মূল কন্টেন্টে যান

কবিতা

বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর ধারে লেবুর তলে,
থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?

সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;
দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?
খাবার খেতে আসি যখন
দিদি বলে ডাকি তখন,
ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো?
আমি ডাকি, তুমি কেন চুপটি করে থাকো?

বল্ মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?
কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে!
দিদির মত ফাঁকি দিয়ে
আমিও যদি লুকাই গিয়ে
তুমি তখন একলা ঘরে কেমন ক’রে রবে?
আমিও নাই—দিদিও নাই—কেমন মজা হবে!

ভূঁই-চাঁপাতে ভরে গেছে শিউলী গাছের তল,
মাড়াস্ নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল |
ডালিম গাছের ফাঁকে ফাঁকে
বুলবুলিটা লুকিয়ে থাকে,
উড়িয়ে তুমি দিও না মা ছিঁড়তে গিয়ে ফল,
দিদি যখন শুনবে এসে বলবি কি মা বল্ |

বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
এমন সময় মাগো আমার কাজলা দিদি কই?
লেবুর তলে পুকুর পাড়ে
ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোপে ঝাড়ে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই,—
রাত্রি হোল মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?

কবিতার সারসংক্ষেপ

চাঁদনি রাতে একটি ছোট্ট শিশু মায়ের কাছে জানতে চায় — তার শোলক-বলা কাজলা দিদি কোথায়? বাঁশ-বাগানের মাথায় চাঁদ, পুকুর ধারে জোনাক জ্বলছে, ফুলের গন্ধে ঘুম আসছে না শিশুটির। সে বোঝে না, কেন মা আর দিদিকে ডাকেন না, কেন দিদির কথা উঠলেই মা আঁচলে মুখ ঢাকেন। পুতুলের বিয়েতে দিদিকে চায় সে; হুমকি দেয় — দিদির মতো সেও লুকিয়ে যাবে। কবিতার শেষে আবার সেই প্রশ্ন — রাত্রি হলো, মাগো, আমার কাজলা দিদি কই? পাঠক বুঝতে পারেন, কাজলা দিদি মারা গেছে; শিশুর সরল প্রশ্নের ভেতর দিয়েই ফুটে ওঠে মৃত্যুর গভীর শোক।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

