মূল কন্টেন্টে যান

বঙ্গভূমির প্রতি

কবিতা

রেখো, মা, দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে।
সাধিতে মনের সাধ
ঘটে যদি পরমাদ,
মধুহীন করো না গো। তব মনঃকোকনদে।
প্রবাসে, দৈবের বশে,
জীব-তারা যদি খসে
এ দেহ-আকাশ হতে, নাহি খেদ তাহে।
জন্মিলে মরিতে হবে,
অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?
কিন্তু যদি রাখ মনে,
নাহি, মা, ডরি শমনে;
মক্ষিকাও গলে না গো পড়িলে অমৃত-হ্রদে।
সেই ধন্য নরকুলে,
লোকে যারে নাহি ভুলে,
মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন
কিন্তু কোন গুণ আছে,
যাচিব যে তব কাছে,
হেন অমরতা আমি, কহ, গো, শ্যামা জন্মদে।
তবে যদি দয়া কর,
ভুল দোষ, গুণ ধর
অমর করিয়া বর দেহ দাসে, সুবরদে!
ফুটি যেন স্মৃতি-জলে,
মানসে, মা, যথা ফলে
মধুময় তামরস কী বসন্ত, কী শরদে।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবি মায়ের (বঙ্গভূমির) পদে মিনতি করেন — দাসকে মনে রেখো। মনের সাধ সাধতে গিয়ে যদি বিপদ ঘটে, তবে তোমার মন-পদ্মে তাঁকে মধুহীন কোরো না। প্রবাসে দৈবের বশে যদি এই দেহ-আকাশ থেকে জীবন-তারা খসে পড়ে, তাতে খেদ নেই — জন্মিলে মরিতে হবে; অমর কে কোথায়? কিন্তু মা যদি মনে রাখেন, তবে যমকে ভয় নেই — অমৃত-হ্রদে পড়লে মাছিও গলে না। সেই ধন্য নরকুলে, যাকে লোকে ভোলে না, যাকে মনের মন্দিরে সর্বজন সেবে। কিন্তু কবির কোন গুণ আছে যে অমরতা চাইবেন? হে শ্যামা জন্মদাত্রী, দয়া করে ভুল-দোষ ভুলে গুণ ধরে দাসকে অমর বর দাও — স্মৃতি-জলে ফুটে থাকি যেন, বসন্তে কি শরতে।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

'বঙ্গভূমির প্রতি' প্রবাসী বাঙালির চিরন্তন অনুভূতির কবিতা — দূরে বসে জন্মভূমির কাছে স্মরণ-ভিক্ষা। প্রথম পংক্তিতেই সরাসরি মিনতি: রেখো, মা, দাসেরে মনে। 'দাস' সম্বোধনটি লক্ষণীয় — কবি নিজেকে মায়ের দাস হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই দাস-ভাব ভক্তি-ঐতিহ্যের ভাষা; দেশভক্তি এখানে ভক্তির রূপ নিয়েছে। কবিতার দার্শনিক কেন্দ্র — জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে? মৃত্যুর অনিবার্যতাকে কবি সরল সত্যে স্বীকার করেন। জীবন নদী — যার জল কখনো স্থির থাকে না। এই স্বীকারোক্তির পরেই আসে কবিতার মূল যুক্তি: দেহের মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু স্মৃতিতে বেঁচে থাকা সম্ভব। কিন্তু যদি রাখ মনে, নাহি, মা, ডরি শমনে — মা মনে রাখলে যমকে ভয় নেই। 'মক্ষিকাও গলে না গো পড়িলে অমৃত-হ্রদে' — কবিতাটির সবচেয়ে চমৎকার উপমা। মক্ষিকা — ক্ষুদ্র মাছি; অমৃত-হ্রদ — অমৃতের সরোবর। অমৃতে পড়লে ক্ষুদ্রতম প্রাণীও গলে না, অমর হয়। অর্থাৎ, মায়ের স্মৃতি-রূপ অমৃতে স্থান পেলে ক্ষুদ্র কবিও অমর হবেন। এই উপমায় বিনয় ও আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে আছে — কবি নিজেকে মাছির মতো ক্ষুদ্র মনে করেন, তবু অমরত্ব চান। 'সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে, মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন' — অমরত্বের সংজ্ঞা। অমরত্ব মানে দেহের অমরত্ব নয়; মানুষের মনে বেঁচে থাকা। যাকে লোকে ভোলে না, যাকে মনের মন্দিরে সেবা করা হয় — সেই অমর। কিন্তু তারপরই আত্ম-প্রশ্ন: কিন্তু কোন গুণ আছে, যাচিব যে তব কাছে, হেন অমরতা আমি, কহ, গো, শ্যামা জন্মদে। কোন গুণে অমরত্ব দাবি করবেন কবি? এই বিনয় কবিতাটিকে অহংকার থেকে বাঁচায়। 'শ্যামা জন্মদে' — শ্যামা ও জন্মদাত্রী মা এক হয়ে যান; দেশমাতৃকা দেবীর মর্যাদা পান। শেষে প্রার্থনা: তবে যদি দয়া কর, ভুল দোষ, গুণ ধর, অমর করিয়া বর দেহ দাসে, সুবরদে! — দোষ ভুলে গুণ ধরো — এই আবেদনে মানবীয় দুর্বলতার স্বীকারোক্তি আছে। আর 'ফুটি যেন স্মৃতি-জলে, মানসে, মা, যথা ফলে মধুময় তামরস কী বসন্ত, কী শরদে' — স্মৃতি-জলে পদ্মের মতো ফুটে থাকা, বসন্ত-শরৎ সব ঋতুতে। অমরত্বের এই চিত্র কত সুন্দর — ঋতুর পরিবর্তনেও অম্লান! কবিতাটি কেন টিকে আছে? কারণ প্রবাসীর মাতৃভূমি-টান চিরন্তন। দূর দেশে বসে মায়ের কাছে স্মরণ-ভিক্ষা — এই অনুভূতি প্রতিটি যুগের প্রবাসী বাঙালির। আর ভাষার মাধুর্য — রেখো, মা, দাসেরে মনে — শুনলেই হৃদয় নরম হয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

