মূল কন্টেন্টে যান

তোমার চোখ এত লাল কেন

কবিতা সম্পর্কে

নির্মলেন্দু গুণের ‘তোমার চোখ এত লাল কেন’ বাংলা প্রেমের কবিতার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনাগুলোর একটি। ‘আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে’—এই অদ্ভুত শর্ত দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ভালোবাসার দাবির বদলে যত্ন ও মমতার আকাঙ্ক্ষার কথা বলে।

কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক: ‘তোমার চোখ এত লাল কেন?’

— নির্মলেন্দু গুণ, ‘তোমার চোখ এত লাল কেন’ থেকে উদ্ধৃত

স্বত্ব সংরক্ষিত থাকায় এই কবিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখানে প্রকাশ করা হয়নি; উপরের পংক্তিদ্বয় সুবিদিত উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া হলো।

কবিতার সারসংক্ষেপ

কবিতাটির কথক সরাসরি ঘোষণা করেন—‘আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে’। তিনি ভালোবাসার দাবি করছেন না; তিনি চান শুধু একটু মানবিক যত্ন। কেউ একজন তার জন্য অপেক্ষা করুক—শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য; কারণ বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে তিনি ক্লান্ত। কেউ তাকে খেতে দিক; হাতপাখা নিয়ে পাশে বসে থাকতে হবে না—তিনি জানেন, ইলেকট্রিকের যুগ নারীকে স্বামী-সেবার দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। তিনি চান, কেউ তাকে জিজ্ঞেস করুক—জল লাগবে কিনা, নুন লাগবে কিনা, পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরেকটা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা। এঁটো বাসন তিনি নিজেই ধুতে পারেন। শেষে তার একটাই চাওয়া—কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত তাকে জিজ্ঞেস করুক: ‘তোমার চোখ এত লাল কেন?’ সংক্ষেপে, এটি প্রেমের বদলে মমতার কবিতা; বড় দাবির বদলে ছোটো যত্নের কবিতা।

কবিতার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

এই কবিতার প্রথম বিস্ময় এর শিরোনাম-বিরোধিতা। ‘আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে’—প্রেমের কবিতা শুরু হচ্ছে ভালোবাসার দাবি প্রত্যাখ্যান দিয়ে। এই নেতিবাচক শুরুই কবিতাটির মৌলিকত্ব। নির্মলেন্দু গুণ বুঝেছেন, প্রেমের সবচেয়ে বড় সংকট ভালোবাসার অভাব নয়—যত্নের অভাব। ভালোবাসা একটি বড় শব্দ, যার ভারে সম্পর্ক চাপা পড়ে যায়; কিন্তু এক গ্লাস জল এগিয়ে দেওয়া, দরজা খুলে দেওয়া, ‘খেয়েছো?’ জিজ্ঞেস করা—এই ছোটো ছোটো কাজেই প্রেম বেঁচে থাকে। কবিতাটি এই সত্যটি এমন সরলতায় বলে যে পাঠক চমকে ওঠেন—এত সহজ কথা আগে কেউ বলেনি কেন? কবিতার আরেকটি গভীর দিক এর নারী-দৃষ্টিভঙ্গি। ‘আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে’—এই পংক্তিতে কবি স্পষ্ট করে দেন, তিনি পুরনো দিনের সেবাপরায়ণা স্ত্রী চান না; তিনি চান একজন স্বাধীন মানুষের সঙ্গ। হাতপাখা নিয়ে পাশে বসে থাকার রোমান্টিক কল্পনাকে তিনি সরিয়ে দেন—কারণ তিনি জানেন, সেই কল্পনা নারীকে বন্দী করে। এই প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি কবিতাটিকে শুধু প্রেমের কবিতা থেকে উন্নীত করে সামাজিক চেতনার কবিতায় পরিণত করে। ‘পাটশাক ভাজা’, ‘তেলে ভাজা শুকনো মরিচ’, ‘এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল’—এই অতি সাধারণ, গার্হস্থ্য চিত্রগুলো বাংলা কবিতায় নতুন ছিল। এর আগে প্রেমের কবিতায় চাঁদ-তারা-ফুলের রাজত্ব ছিল; নির্মলেন্দু গুণ প্রেমকে নিয়ে এলেন রান্নাঘরে, উঠোনে। এই ‘নিম্নবর্গীয়’ চিত্রকল্পই কবিতাটিকে সাধারণ পাঠকের এত কাছের করে তুলেছে—প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাঙালি এই জীবন চেনে। কবিতার সমাপ্তি অসাধারণ: ‘কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করুক: তোমার চোখ এত লাল কেন?’ শারীরিক প্রেমের দাবি প্রত্যাখ্যান করে কবি চান শুধু একটি প্রশ্ন—একটি প্রশ্ন, যাতে মমতা আছে, খেয়াল আছে। লাল চোখ—কান্নার, না-ঘুমের, ক্লান্তির চিহ্ন; কেউ যদি সেটা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করে, তাতেই প্রেমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই শেষ দুটি পংক্তি বাংলা কবিতার সবচেয়ে উদ্ধৃত পংক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে—কারণ এতে আছে প্রতিটি একাকী মানুষের আকাঙ্ক্ষা: কেউ একজন খেয়াল করুক। কবিতাটির ছন্দ ও ধ্বনির দিকটিও লক্ষণীয়। এটি গদ্যছন্দে রচিত হলেও এর ভেতরে একটি সুর আছে—‘আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই’ বাক্যটি প্রতিবার ফিরে আসে একটি ঢেউয়ের মতো; প্রতিটি ঢেউ নতুন একটি চাওয়া নিয়ে আসে। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে আবৃত্তিযোগ্য করে—শ্রোতা প্রতিটি পুনরাবৃত্তিতে নতুন অর্থ খুঁজে পান। ‘দরোজা’ শব্দটির পুনরাবৃত্তিও তাৎপর্যপূর্ণ—দরজা এখানে শুধু কাঠের পাল্লা নয়; এটি সম্পর্কের প্রতীক। বাইরে থেকে দরজা খোলা মানে একা সংগ্রাম করা; ভেতর থেকে খুলে দেওয়া মানে কেউ অপেক্ষা করছে। এই একটি শব্দেই কবিতার সমস্ত দর্শন সংকুচিত। কবিতাটি প্রমাণ করে, মহৎ কবিতার জন্য মহৎ বিষয় দরকার হয় না; দরকার সৎ দৃষ্টি—যা সাধারণ জীবনের মধ্যে অসাধারণ অর্থ খুঁজে পায়।