যতীন্দ্রমোহন বাগচীর 'কাজলা দিদি' বাংলা শিশুতোষ কবিতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী রচনাগুলোর একটি — যে কবিতা শিশুর মুখ দিয়ে বলা হলেও আসলে বড়দের কবিতা। কবিতার বক্তা একটি ছোট্ট শিশু, যে চাঁদনি রাতে মায়ের কাছে জানতে চায় — তার কাজলা দিদি কোথায়? শিশুটি বোঝে না, কেন মা আর দিদিকে ডাকেন না, কেন দিদির কথা উঠলেই মা আঁচলে মুখ ঢাকেন। পাঠক কিন্তু বুঝতে পারেন: কাজলা দিদি আর নেই — সে মারা গেছে। এই দ্বৈত-বোধনই কবিতাটির শিল্পকৌশল: শিশুর সরল প্রশ্নের ভেতর দিয়ে পাঠক অনুভব করেন মৃত্যুর গভীর শোক। কবিতার প্রতিটি স্তবকে শিশুর প্রশ্ন আর মায়ের নীরবতার বৈপরীত্য বাড়তে থাকে। 'সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো; দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?' — শিশুর চোখে এটি রহস্য; পাঠকের চোখে শোকের চিত্র। তৃতীয় স্তবকে শিশুর কল্পনা আরও মর্মস্পর্শী: 'বল্ মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে? কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে!' — পুতুলের বিয়েতে দিদিকে চায় শিশুটি; সে জানে না, দিদি আর কখনো ফিরবে না। 'দিদির মত ফাঁকি দিয়ে আমিও যদি লুকাই গিয়ে' — এই নির্দোষ হুমকিতে পাঠকের বুক কেঁপে ওঠে। চতুর্থ স্তবকে প্রকৃতির বর্ণনা — ভূঁই-চাঁপা, শিউলী, ডালিম গাছের বুলবুলি — শিশুর জগতের সৌন্দর্যকে তুলে ধরে, যা শোকের পটভূমিতে আরও উজ্জ্বল লাগে। শেষ স্তবকে প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি — 'বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই' — কিন্তু এখন প্রশ্নটি আরও ভারী: 'রাত্রি হোল মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?' কবিতাটি কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, কোনো সান্ত্বনাও নয়; শুধু শিশুর প্রশ্নটিকে রেখে যায় — আর সেই প্রশ্নই পাঠকের মনে দীর্ঘক্ষণ অনুরণিত হয়। এই সংযমই কবিতাটির শক্তি; যতীন্দ্রমোহন বাগচী বুঝেছিলেন, শোককে বড় বড় শব্দে নয়, নীরবতায় প্রকাশ করতে হয়। এই কবিতা বাংলাদেশের চতুর্থ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে থাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিশুরা এটি পড়ে বড় হয়েছে — কিন্তু মজার বিষয়, শিশু বয়সে আমরা শুধু খুকির প্রশ্নটিই শুনি; বড় হয়ে আবার পড়লে মায়ের নীরবতা শোনা যায়। এই দ্বিস্তরীয় পাঠই কবিতাটির শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ — এটি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। 'কাজলা দিদি' নামটিও অর্থবহ: কাজল-চোখের মেয়ে — বাংলার গ্রামে সুন্দরী মেয়ের এই চেনা বিশেষণ। কবিতায় মা একটি শব্দও বলেন না; তার সমস্ত শোক প্রকাশ পায় আঁচলে মুখ ঢাকায়, চুপটি করে থাকায়। এই নীরবতাই কবিতার সবচেয়ে বাঙ্ময় অংশ। যতীন্দ্রমোহন বাগচী 'মানসী ও মর্ম্মবাণী' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন; তার কবিতায় পল্লিবাংলার এই নিবিড় অনুভূতি বারবার ফিরে এসেছে। 'কাজলা দিদি' প্রমাণ করে, শিশুতোষ কবিতা মানেই হালকা কবিতা নয় — শিশুর চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবীও হতে পারে গভীরতম শিল্পের বিষয়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

শিশুমন, মৃত্যুচেতনা, পারিবারিক শোক, স্মৃতি

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

কবিতাটির মূল কৌশল দ্বৈত-বোধন (ড্রামাটিক আইরনি) — শিশু যা বোঝে না, পাঠক তা বোঝেন। শিশুর সরল প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি ('কাজলা দিদি কই?') প্রতিটি স্তবকে গভীরতর অর্থ পায়। মায়ের নীরবতা — একটি শব্দও না বলা — শোকের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ। প্রকৃতির চিত্র (চাঁদ, জোনাক, ফুলের গন্ধ) শিশুর জগতের সৌন্দর্য ও শোকের বৈপরীত্য তৈরি করে। প্রথম ও শেষ স্তবকের বৃত্তাকার গঠন কবিতাটিকে দিয়েছে সংগীতময় সমাপ্তি।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

'কাজলা দিদি' ১৯৩১ সালে 'ছোটদের চয়নিকা' সংকলনে স্থান পায় এবং পরে বাংলাদেশের চতুর্থ শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে সংকলিত হয় — ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই কবিতা পড়ে বড় হয়েছে। যতীন্দ্রমোহন বাগচী (১৮৭৮–১৯৪৮) ছিলেন কবি ও সম্পাদক; তার কবিতায় পল্লিপ্রকৃতি ও পল্লিজীবনের অনুভূতি প্রধান। এই কবিতা প্রমাণ করে, শিশুতোষ কবিতাও হতে পারে গভীরতম শিল্প।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।