মূল কন্টেন্টে যান

লোকে বলে বলেরে

কবিতা

লোকে বলে বলেরে
ঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার
কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যের মাঝার।।

ভালা কইরা ঘর বানাইয়া
কয়দিন থাকমু আর।
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি
পাকনা চুল আমার।।

এ ভাবিয়া হাসন রাজায়
ঘর-দুয়ার না বান্ধে।
কোথায় নিয়া রাখব আল্লায়
তাই ভাবিয়া কান্দে।।

জানত যদি হাসন রাজা
বাঁচব কতদিন।
বানাইত দালান-কোঠা
করিয়া রঙিন।।

কবিতার সারসংক্ষেপ

লোকে কত কথা বলে, কিন্তু কবির ঘরবাড়ি ভালো নেই — শূন্যের মাঝে তিনি কী ঘর বানাবেন? ভালো করে ঘর বানিয়ে আর কয়দিন থাকবেন? আয়নায় চেয়ে দেখেন — চুল পেকে গেছে। এই ভেবে হাসন রাজা ঘরদুয়ার বাঁধেন না; কোথায় নিয়ে রাখবেন আল্লাহ — এই ভেবে কাঁদেন। যদি জানতেন বাঁচবেন কতদিন, তবে রঙিন দালানকোঠা বানাতেন। গানটি সংসারের অসারতা ও মৃত্যুর অনিবার্যতার সরল অথচ গভীর উচ্চারণ। গানটির কেন্দ্রীয় বৈপরীত্য — লোকে বলে, কিন্তু কবি শোনেন না; সবার চোখে যা মূল্যবান (ঘরবাড়ি), কবির চোখে তা শূন্য। এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নেয় গানের দর্শন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাকা চুল দেখার মুহূর্তটি গানের নাটকীয় কেন্দ্র — বাইরের কোলাহল থেমে যায়, ভেতরের সত্য কথা বলে।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

হাসন রাজার জীবন-কাহিনী এই গানের পটভূমি। সিলেটের লক্ষণশ্রীর প্রভাবশালী জমিদার দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী প্রথম জীবনে ছিলেন বিলাসী, ভোগী। পরে তাঁর জীবনে আসে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন — ভোগের জীবন ছেড়ে তিনি হন মরমি সাধক। 'লোকে বলে বলেরে' সেই পরিবর্তনের সাক্ষ্য — যে মানুষ একদিন দালানকোঠায় বাস করতেন, তিনিই এখন প্রশ্ন করেন: শূন্যের মাঝে কী ঘর বানাবো? গানের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী মুহূর্ত — 'আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার'। আয়নায় নিজের পাকা চুল দেখা — এই সাধারণ ঘটনাটি এখানে আত্মদর্শনের প্রতীক। বয়স বাড়ছে, মৃত্যু এগিয়ে আসছে — এই সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত। আয়না এখানে শুধু কাচ নয়; এটি সত্যের দর্পণ। পাকা চুল দেখে কবি বুঝতে পারেন — ঘর বানানোর সময় পেরিয়ে গেছে; এখন প্রস্তুতির সময়, যাত্রার সময়। 'কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যের মাঝার' — এই পংক্তিতে আছে গভীর দর্শন। সংসার 'শূন্য' — অসার, অস্থায়ী। শূন্যের মাঝে ঘর বানানো অর্থহীন। এই ভাবনা সুফি ঐতিহ্যের 'দুনিয়া নশ্বর' ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। হাসন রাজা কোনো পুঁথি পড়ে এই সত্য শেখেননি; জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন। 'কোথায় নিয়া রাখব আল্লায়, তাই ভাবিয়া কান্দে' — এখানে আছে সম্পূর্ণ সমর্পণ। কোথায় যাবেন, কী হবে — সব আল্লাহর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া। কান্নাটি ভয়ের নয়; এটি অনুতাপ ও ভক্তির মিলিত প্রকাশ। যে মানুষ একদিন নিজের শক্তিতে গর্ব করতেন, তিনি এখন কাঁদেন — এই কান্নাই তাঁর সাধনার প্রমাণ। শেষ স্তবকের কল্পনা — জানলে বাঁচবেন কতদিন, তবে রঙিন দালানকোঠা বানাতেন — একটি বিষণ্ণ রসিকতা। মৃত্যুর দিন জানা থাকলে হয়তো সংসারী হওয়া যেত; কিন্তু মৃত্যু অজানা বলেই সংসার অর্থহীন। এই যুক্তি গানটিকে দার্শনিক গভীরতা দেয়। গানটি কেন টিকে আছে? কারণ মৃত্যুচেতনা সার্বজনীন। ধনী-গরিব, জমিদার-কৃষক — সবার আয়নায় একদিন পাকা চুল দেখা দেয়। হাসন রাজা সেই সত্যকে এমন সরল ভাষায় বলেছেন যে প্রতিটি শ্রোতা নিজের গল্প শুনতে পান। গানটির ভাষা-বৈশিষ্ট্যও লক্ষণীয়। সিলেটি উপভাষার ছোঁয়া ('বানাইমু', 'থাকমু') গানটিকে মাটির গন্ধ দেয় — এটি কোনো পুঁথির ভাষা নয়, মানুষের মুখের ভাষা। এই মাটির ভাষাতেই গভীরতম সত্য বলা যায় — হাসন রাজা তা প্রমাণ করেছেন।

