মূল কন্টেন্টে যান

মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে

কবিতা

মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে
কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে
মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে
কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে

মায়ে বাপে কইরা বন্দী খুশিরও মাজারে
মায়ে বাপে কইরা বন্দী খুশিরও মাজারে
লালে ধলায় হইলাম বন্দী পিঞ্জিরার ভিতরে
কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে
মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে
কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে

পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছটফট ছটফট করে
পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছটফট ছটফট করে
মজবুতও পিঞ্জিরা ময়নায় ভাঙ্গিতে না পারে রে
কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে

উড়িয়া যাইব সুয়া পাখি পইরা রইব কায়া
উড়িয়া যাইব সুয়া পাখি পইরা রইব কায়া
কিসের দেশ কিসের খেশ কিসের মায়া দয়া রে
কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে

হাছন রাজায় ডাকতো যখন ময়না আয় রে আয়
হাছন রাজা ডাকতো যখন ময়না আয় রে আয়
এমনও নিষ্ঠুরও ময়না আর কি ফিরা চায় রে
কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে

কবিতার সারসংক্ষেপ

মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হয়ে হাসন রাজার মন-ময়না কাঁদে। মা-বাবা আনন্দে তাঁকে বন্দি করেছেন — রক্ত-মাংসের দেহে তিনি পিঞ্জিরার ভিতরে বন্দি। পিঞ্জিরায় ময়না ছটফট করে, কিন্তু মজবুত পিঞ্জিরা ভাঙতে পারে না। একদিন সুয়া পাখি উড়ে যাবে, পড়ে থাকবে শুধু কায়া — তখন কিসের দেশ, কিসের আত্মীয়, কিসের মায়া-দয়া! হাসন রাজা ডাকেন — 'ময়না আয় রে আয়' — কিন্তু এমন নিষ্ঠুর ময়না আর ফিরে চায় না। গানটির গঠন বৃত্তাকার — প্রতিটি স্তবক শেষ হয় একই ধুয়ায় (মনমুনিয়ার কান্না)। এই পুনরাবৃত্তি কান্নাকে ক্রমশ গভীর করে। প্রথমে বন্দিত্বের বর্ণনা, তারপর ছটফটানি, তারপর মুক্তির কল্পনা, শেষে বিচ্ছেদের বেদনা — একটি পূর্ণাঙ্গ ভাব-যাত্রা। শেষ পর্যন্ত গানটি মৃত্যুকে মুক্তি হিসেবে দেখায় — পাখি উড়ে যাবে, কায়া পড়ে থাকবে; এই বিচ্ছেদেই শান্তি।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

দেহকে পিঞ্জিরা আর প্রাণকে পাখি কল্পনা করা বাংলার মরমি ঐতিহ্যের প্রচলিত রূপক — লালনের গানেও একই ভাবনা। কিন্তু হাসন রাজার গানে এই রূপক পেয়েছে একান্ত ব্যক্তিগত, আবেগঘন রূপ। পাখিটি এখানে শুধু 'প্রাণ' নয়; এটি 'হাছন রাজার মনমুনিয়া' — কবির নিজের মনের ময়না। এই আত্মীয়-সম্বোধন গানটিকে তত্ত্ব থেকে অনুভূতিতে নামিয়ে আনে। 'মায়ে বাপে কইরা বন্দী খুশিরও মাজারে' — জন্মই বন্দিদশার শুরু। মা-বাবা আনন্দে সন্তানকে পৃথিবীতে আনেন, কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বন্দিত্বের বীজ। 'লালে ধলায় হইলাম বন্দী' — রক্ত-মাংসের দেহেই বন্দি আত্মা। এই পংক্তিতে জন্মের প্রতি এক ধরনের বিষণ্ণ দৃষ্টি আছে। পিঞ্জিরায় ময়নার ছটফটানি — 'ছটফট ছটফট করে' — এই পুনরাবৃত্তিতে পাখির অস্থিরতা জীবন্ত হয়ে ওঠে। মজবুত পিঞ্জিরা ভাঙা যায় না — দেহের বাঁধন এতই শক্ত। কিন্তু আশার বাণী আসে পরের স্তবকে: 'উড়িয়া যাইব সুয়া পাখি, পইরা রইব কায়া'। মৃত্যু এখানে শোকের নয়, মুক্তির ঘটনা। পাখি উড়ে যাবে, কায়া পড়ে থাকবে — এই বিচ্ছেদই মুক্তি। 'কিসের দেশ কিসের খেশ, কিসের মায়া দয়া রে' — মৃত্যুর পর সমস্ত সম্পর্ক, সমস্ত মায়া অর্থহীন হয়ে যায়। এই পংক্তিতে আছে সংসার-বৈরাগ্যের চরম উচ্চারণ। দেশ, আত্মীয়, মায়া — যা নিয়ে মানুষ সারাজীবন ব্যস্ত থাকে, মৃত্যুর মুহূর্তে তার কোনো মূল্য নেই। শেষ স্তবকটি সবচেয়ে মর্মস্পর্শী। হাসন রাজা ডাকেন — 'ময়না আয় রে আয়' — যেন পোষা পাখিকে ডাকছেন। কিন্তু 'এমনও নিষ্ঠুরও ময়না আর কি ফিরা চায় রে' — পাখি ফিরে চায় না। এই 'নিষ্ঠুর' সম্বোধনে আছে অভিমান, ভালোবাসা, আর অসহায়ত্বের মিশ্রণ। প্রাণপাখি নিজের পথে চলে গেছে; কবির ডাক আর পৌঁছায় না। মৃত্যুর সামনে মানুষের এই অসহায়ত্বই গানের চিরন্তন আবেদন। গানটি কেন টিকে আছে? কারণ এটি মৃত্যুকে ভয় নয়, মুক্তি হিসেবে দেখায়। 'উড়িয়া যাইব সুয়া পাখি' — এই চিত্রে শোকের বদলে আছে এক ধরনের শান্তি। আর কবির ব্যক্তিগত কণ্ঠ — 'হাছন রাজার মনমুনিয়া' — শ্রোতাকে নিজের মনের পাখির কথা ভাবতে বাধ্য করে। গানটির শেষে কোনো সান্ত্বনার বাণী নেই — শুধু ডাক আর না-ফেরার বেদনা। এই অসমাপ্তিই গানের শক্তি; শ্রোতা নিজের মনে সমাপ্তি খোঁজেন। মৃত্যুর মতোই গানটি প্রশ্ন রেখে শেষ হয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

