাষার সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সংগীতগুলোর…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”