ভালো আছি ভালো থেকো
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
মিলন হবে কত দিনে
আমার মনের মানুষের সনে।।
চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী। হব বলে চরণদাসী তা হয় না কপাল গুণে।।
মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন লুকালে না পায় অন্বেষণ। কালারে হারায়ে তেমন ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।।
ঐ রূপ যখন স্মরণ হয় থাকে না লোকলজ্জার ভয়। লালন ফকির ভেবে বলে সদাই ও প্রেম যে করে সেই জানে।।
কবি প্রশ্ন করেন — আমার মনের মানুষের সঙ্গে মিলন হবে কত দিনে? চাতক যেমন অহর্নিশি কালো মেঘের দিকে চেয়ে থাকে, তেমনি কবি চেয়ে আছেন; চরণদাসী হওয়ার সাধ, কিন্তু কপালগুণে তা হয় না। মেঘের বিদ্যুৎ মেঘের মধ্যে লুকালে যেমন খুঁজে পাওয়া যায় না, তেমনি কালাকে হারিয়ে কবি দর্পণে তার রূপ দেখেন। সেই রূপ যখন স্মরণ হয়, তখন লোকলজ্জার ভয় থাকে না। লালন ফকির ভেবে বলেন — ও প্রেম যে করে, সেই জানে। গানটি মূলত একটি প্রশ্ন — মিলন কবে হবে? — কিন্তু এই প্রশ্নের মধ্যেই ভক্তের সমস্ত সাধনা ধরা আছে। চাতকের অপেক্ষা, চরণদাসী হওয়ার সাধ, দর্পণে রূপদর্শন — প্রতিটি চিত্র মিলনের পথের একেকটি ধাপ। শেষ পংক্তিতে লালন সিদ্ধান্ত দেন না; শুধু বলেন — প্রেম যে করে, সেই জানে। এই অনির্দিষ্টতাই গানের সৌন্দর্য।
লালনের দর্শনে 'মনের মানুষ' একটি কেন্দ্রীয় ধারণা — মানুষের অন্তরে বাস করা পরম সত্তা, যার সঙ্গে মিলনই সাধনার লক্ষ্য। 'মিলন হবে কত দিনে' সেই মিলনের জন্য আকুল অপেক্ষার গান। গানটি শুরু হয় প্রশ্ন দিয়ে — মিলন হবে কত দিনে? — এই প্রশ্নে আছে ব্যাকুলতা, আছে অনিশ্চয়তা; সাধক জানেন না মিলন কবে হবে, শুধু জানেন অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। 'চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী' — চাতক পাখির উপমাটি ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে আসা। কথিত আছে, চাতক শুধু বৃষ্টির জল পান করে, মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই একনিষ্ঠ অপেক্ষাই ভক্তের আদর্শ। 'কালো শশী' — কালো চাঁদ — একদিকে কৃষ্ণ-ভাবনার ইঙ্গিত, অন্যদিকে সুফি ঐতিহ্যের প্রিয়তমের প্রতীক। লালনের গানে হিন্দু-মুসলিম ভাবনা এভাবেই মিশে যায়। 'মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন লুকালে না পায় অন্বেষণ' — এই উপমাটি গানের দার্শনিক গভীরতা প্রকাশ করে। পরম সত্তা লুকিয়ে আছেন সৃষ্টির মধ্যেই — যেমন বিদ্যুৎ মেঘের মধ্যে। খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় না, কারণ খোঁজার চোখ বাইরের দিকে। তাই কবি 'ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে' — দর্পণে, অর্থাৎ নিজের অন্তরে, সেই রূপ দেখেন। আত্মদর্শনই ঈশ্বর-দর্শন — এই বাউল-সুফি সত্য গানটিতে সহজে বলা হয়েছে। 'ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়, থাকে না লোকলজ্জার ভয়' — ভক্তির চরম অবস্থায় সামাজিক ভয়-লজ্জা তুচ্ছ হয়ে যায়। মীরাবাঈ থেকে লালন — ভক্তি-ঐতিহ্যের এই সত্য সর্বত্র। আর শেষ পংক্তি — 'সদাই ও প্রেম যে করে সেই জানে' — প্রেমের গোপনীয়তার ঘোষণা। প্রেম বাইরে