দেহতত্ত্ব, মৃত্যু, মুক্তি, আত্মা

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

মরমি গানের ধাঁচে রচিত, পুনরাবৃত্তি-নির্ভর গঠন — প্রতিটি স্তবকের শেষে ধুয়ার মতো ফিরে আসে 'কান্দে হাছন রাজার মনমুনিয়া রে'। প্রধান শৈল্পিক উপাদান রূপক: মাটির পিঞ্জিরা (দেহ), ময়না বা সুয়া পাখি (প্রাণ), ছটফটানি (আত্মার অস্থিরতা)। সংলাপধর্মী সম্বোধন ('ময়না আয় রে আয়') গানটিকে নাটকীয় ও জীবন্ত করে। ভাষা সহজ, আঞ্চলিক ছোঁয়াসমৃদ্ধ ('হইয়া', 'পইরা', 'কইরা'); কিন্তু ভাব গভীর। পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে শোক ও আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ ঘনীভূত হয় — এই কৌশল গানটিকে মন্ত্রময় করে তোলে। গানটির ছন্দ দোলায়মান — পুনরাবৃত্ত পংক্তিগুলো ঢেউয়ের মতো আসে-যায়। 'রে' ধ্বনির ব্যবহার ('হইয়া রে', 'কায়া রে', 'দয়া রে') গানটিকে আবেগঘন ও সুরেলা করে। এই ধ্বনি-কৌশল মরমি গানের ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। এই ধ্বনি-বিন্যাস গানটিকে কান্নার মতো শোনায় — যেন ময়না সত্যিই কাঁদছে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

গানটি হাসন রাজার 'হাসন উদাস' সংকলনে (১৯০৬) প্রকাশিত। হাসন রাজার গান প্রথমে সিলেট অঞ্চলে মুখে মুখে প্রচারিত হয়, পরে সংকলিত হয়। দেহ-প্রাণের রূপক বাংলার বাউল-মরমি ঐতিহ্যের প্রচলিত বিষয় — লালন, হাসন রাজা, রাধারমণ সবাই এই রূপক ব্যবহার করেছেন। হাসন রাজার বিশেষত্ব হলো ইসলামী সুফি ভাবনার সঙ্গে এই ঐতিহ্যের মিলন এবং একান্ত ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ। 'মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে' তাঁর দেহতত্ত্বমূলক গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। হাসন রাজার গানে সুফি আত্মা-ধারণার সঙ্গে বাউল দেহতত্ত্বের মিলন ঘটেছে। ইসলামী ঐতিহ্যে দেহকে আত্মার খাঁচা বা পোশাক ভাবা হয়; হাসন রাজা এই ধারণাকে বাংলার লোক-রূপকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর গান সিলেটের মরমি ঐতিহ্যের শিখর। আজও সিলেট-আসাম অঞ্চলে এই গান মৃত্যু-শোকের অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।