প্রধান ভাব ও বার্তা

মৃত্যুচেতনা, বৈরাগ্য, আত্মজিজ্ঞাসা, সমর্পণ

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

মরমি গানের সরল ও প্রত্যক্ষ ভাষা — কোনো কৃত্রিম অলংকার নেই। প্রধান শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য আত্ম-সম্বোধন ও প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গি — যেন কবি নিজের সঙ্গে কথা বলছেন, শ্রোতা শুধু শুনছেন। সিলেটি-পূর্ববঙ্গীয় ভাষার ছোঁয়া ('বানাইমু', 'থাকমু', 'কান্দে') গানটিকে আঞ্চলিক সত্যতা দেয়। পুনরাবৃত্তিমূলক গঠন ও সহজ অন্ত্যমিল মুখস্থ-যোগ্যতা বাড়ায়। 'আয়না দিয়া চাইয়া দেখি' — এই দৃশ্যকল্পটি গানের চিরস্মরণীয় চিত্র। সুরের দিক থেকে গানটি মরমি ধারার — মন্থর, ধ্যানমগ্ন, কিছুটা বিষণ্ণ। 'লোকে বলে বলেরে' — এই উদ্বোধনী ধুয়া গানটিকে লোকগানের চেনা কাঠামো দেয়। কবি নিজের নাম উচ্চারণ করেন — মরমি কবিদের স্বাক্ষর-রীতি। এই আত্ম-উল্লেখ গানটিকে ব্যক্তিগত সাক্ষ্যে পরিণত করে। গানের শেষে কবির আত্ম-উপলব্ধি শ্রোতাকেও নিজের জীবনের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

হাসন রাজা (১৮৫৪–১৯২২) — সিলেটের লক্ষণশ্রীর জমিদার, দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী। প্রথম জীবনে বিলাসী জমিদার হলেও পরবর্তীতে তিনি মরমি সাধনায় মগ্ন হন এবং অসংখ্য গান রচনা করেন। তাঁর গানের সংকলন 'হাসন উদাস' ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হয়। হাসন রাজার গানে ইসলামী সুফি ভাবনার সঙ্গে বাউল-মরমি ঐতিহ্যের মিলন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হাসন রাজার গানের প্রশংসা করেছিলেন। 'লোকে বলে বলেরে' তাঁর আত্মজিজ্ঞাসামূলক গানগুলোর মধ্যে অন্যতম পরিচিত। হাসন রাজার গান প্রথমে সিলেটের হাওর-অঞ্চলে মাঝি-কৃষকদের মুখে মুখে ছড়ায়। পরে শিক্ষিত সমাজে এর কদর বাড়ে। তাঁর পরিবার পিতার গান সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। আজ হাসন রাজা বাংলাদেশের মরমি সংগীতের অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে স্বীকৃত। সিলেটের লোক-উৎসবে আজও হাসন রাজার গান প্রধান আকর্ষণ।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

সোনালী কাবিন

“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।