থেকে বোঝা যায় না; যে করে, শুধু সেই জানে। এই পংক্তিতে লালন প্রেমকে তত্ত্বের ঊর্ধ্বে তুলে দেন — প্রেম অনুভূতির বিষয়, ব্যাখ্যার নয়। গানটি কেন টিকে আছে? কারণ অপেক্ষা ও বিরহের অনুভূতি সার্বজনীন। প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা — সে মানুষ হোক বা পরম সত্তা — প্রতিটি হৃদয়ের চেনা অনুভূতি। আর গানটির সুরে আছে এমন মাধুর্য যে শুনলেই মনে গেঁথে যায়। গানটির আরেকটি মাত্রা হলো এর বহুকণ্ঠের সম্ভাবনা। 'চরণদাসী' হওয়ার সাধ — দাসী-ভাব ভক্তির ঐতিহ্যে বিশেষ অর্থ পায়। লালনের গান নারী-পুরুষ উভয়ের কণ্ঠে গাওয়া হয়; প্রতিটি কণ্ঠে 'মনের মানুষ' নতুন রূপ নেয়। এই বহুকণ্ঠতাই গানটিকে জীবন্ত রাখে।
মনের মানুষ, বিরহ, ভক্তি, প্রেম
বাউল গানের সরল গঠন — প্রশ্ন দিয়ে শুরু, চিত্র দিয়ে ভাবপ্রকাশ, স্বাক্ষর-পংক্তিতে সমাপ্তি। প্রধান শৈল্পিক উপাদান প্রকৃতি-চিত্রের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ভাব প্রকাশ: চাতক, মেঘ, বিদ্যুৎ, দর্পণ — প্রতিটি চিত্রই দ্বৈত অর্থ বহন করে। পুনরাবৃত্তি ও অন্ত্যমিল গানটিকে স্মরণীয় করে তোলে। ভাষা অত্যন্ত সহজ, কিন্তু প্রতিটি পংক্তিতে তত্ত্বের ইঙ্গিত — এই 'সহজ গভীরতা' লালনগীতির বৈশিষ্ট্য। 'যে করে সেই জানে' — এই সমাপ্তি গানটিকে উপদেশ থেকে অনুভূতিতে উন্নীত করে। গানটির সুর করুণ ও ব্যাকুল — বাউল সুরের বিরহ-অঙ্গের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। 'মিলন হবে কত দিনে' — এই ধুয়া বারবার ফিরে আসে, যেন ভক্তের নিরন্তর জপ। প্রশ্ন দিয়ে শুরু করে গানটি শেষ হয় উপলব্ধিতে — এই যাত্রা-গঠন শ্রোতাকে সঙ্গে নিয়ে চলে।
লালনের বাউল দর্শনে 'মনের মানুষ' সাধনার লক্ষ্য — অন্তরে বাস করা পরম সত্তা। বাউল সাধনায় গুরু, প্রেম ও দেহতত্ত্বের মাধ্যমে এই মনের মানুষের সন্ধান করা হয়। 'মিলন হবে কত দিনে' সেই সাধনার ব্যাকুলতার প্রকাশ। লালনের সময়ে (ঊনবিংশ শতক) বাংলায় ধর্মীয় গোঁড়ামি ও জাত-পাতের বিরুদ্ধে বাউলরা মানবধর্মের বাণী প্রচার করেন। এই গান সেই মানবতাবাদী মরমি ঐতিহ্যের অংশ — যেখানে প্রেমই ধর্ম, মানুষই সত্য। বাউল সাধনায় 'মনের মানুষ' ধারণার মূলে আছে সুফি ও বৈষ্ণব ভাবনার মিলন। লালন এই দুই ঐতিহ্যকে নিজের মানবতাবাদী দর্শনে গলিয়ে নেন। তাঁর গানে মনের মানুষ কখনো প্রিয়তম, কখনো গুরু, কখনো পরম সত্তা — এই বহুমাত্রিকতাই লালনগীতির আকর্ষণ। এই গান আজও বাউল-শিল্পীদের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি অনুরোধ করা গানগুলোর একটি।
“কবিতা সম্পর্কে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'ভালো আছি ভালো থেকো' প্রেমিকের বিদায়-পত্র — দূরত্বের ওপার…”
“কবিতা সম্পর্কে আল মাহমুদের 'সোনালী কাবিন' (১৯৭৩) আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত সনেট-পরম্পরাগুলোর একটি।…”
“কবিতা সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' দারিদ্র্যকে অভিশাপ নয়, মর্যাদার উৎস হিসেবে দেখার এক…”
“কবিতা সম্পর্কে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' মৃত্যুচিন্তা ও জীবনের প্রতি টানের…”
“কবিতা কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে…”