প্রধান ভাব ও বার্তা

প্রেম ও মমতা, দাম্পত্য জীবন, একাকীত্ব, নারীমুক্তি

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

গদ্যকবিতা-ঘেঁষা মুক্ত ছন্দ; দৈনন্দিন গদ্যের ভাষায় কবিতা। ‘আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই’—এই বাক্যের পুনরাবৃত্তি কবিতাটির কাঠামোগত মেরুদণ্ড। গার্হস্থ্য চিত্রকল্পের (জল, নুন, পাটশাক ভাজা, এঁটো বাসন) অভিনব ব্যবহার—প্রেমকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনা। নেতিবাচক শুরু ও ইতিবাচক আকাঙ্ক্ষার বৈপরীত্য। শেষের প্রশ্ন (‘তোমার চোখ এত লাল কেন?’) সমগ্র কবিতার সারসংক্ষেপ—একটি প্রশ্নেই সমস্ত মমতা। ব্যঙ্গ ও করুণার মিশ্রণ; সরল ভাষায় গভীর মনস্তত্ত্ব।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

নির্মলেন্দু গুণ ষাটের দশকে কবি হিসেবে আবির্ভূত হন—আধুনিক বাংলা কবিতার সেই পর্বে, যখন কবিরা নাগরিক জীবন, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির নতুন ভাষা খুঁজছিলেন। ‘তোমার চোখ এত লাল কেন’ এই ধারারই ফসল, তবে এর বিশেষত্ব—এটি বুদ্ধিজীবী পাঠকের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছেছে। কবিতাটি আবৃত্তি-শিল্পীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়; মঞ্চে, টেলিভিশনে, সামাজিক মাধ্যমে এর পাঠ লাখো শ্রোতাকে স্পর্শ করেছে। এর জনপ্রিয়তার রহস্য—কবিতাটি কোনো বিশেষ শ্রেণির নয়; যে কেউ—বিবাহিত, অবিবাহিত, প্রবাসী, গৃহিণী—নিজের জীবনের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে নারীর বদলে যাওয়া ভূমিকার প্রতিফলনও এই কবিতায় আছে—‘ইলেকট্রিকের যুগ’ পংক্তিটি তার সাক্ষ্য।

সম্পর্কিত কবিতা

কেউ কথা রাখেনি

“কবিতা সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত কবিতাগুলোর…”

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।