দেশপ্রেম, মাতৃভূমি, মৃত্যুচেতনা, অমরত্ব

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

চতুর্দ্দশপদী সনেট, মাত্রাবৃত্ত ছন্দে। সম্বোধন-প্রধান গঠন — 'মা', 'শ্যামা জন্মদে', 'সুবরদে' — সরাসরি আহ্বানে কবিতা এগোয়। প্রধান শৈল্পিক উপাদান উপমা ও রূপক: দেহ-আকাশে জীবন-তারা, জীবন-নদে অস্থির জল, অমৃত-হ্রদে মক্ষিকা, স্মৃতি-জলে পদ্ম। মৃত্যু ও অমরত্বের বৈপরীত্য কবিতাটির দার্শনিক কাঠামো। সংস্কৃত-ঘেঁষা শব্দ গাম্ভীর্য আনে। বিনয় ও আকাঙ্ক্ষার মিশ্রণ — দাস-ভাবের সঙ্গে অমরত্ব-প্রার্থনা — কবিতাটিকে মানবীয় করে তোলে। কবিতাটির বাক্য-গঠনে প্রশ্ন ও প্রার্থনার মিশ্রণ — 'অমর কে কোথা কবে' ধরনের প্রশ্ন পাঠককে ভাবায়, আর 'রেখো, মা' ধরনের প্রার্থনা হৃদয় ছোঁয়। এই দুই সুরের পালাবদল কবিতাটিকে একই সঙ্গে দার্শনিক ও আবেগঘন করে তোলে। সনেটের সংক্ষিপ্ত পরিসরে এতগুলো ভাব-স্তর — এটাই মধুসূদনের কারিগরি দক্ষতা। সব মিলিয়ে সনেটটি মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ দেশাত্মবোধক কবিতাগুলোর একটি।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

কবিতাটি 'চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী'তে (১৮৬৬) সংকলিত। মধুসূদন জীবনের বড়ো অংশ প্রবাসে কাটান — প্রথমে মাদ্রাজে, পরে ইউরোপে (ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স)। প্রবাস-জীবনে জন্মভূমির প্রতি টান ও দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে। 'বঙ্গভূমির প্রতি'তে সেই টান পেয়েছে প্রার্থনার রূপ। উল্লেখ্য, কবির এই প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে — বাঙালি তাঁকে ভোলেনি; 'মেঘনাদবধ কাব্য' ও সনেটগুলোর জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে অমর। মধুসূদনের শেষ জীবন কাটে অর্থকষ্টে ও স্বাস্থ্যহানিতে; ১৮৭৩ সালে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি বাংলাতেই লিখে গেছেন — 'বঙ্গভাষা' সনেটের প্রতিশ্রুতি তিনি রেখেছিলেন। আজ বাঙালি তাঁকে ভালোবেসে মনে রেখেছে — তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে। প্রবাসী বাঙালিদের কাছে এই কবিতা আজও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।

সম্পর্কিত কবিতা

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।